‘বি আ ফাদার, নট জাস্ট আ স্পার্ম ডোনার’

0

নাদিয়া ইসলাম:

আমার মাদারউদ্দিন ক্ষেইপা গেলেই বলেন, “তুমি আর তোমার বাবা দু’জনেই এক্সাক্টলি একই জিনিস! তোমাদের নিয়ে আমি পারি নাহ্‌!” সেই ‘নাহ্‌’ এর উপর সবসময় তিন আলিফ লম্বা হসন্ত থাকে। আমি বুঝি ঘটনা সত্যি।

আমার চেহারা আমার বাপের মত চমচম মার্কা গোলালু মার্কা ত্যাড়াব্যাড়া, আমরা দুইজনেই কবজি ডোবানো ঝোলে সাঁতার দেওয়া ছাড়া ভাত খাইতে পারি না, আমরা দুইজনই সার্কিট বোর্ড জোরা দিতে আর ঘরের ইলেক্ট্রিক্যাল তার ইনসুলেশান টেপ দিয়া প্যাঁচাইতে ভালোবাসি, আমাদের দুইজনের কেউই আমাদের পাশের মানুষের গায়ে হাত পা না দিয়া বসতে পারি না, আমরা দুইজনেই নিজ নিজ এলাকায় বেয়াদব এবং ঘরের খায়ে বনের মোষ তাড়ানো রাখাল হিসাবে পরিচিত, আমরা দুইজনেই প্রচুর হাসি এবং প্রচুর কান্দি।

যদিও, আমার বাপের কান্দার পরিমাণ আমার চাইতে বেশি; আমার দৌড় রবিন হুড পর্যন্ত, আমার বাপ শাবানারে “ওগো আমাকে ছেড়ে যেও নাগো” বইলা আছাড় দিয়া বিছানায় পড়তে দেখলেও কান্দেন।

কেউ একজন বলছিলেন পৃথিবীতে খারাপ মানুষ অসংখ্য, কিন্তু খারাপ বাবা একটাও নাই। সম্ভবতঃ হুমায়ুন আহমেদের কথা। আমার নিজের বাপরে দেখলে আমার অবশ্য এই কথাটা বিশ্বাস করতে মন চায়। আমার বিশ্বাস করতে ইচ্ছা হয় পৃথিবীর সব বাবা সুপারম্যান, সব বাবা আমার বাপের মত বাচ্চার বাইসিকেলের পিছন পিছন দৌড়ান, সব বাবা ঘুমানোর আগে প্রগতি প্রকাশনার বামপন্থী মোটা মোটা রাজনীতির হাবিজাবি পইড়া শোনান- যেই বই দুই লাইন শেষ হওয়ার আগেই ঘুম চইলা আসে, ঘুম না আসলেও যেই বই দেখলেই চোখ অটোম্যাটিক বন্ধ হইয়া যায়, আর সব বাবাই পায়ের উপর বিশ কেজি ওজনের বুশ পড়ার পর থ্যাঁতলানো রক্তাক্ত নখ আর ভাঙ্গা হাড্ডি নিয়া হাসিমুখে বলেন, “সব ব্যথাই মানসিক, বাবা!” আর সব বাবাই জানেন তার বাচ্চার প্রিয় ফল কোন্‌টা, সব বাবাই তার বাচ্চার গ্র্যাজুয়েশানের দিন- বিয়ার দিন কান্দেন। আমার বাপের মত হয়তো দুই লাইন বেশিই কান্দেন।

তারপরই আমার একমাত্র বড় ভাইয়ের কথা মনে হয়। আমার বাপই আমার অসম্ভব সুন্দর ছবি আঁকতে পারা ভাইরে চারুকলায় পড়তে দেন নাই। আমার বাপই অংকে কম নাম্বার পাওয়ার জন্য আমার ভাইরে বাসা থিকা বাইর হইয়া যাইতে বলছিলেন। আমার বাপই আমার ভাইয়ের সাথে আমার রেজাল্টের তুলনা দিয়া প্রতিনিয়ত বলছেন আমার ভাইরে দিয়া কিছুই হবে না।

তারপর আমার মনে হয় আমার বন্ধু দেবপ্রিয়া বসুর বাপের কথা, যিনি ক্রিকেট খেলার অপরাধে দেবপ্রিয়ার ১৩ বছরের ভাই কণকরে সম্পূর্ণ ন্যাংটা কইরা বাড়ির সামনে দাঁড় করায়ে রাখছিলেন সারা দিন। কণক সেই রাতে আত্মহত্যা করছিলেন। তারপর আমার মনে হয় লন্ডনের কেইস-ফাইলের কথা, নিজের বাবা তার ৪ বছরের কন্যাসন্তানরে ধর্ষণ করছিলেন একটানা কয়েক বছর। আমার মনে হয় আমার বন্ধু লী ম্যাকব্রাইডের কথা, যার বাপ উনারে ছাইড়া চইলা গেছিলেন উনার ২ বছর বয়সে।

আমার মনে হয় পত্রিকায় পড়া অসংখ্য নাম না জানা বাপদের কথা, যারা মেয়ে বাচ্চা জন্ম দেওয়ার অপরাধে মা’দের তালাক দিয়া চইলা গেছেন, মেয়ে বাচ্চারে পেটের ভিতর খুন করছেন, নিজের বাচ্চারে বিক্রি কইরা দিছেন, মনে হয় আমার বন্ধুদের বাপদের কথা, যারা নিঃশব্দে আমার একেকজন বন্ধুরে মানসিকভাবে পঙ্গু বানায়ে দিছেন দিনের পর দিন মানসিক ও শারীরিক অত্যাচার কইরা-

আমি সম্ভবতঃ একজন সিনিক্যাল মানুষ। আমি শুধু ভালো শুধু সুন্দর শুধু নিষ্পাপ জিনিস দেখতে পাই না। হ্যাঁ, সবার বাবা নিশ্চয় সবার কাছে অসাধারণ মানুষ, কিন্তু সেই অসাধারণত্ব কি আমরা দেখি শুধুমাত্র আমাদের ভালোবাসার চোখ আছে বইলা? আমার ভাই নিশ্চয় আজকে আমার বাপরে ‘হ্যাপি ফাদার্স’ ডে’ লেখা কার্ডে সুন্দর সুন্দর কথা লিখা পাঠাইছেন। হয়তো উনি কাউরেই সেই অপমানের দিনগুলির কথা বলবেন না, কিন্তু উনার মাথার ভিতরের মেমরি সেলের কোনো ফার্মগেটের চিপায় চাপায় ঘায়ের মত কী সেই কথাগুলি নাই? একেবারেই নাই?

জন্ম দিলেই বা কয়েক মিলিলিটার স্পার্ম ডোনেট করলেই কী বাপ হওয়া যায়? আমার বন্ধুদের অনেকেই বাপ হইছেন কিছুদিন হইলো। পিঠে কান্ধে বুকে প্র্যামে ল্যাগব্যাগ করা পেটমোটা বাচ্চা নিয়া তারা ফেইসবুকে ছবি দেন। আমার ভালো লাগে সেইসব ছবি দেখতে। কিন্তু একইসাথে মনে হয়, এইসব বাচ্চারা যখন বড় হইতে থাকবেন, যখন আর উনাদের ঘাড় মাথা ল্যাগব্যাগ করবে না, তখনও কি বাপেরা সেই একই ভালোবাসায় তাদের এ্যাক্সেপ্ট করতে পারবেন? বাচ্চাগুলি যে আলাদা মানুষ, সেই কথা কি উনাদের তখনো মনে থাকবে? নাকি নিজের ব্যার্থতার দায়ভার সেইসব বাচ্চাদের উপর চাপায়া বাচ্চাদের কান্ধে কয়েক কেজি বই এবং কয়েকশ’ কেজি ‘ভালো রেজাল্ট করার, ভালো চাকরি করার, ভালো বিয়া করার’ দায়িত্ববোধ দিয়া নিজের কাজ শেষ বইলা ভাববেন?

সম্ভবতঃ আমার জেনারেশানের মানুষদের সাথে সাথেই বাপ ও সন্তানের জেনারেশান-গ্যাপের বিষয়টা শেষ হইয়া যাইতেছে। আমার বন্ধুদের বেশিরভাগরেই দেখছি মা’র কাছে গিয়া আব্দারের ও আহ্লাদের কথা কইতে এবং বাপরে ভয়ের এবং শ্রদ্ধার চোখ দিয়া দূর থিকা দেখতে। আমাদের সময়ের বাপরাও গম্ভীর গম্ভীর হইয়া আমাদের থিকা দূরে দূরে থাকতেন। উনাদের ভালোবাসার প্রকাশও হইতো গম্ভীর টাইপের। আমার জেনারেশানে আইসা যারা বাপ হইতেছেন, উনাদের সাথে উনাদের সন্তানদের সেই গ্যাপ চোখে পড়ে না। সেইটা আনন্দের বিষয়। কিন্তু ভালো বাপ হওয়ার জন্য জেনারেশান-গ্যাপ না, সাইকোলজিক্যাল গ্যাপ দূর হওয়া জরুরী, সেইটা কি আমরা মাথায় রাখি? বাচ্চারে ‘আমার বাচ্চা’ হিসাবে না, একজন স্বতন্ত্র মানুষ হিসাবে দেখা জরুরী, সেইটা কি আমরা জানি?

আমি নিজে হয়তো কোনো একদিন কোনো পেটমোটা বাচ্চার মা হইতে চাই। আমি চাই আমার বাচ্চার বাপ একজন চোর হোক, একজন অসৎ ব্যবসায়ী হোক, একজন নারীবিদ্বেষী পুরুষতান্ত্রিক মানুষ হোক, একজন অনৈতিক রাজনীতিবিদ হোক- কিন্তু একজন ভালো বাপ যেন হন- যেই বাপের কারণে আমার সন্তানরে যেন কোনোদিন অপমানিত না হইতে হয়, লজ্জিত না হইতে হয়, বাপের পূরণ না হওয়া স্বপ্ন দেখতে হবে বইলা নিজের স্বপ্নগুলিরে বুড়িগঙ্গায় ফালায়া দিতে না হয়-

গতকাল ছিল ফাদার্স ডে। পৃথিবীর সকল বাপদের আমি শুভেচ্ছা জানাইতে চাই। যারা জন্ম দিছেন, যারা জন্ম না দিয়াও বাপ হইছেন, যারা বাপ হইতে পারবেন না কিন্তু বাপের অকৃত্তিম স্নেহ পকেটে ভইরা প্রতিদিন রাস্তায় হাঁটছেন, যারা ভালোবাসা প্রকাশ করতে পারছেন, যারা ভালোবাসা প্রকাশ করতে পারেন নাই, যারা বাচ্চাদের বাই সাইকেলের পিছে দৌড়াইছেন, যারা বাই সাইকেলের পিছে না দৌড়ায়েও দূর থিকা বাচ্চার হাঁটুর দিকে নজর রাখছেন, যারা নিজে না খেয়ে বাচ্চারে খাওয়াইছেন, যারা চুরি কইরা আনা টাকায় বাচ্চারে পালছেন, যারা নিজের বাচ্চার লাশ কান্ধে নিয়া হাঁটছেন- তাদের সবার জন্য ভালোবাসা।

কিন্তু যারা জন্ম দিয়া বাপ হইতে পারেন নাই, যারা নিজের বাচ্চারে ধর্ষণ করছেন, যারা নিজের বাচ্চারে হত্যা করছেন, যারা নিজের বাচ্চারে মানসিকভাবে পঙ্গু বানাইছেন, যারা নিজের বাচ্চারে ফালায়ে চইলা গেছেন, যারা নিজের বাচ্চার মনের কাছে পৌঁছাইতে পারেন নাই, যারা নিজের বাচ্চারে মানুষ মনে করেন নাই- তারা বাবা হইতে পারেন নাই কোনোদিন। তারা স্পার্ম ডোনার হইতে পারছেন, তারা জন্ম দিতে পারছেন, কিন্তু বাবা হইতে পারেন নাই। তাদের জন্য আমার করুণা।

তাই হ্যাপি ফাদার্স ডে টু অল দ্যা ড্যাডস এভরিহোয়্যার!

তাই হ্যাপি মুড়ি খাওয়া দিবস টু অল দ্যা বীর্যদাতা বাপ না হইতে পারা মানুষেরা! আপনারা মুড়ি খান এবং আর কোথাও বীর্য ঢালবেন না বইলা প্রতিজ্ঞা করেন। পৃথিবীতে কনডমের দাম এখন খুব কম।

লেখাটি ভাল লাগলে শেয়ার করুন:
  • 3.1K
  •  
  •  
  • 5
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    3.2K
    Shares

লেখাটি ১৪,৬১৫ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.