বাবা যখন সূর্য, সেই আলোকেই আঁকড়ে থাকতে চাই

0

বিথী হক:

অনেকদিন ধরে মা বলছিল বাবাকে নিয়ে জুতোর দোকানে যেতে। তেমন একটা গুরুত্ব দেইনি। ভেবেছি জুতোই তো, চলছে যখন চলুক না। সময় বের করতে পারছিলাম না, এটাও একটা বড় কারণ অবশ্য। তো, সেদিন ছুটির দিন হঠাৎ মনে পড়লো বাবাকে নিয়ে জুতো কিনতে যেতে হবে।

গেলাম জুতোর শোরুমে। গিয়ে বাবার পায়ের দিকে তাকিয়ে লজ্জায় মরি মরি টাইপ অবস্থা। পায়ে বোধ হয় ৫ বছর আগের শেওলা ধরা কালচে হয়ে যাওয়া চামড়ার চটি। তার ওপর জুতো খুলে নতুন জুতো ট্রাই করার সময় হঠাৎ চোখে পড়ল কালো রং এর প্যান্টে ডান পায়ের কাছে নীল সুতো দিয়ে সেলাই করে আটকানো হয়েছে ছিঁড়ে যাওয়া অংশটুকু।

সেলসম্যান বাবার পায়ে জুতো পরিয়ে দেওয়ার সময় একবার করে আমার পায়ের দিকে, ভাইয়ের পায়ের দিকে এবং বাবার পায়ের দিকে তাকাচ্ছে। বেচারা বোধ হয় বিশ্বাসই করতে পারছিল না এরকম জুতো পায়ে কেউ কি তাদের শোরুম থেকে জুতো কিনবে কি না। ব্র্যান্ডের জুতো পায়ে দিয়ে আমরা দু’ভাইবোন গিয়েছি আমাদের জন্যই ক্ষয় হয়ে যাওয়া বাবার জুতো কিনতে, আর জুতো দেখে সেলসম্যান নিশ্চিত হতে পারছে না।

নিজের প্রতি নিজের রাগ, ক্ষোভ, অভিমান মিশে জল হয়ে গেল। মনে মনে ভাবলাম আজ বাবার পছন্দের সব জুতো কিনে ফেলবো। কিন্তু জুতোটা তো বাবার জন্যই কিনবো, তাদের তো আর আমাদের মতো ম্যাচিং ম্যাচিং জুতো লাগে না। তবু শেষ র্পন্ত অনেক জোরাজুরি করে দু’জোড়া জুতো কিনলাম। জুতো কিনে বাসায় ফেরার সময় বারবার ছোটবেলার কথা মনে পড়ছিল। আমার জন্য জুতো কিনে কি বাবা এমন আনন্দই পেতেন, আমার এই মুহূর্তে যে আনন্দ হচ্ছে! বাবারও কি মনে হত আমার জন্য পৃথিবীর সব জুতো কিনে ফেলবেন?

তারপর মনে পড়ল বাবার ওভার সাইজ জামা-জুতো কেনার গল্প। মনে পড়লো ঈদের দিন খুব সকালে স্টেশন বাজার থেকে দোয়েল পাখির মতো টুনটুন করে বাজতে থাকা নকশা করা হলদে জামার কথা। মনে করার চেষ্টা করলাম, তখন বাবার পায়ে কেমন জুতো ছিল?

আজকের জুতো দু’পাটিতে মোট ১১টা পেরেক ছিল, আর ছিল অসংখ্য সেলাই। অথচ আমি কখনো এমন জুতো তো পরি না। আমি কি তবে স্বার্থপর হয়ে যাচ্ছি? নিজের জীবন নিয়ে এতই ব্যস্ত হয়ে পড়েছি যে বাবার কী লাগবে সেটা ভাবারও সময় পাই না? অথচ আজকের এই বোল্ড এন্ড স্ট্র, আদর্শের পতাকা, নিজের পায়ে দাঁড়িয়ে নিজের সিদ্ধান্ত নেওয়ার শক্তিগুলো বাবাই দু’হাত ভরে আমাকে দিয়েছিলেন।

আমার জন্য আমার পৃথিবী মানেই বাবা, বাবাকে বাদ দিলে ভাগশেষ আমি আর কোথাও থাকি না। এই যে সারাজীবন কিপ্টে ভেবে যাওয়া এই বাবা আমাকে পৃথিবীর সমস্ত শক্তি দিয়েছিলেন বলেই এখনো মেরুদণ্ড সোজা করে মানুষের মতো বাঁচি, বন্দুকের নলের সামনে দাঁড়িয়ে সত্য বলার সাহস পাই, অপমান-ভ্রুকুটি সহ্য করে, মাথায় রোদ-জল নিয়ে দৌড়াতে পারি।

বাবা তাই শুধু আমার বাবা-ই নন, বাবা সূর্য। প্রাণ ফোটার পর থেকে আজোবধি যিনি আলোকিত করে রেখেছেন আমার মন-প্রাণ, ঘর-দোর। শুধু আজকের দিন নয়, সারা বছর সারা জীবন আমি বাবাকে হৃৎপিণ্ডের ভেতর বয়ে নিয়ে চলি। দিনশেষে কী ভয়াবহ একাকীত্ব শুধু বাবার জন্য মুখর হয়ে ওঠে।

ঈশ্বর বলে কেউ থাকলে তার কাছে আমার একটাই প্রার্থনা, বাবার জীবনের সঙ্গেই জুড়ে থাকুক আমার জীবন। একসঙ্গেই বাঁচতে চাই, মরতেও চাই। র্সূহীন কোন পৃথিবীতে আমি কোনদিন বাঁচতে চাইব না।

পেরেক ঠুকে বা না ঠুকে জুতো পরা সমস্ত বাবাকে ভালবাসি

লেখাটি ৯৩৭ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

RFL
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.