পোস্ট-পার্টাম সাইকোসিস: আমি এবং অন্যান্য

0
ঈশিতা বিনতে শিরীন নজরুল: আমার প্রেগন্যান্সির তখন একদম অ্যাডভান্সড স্টেজ। হঠাৎ একদিন কেমন যেন ব্যথা করে উঠলো। আম্মুকে জানাতেই তিনি আমাকে বিছানায় শুয়ে থাকতে বলে হঠাতই উধাও হয়ে গেলেন!!  আমি কোনমতে বসে আমার বরকে ফোন করলাম, আর হাসপাতালে করলাম। তারপর শুয়ে ‍শুয়ে খুঁজছি আম্মুকে… কিন্তু কোথায় আমার মা? কিছুক্ষণ পর তাঁকে দেখা গেলো বারান্দার দিকে প্রায় দৌঁড়ে বালতি হাতে যেতে!!
সবাই নিশ্চয়ই ভাবছেন যে, একি রে বাবা, বালতি হাতে সে সময় তিনি কী করছেন? বলছি…. আম্মু আমার ব্যথার কথা শুনেই ভেবেছেন যে আজই বোধহয় সেই দিনটি!! অথচ ছোট্ট অতিথির জন্য তৈরি করা পোশাক তো ধোয়াই হয়নি…. তাই তিনি তখন সেই মহান কাজে নিয়োজিত ছিলেন।
২. আমার মা হলেন অসম্ভব ব্যক্তিত্বসম্পন্ন অসাধারণ একজন মানুষ, যার সবকিছু জুড়েই শুধু আমি আর আমি। চাকরি করা সত্ত্বেও কোনদিন অামার যত্নের কোন ত্র্রুটি তিনি হতে দেননি। এ কথা এজন্য বলছি যে, সেই মা সেই সময়টা আমাকে বাদ দিয়ে নতুন অতিথি আসার প্রস্তুতি নিয়ে ব্যস্ত হয়ে গেলেন!! তাহলে বুঝুন…. অন্য মা অথবা শাশুড়িদের প্রেক্ষাপটটি….. এই ঘটনাটিকে নেতিবাচক হিসেবে উপস্থাপন করা আমার উদ্দেশ্য নয়। আমার সন্তানের প্রতি অগাধ ভালবাসারই প্রকাশ এই ঘটনাতে রয়েছে। কিন্তু কী বলুন তো? এ ধরনের সময়ে আসলে যেকোন সন্তানসম্ভবা মায়েদেরই সবচেয়ে কাছের মানুষটির সান্নিধ্য প্রয়োজন। স্বামী, মা বা শাশুড়ি….  এখন প্রসঙ্গ হলো আদৌ কি আমরা সেই সময়ের প্রয়োজনটি বুঝতে পারি? 
৩. 
নিজের প্রয়োজনেই প্রচুর পড়াশুনা করেছিলাম সেই সময়ে। দেশে-বাইরে মাতৃত্ব এর সাথে সংশ্লিষ্ট অনেক গ্র্রুপের সদস্য হয়েছি, সবার সবধরনের অভিজ্ঞতা পড়েছি অনেক মন দিয়ে। এর কারণ ছিল… আশেপাশের সবাই নানা ধরনের উপদেশ দিতেই থাকতো, এই করো না ঐ করো না, এই খেও না… । আমার সমস্যা হলো অনেক গবেষণা না করে কোনদিনই কারও কথাকেই পাত্তা আমি দেইনি। সেই পড়াশুনার মধ্যেই এই পোস্ট-পার্টাম সাইকোসিস নিয়ে জানা।  তারপর এক সময় ছেলে হলো…সবাই ওকে নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়লো। কারোরই তখন আর আমার কথা মনে রইলো না।
রাতের পর রাত ঘুমাতে পারি না, প্রথম সন্তান তাই তাকে খাওয়াতেও ততটা এক্সপার্ট নই। একটা সম্পূর্ণ ভিন্ন জগৎ আমার জন্য, যেখানে আমি যেন অদৃশ্য। অামি অসম্ভব হতাশায় পড়ে গেলাম। কি যে সেই সময়কার কষ্ট আমি বোঝাতে পারবো না। আম্মুকে বললাম, আম্মু বললেন… কই আমাদের সময় তো এরকম হতো না!!  সেই তো কথা…. আমার মায়ের মতো শিক্ষিত এবং একই সাথে উদার মনোভাবের একজন মা, যিনি প্রথমেই সেই ছোট্টবেলাতেই অার দশজন মেয়ের চেয়ে আলাদাভাবে বড় করতে চেয়েছেন,সমাজের ‘স্বাভাবিক‘ ধারা থেকে বাইরের ভিন্নতাকে হাত ধরে শিখিয়েছেন, তিনি যদি বলেন তো বাকিদের আমি দোষ দেই কীভাবে?
এটি আসলে তার দোষ নয়। তারপরেও তিনি সেইসময় আমার মেজাজ থেকে শুরু করে সব ধরনের অত্যাচার সহ্য করেছিলেন। সেই সাথে পাশে ছিলেন আমার বর। আমার বলতে কোন দ্বিধা নেই যে সেই সময়টা ছেলের চেয়ে বরং আমার ভাল থাকা নিয়েই সে বেশি চিন্তিত ছিল। সবসময় চেষ্টা করেই গিয়েছে যে কিভাবে আমার মন ভাল রাখা যায়। তার অনেক গুরুত্বপূর্ণ কাজও তখন সে বাদ দিয়ে শুধু আমার পাশে থাকার চেষ্টা সে করেছিল। বোধহয় সেইজন্য আমি আস্তে আস্তে আবার আগের মতো হয়ে উঠেছিলাম। তাছাড়া আমারটি নিতান্তই প্রাথমিক স্তরেরই ছিল যা কিনা সাধারণ ইমোশন থেকে আলাদা করা কষ্টকর না জানলে।
৪.
আমাদের দেশের বাকি মায়েদের কিন্তু এই সৌভাগ্য খুব কমই জোটে। কারণ মেয়েরা তো এমনিতেই অবহেলিতই, সেখানে আলাদা করে আবার সন্তানের জন্মপরবর্তী সেবা, সে তো ভাবাই যায় না!! কিন্তু এখন জানার সময় হয়েছে। সন্তান প্রসবের আগে ও পরে যে মানসিক সমস্যাগুলি দেখা দেয় তাকে পোস্ট-পার্টাম সাইকোসিস বা পিওরপেরল সাইকোসিস বলে। মনোরোগের ইতিহাস থাক বা না থাক, যে কোনও নারীই পোস্ট-পার্টাম সাইকোসিসের শিকার হতে পারেন। সেই নারী, তাঁর স্বামী এবং তাঁর পরিবারের জন্যে এটি একটি ভয়ঙ্কর অভিজ্ঞতা হতে পারে। 
৫.
পোস্ট-পার্টাম সাইকোসিস আসলে কেন হয় বলুন তোপোস্ট-পার্টাম সাইকোসিসের শিকার হওয়া কোনও অপরাধ না এবং সম্পর্কে টানাপোড়েন বা মানসিক উদ্বেগের সাথেও এর কোনও যোগাযোগ নেই। এই সমস্যা সাধারণত শরীরে হরমোনের তারতম্য বা অনিদ্রা থেকে দেখা দিতে পারে। প্রসবের পরের এক সপ্তাহে হরমোনের প্রভাব ও মানসিকভাবে একজন মায়ের অনুভূতিগত আচরণে কিছু তারতম্য লক্ষ্য করা যায়। বেশিরভাগ মা এই সময় অতিরিক্ত আবেগান্বিত এবং অবসাদে ভুগতে থাকেন। এছাড়া হঠাৎ কেঁদে ফেলা, খিটখিটে মেজাজ, অযথা উদ্বিগ্নতা, খিদে কমে যাওয়া, মাথা ব্যথা বা ভুলে যাওয়ার মতো সমস্যায় পড়েন। এগুলিই মূলত পোস্ট-পার্টাম এর লক্ষণ।
৬.
অামার মতে মূল চিকিৎসা হলো- পাশে থাকা। কাছের মানুষগুলোর বুঝতে হবে যে, মেয়েটি একটি এমন সময়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে যা কিনা তার আগের জীবনের চেয়ে অনেক ভিন্ন। তাকে মানিয়ে চলা শেখানোর আগে বরং তাকে আগলে রাখা শিখতে হবে আমাদের। অনেকেই বলবেন যে, কি জানি বাবা, আমাদের সময় তো ১০ জন বাচ্চা হতো, কই এমন তো শুনিনি, দেখিনি! এর কারণ হলো, সেই মেয়েদের প্রতি অবহেলাই দায়ী। ঘরের বউয়ের বাচ্চা হয়েছে, যেমন সব মেয়েরই হয়। তাই না? এতো সময় কই তার খবর নেবার?
প্রাচীন চীনে তো এমনও হয়েছে যে, ক্ষেতে কাজ করতে করতে ব্যথা উঠেছে, একপাশে গিয়ে বাচ্চা কোনমতে বের করে, পরেরদিন থেকেই আবার হাড় ভাঙ্গা কাজে নেমে পড়তে হয়েছে।
আসলে কী বলুন তো…..  আমরা আসলে দীর্ঘদিনের দেখার চোখ, বোঝাপড়ার অভ্যাস এসব থেকে বের হতেই যেন পারি না!! এসবকে ঐতিহ্যের মতো কেবলই আগলে ধরে রাখতে চাই। ফলে কত সংসার ভেঙ্গে যায়, কত জীবন হতাশায় ছেয়ে যায় তার খবর কে রাখে? আসুন, নিজের ঘর থেকেই শুরু করি সেই সদিচ্ছা…. একজন নতুন মাকে দায়িত্বের শিকলে আবদ্ধ না করে তার ছোট ছোট ভাল লাগা গুলিকে যত্ন করি, প্রাধান্য দেই, তার পাশে থাকি।
লেখক: ঈশিতা বিনতে শিরীন নজরুল 
ম্যানেজার রিসার্চ এন্ড এডভোকেসি
বিএনডব্লিউএলএ
লেখাটি ভাল লাগলে শেয়ার করুন:
  •  
  •  
  •  
  • 4
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    4
    Shares

লেখাটি ৬,১৫৭ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.