সব মায়েরাই এমন নিঃস্বার্থ হয়

0

রামিছা পারভীন প্রধান:

কতোই বা বয়স হবে, পঞ্চম শ্রেণী শেষ করে একটি মেয়ে কেবল সিক্সে উঠবে, ঠিক সে সময় তাঁকে বিয়ের পিঁড়িতে বসতে হলো বাবা-মায়ের পছন্দ অনুযায়ী। যেই সময়টা তার খেলার বয়স, বিয়ে কী জিনিস সেটাই সে বুঝতো না। তারপর বিয়ে হলো নিজের সংসারে হাল ধরলো, সেই যে অক্লান্ত পরিশ্রম শুরু করলো, আজও করে চলছে……।  

জীবনের হিসাব-নিকাশ সে কোনদিন করেনি, তার কোনো চাওয়া-পাওয়া নাই, কোনো কিছুই সে কারো কাছে কখনও আশা করেনি, এখনও করে না, শুধু জানতো, ‘আমার ছেলেমেয়েকে মানুষ করতে হবে’-  এই কঠিন যুদ্ধ তাঁকে চালিয়ে যেতে হবে। সেই যুদ্ধে কিছুটা হলেও সে জয়ী হয়েছে। সে তার সব ছেলেমেয়েকে উচ্চ শিক্ষিত করেছে, সমাজে তারা মোটামুটি প্রতিষ্ঠিত, এটাই তার শান্তি। সে আর কেউ না, সে আমার মা।

আমার মা প্রায়ই গল্পের ছলে বলে, তাঁর পড়ালেখার খুব ইচ্ছে ছিল, তাঁর এই অভাব বোধটা আমি অনুভব করতে পারতাম। বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় ছুটি শেষ করে যখন বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্দেশ্যে বাসা থেকে বের হতাম, তখন আমার মায়ের অস্থির মুখটার মাঝে এক ধরনের তৃপ্তি খুঁজে পেতাম। তা হলো, আমার মেয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ে, আমি যা পারিনি, আমার মেয়ে তা পারবে।

আমরা এখনকার মেয়েরা অনেক স্বপ্ন দেখি, অনেক ইচ্ছার কথা জানাই, কিন্তু আর পঞ্চাশ বছর আগের কথা, যেখানে আমাদের মায়েদের স্বপ্ন দেখার কোনো সাহস ছিল না বা ইচ্ছা থাকলেও সেগুলো ডানা মেলতে পারতো না। তাদের মনের কথাগুলা প্রকাশ করার মতো সে সময় তেমন কোনো মাধ্যম ছিল না। সেদিক থেকে উইমেন চ্যাপ্টারকে অনেক ধন্যবাদ জানাই । যেখানে মেয়েদের উন্নয়ন, আন্দোলন, নির্যাতন, না বলা অনেক কথাই এখন উঠে আসে। আমরা এখনকার মেয়েরা একটু হলেও প্রতিবাদ করতে পারি যে, না আমি পড়ালেখা চালিয়ে যেতে চাই, এখন বিয়ে করতে পারবো না। কিন্তু সে সময় এটা ছিল অসম্ভব। খুব বেশি বয়সের কথা বাদ দিলাম, আমি যদি আমার মায়ের বয়সি খালা, মামি, চাচীদের মনের কথা জানতে চাই, দেখবেন তাদের ইচ্ছেগুলো একটু ভিন্ন হলেও আমাদের চেয়ে কম না।

এই যে সামনে ঈদ আসতেছে, আমার  মা  আগে থেকে ঘর দোর পরিষ্কার করে রাখবে,  ছেলে মেয়ে, জামাই, বউমা কোথায় ঘুমাবে, কি খাবে, তাদের জন্য কি আয়জন করবে, এসব তার মধ্যে ঘুরপাক করবে, ছেলে মেয়েদের আসার খবর শুনলে একটু পর পর বাহিরে বের হয়ে দেখবে তারা আসতেছে কিনা, যতোই শরীর খারাপ লাগুক, এসব আনন্দই সে করবে যার  মধ্যে বিন্দুমাত্র কোনো স্বার্থ নেই। আমার মনে হয় শুধু আমার মা না প্রত্যেক মা তাই করে। কোন কিছু দিতে চাইলে বলে ‘থাক, আমার লাগবে না, তোরা ভালো থাক’।

মাকে যখন প্রশ্ন করতাম, মা বাবার কাছে কোনো চাওয়া পাওয়া নাই? মা একটি কথাই বলতো, তোমার বাবা যে আমার সব ছেলেমেয়েদের পড়াশুনা চালিয়ে গেছে, এটাই আমার পরম পাওয়া। সব মায়েরাই মনে হয় এমন নিঃস্বার্থ হয়। নিজের সব চাওয়া পাওয়াগুলো সন্তানের চাওয়া-পাওয়ার কাছে বিলীন করে দেয়। এতেই বুঝি তাঁদের পরম সুখ। শত কষ্ট হলেও সব মা-ই সন্তানের মুখের দিকে চেয়ে মুখ থুবড়ে সংসারে পড়ে থাকে।

আমি বিপদে পড়লে আমার মাকে আগে ফোন দেই। কারণ আমি জানি, মায়ের দোয়া বা আশীর্বাদের বিকল্প নেই, এটাই আমার অনেক ভরসা। সন্তান যতো অপরাধই করুক, মা তাঁকে সবসময় ক্ষমাস্বরূপ দৃষ্টিতে দেখে। আমরা সন্তানরা কোনো সমস্যায় পড়লে আগে আমাদের মায়ের মুখখানা মনে পড়ে। মাকে বলা মানেই আমাদের অনেক সমস্যার সমাধান হয়ে যাওয়া ।

মায়েরা মনের দিক দিয়ে অনেক শক্তিশালী  হয়, তাঁদের মনের শক্তি দিয়ে আমরা চলি। আমাদের মায়েদের অনেক অজানা ইচ্ছা,  চাওয়া- পাওয়া থাকতে পারে, আমরা সন্তানেরা সেগুলো খুঁজে বের করে কিছুটা হলেও যেন সেই অতৃপ্ত মনটাকে তৃপ্ত করতে পারি ।

লেখাটি ভাল লাগলে শেয়ার করুন:
  •  
  •  
  •  
  • 2
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    2
    Shares

লেখাটি ১,৪০৯ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.