বাবা কেবল বাবা-ই, বাবা কখনও ‘পুরুষ’ নয়

0

শাকিল মাহমুদ:

বাবা হওয়া খুব সহজ নয়। কয়েক ফোটা বীর্য ব্যয় করে একটা সন্তান জন্ম দিলেই বাবা হওয়া যায় না। বাবা হতে জীবনের পুরোটা সময় ব্যয় করতে হয়। স্রোতের উল্টো দিকে হেঁটে বুক টান করে দাঁড়িয়ে সন্তানের মায়ের দু:খ, নিপীড়ন দূর করার সঙ্গী হতে হয়। তবেই না বাবা হওয়া যায়।

কিন্তু আমাদের সমাজে যারা নিজেদের বাবা বলতেই কবুতরের মতো গলার পশম ফুলিয়ে বাক বাকুম হয়ে যায় তারা কি আদতে বাবা, নাকি এই পুরুষতন্ত্রের পুরুষালী খাবার খেয়ে হৃষ্টপুষ্ট হওয়া পুরুষ? আমরা পুরুষকে বাবা বলে সম্বোধন করি, সম্মান করি। কিন্তু পুরুষ কি বাবা হওয়ার যোগ্য? সম্মান পাওয়ার যোগ্য?

সম্ভবত আমরা এ বিষয়গুলো না ভেবেই একটা পুরুষকে বাবা সম্বোধন করি। কারণ তার কয়েক ফোঁটা বীর্য আমার জন্মের কারণ। কিন্তু মানুষ হয়ে বেড়ে ওঠায় কি কয়েক ফোটা বীর্য- ই যথেষ্ট? ভূমিষ্ঠ হওয়ার পর ধীরে ধীরে বেড়ে ওঠা, বৈষম্যহীন হয়ে নারীকে মানুষ ভাবতে নিজের মানুষ হয়ে ওঠা; এসব কি একজন বাবার দায়িত্ব নয়? শুধু বীর্য দিয়ে খালাশ! বাবা হওয়া যায়?

আমি যখন আমার বাবাকে দেখি প্রতিদিন রাতে আমার মায়ের চুল ধরে মারতে, খেতে খেতে মায়ের চৌদ্দগুষ্ঠি উদ্ধার করে দিতে; তখন সেই ব্যক্তি কি আমার বাবা হয়ে আমার কাছে সম্বোধিত হবে?

একজন বাবার দায়িত্ব কেবল বীর্য দানেই শেষ হয় না। একজন বাবা কখনও পুরুষ হতে পারে না, যদি পুরুষ হয় তবে সে সন্তানের কাছে পুরুষ-ই; বাবা নয়। বাবা ঠিক তারা, যারা স্রোতের উল্টো দিকে দাঁড়িয়ে সন্তানকে প্রথা ভাঙার গান শোনায়। পুরুষতন্ত্রের চোখ রাঙানি ভয় না করে নিজের স্ত্রীকে নারী রূপে ভোগ করে না, নিপীড়ন করে না; মানুষ রূপে সম্মান করে, সহযোদ্ধা হয়ে পাশে রয়ে সাহস জোগায়।

আমার বাবাকে কখনও আমি বাবা বলিনি। তার বুকে পরম ভালবাসা খুঁজে ঝাঁপিয়েও পড়িনি। কেননা আমার বাবাকে আমি কখনও বাবা রূপে দেখিনি; বরং একজন পুরুষ রূপেই তিনি পরিচিত হয়েছেন। প্রতিদিন গর্ভধারিনী মাকে মেরে, গালি দিয়ে যেমন সহযোদ্ধা হতে শোষক স্বামী রূপে মায়ের কাছে পরিচিত হয়েছেন, তেমনই পুরুষতন্ত্রের হাওয়া-বাতাসে হৃষ্টপুষ্ট পুরুষখানি বীর্য দান করেই খালাস হয়ে সকল দায় এড়িয়ে বাবা থেকে পুরুষ হয়েছে।

সুতরাং বাবা কখনও পুরুষ হতে পারে না। বাবা সে তো বাবা-ই। বাবা দিবসে সে সকল বাবাকে সম্মান জানাই, যারা পুরুষ বাবা নয়, সত্যিকারের বাবা হতে পেরেছেন। উল্টো স্রোতে চলে সন্তানকে মানুষ করে গড়ে তুলেছে, স্ত্রীর কাছে সহযোদ্ধা হয়ে উঠেছে।

সে সকল বাবাদের স্মরণে মাথা নত করি। “আমি সে সকল বাবাদের চরম ঘৃণা করি, যারা আমার মায়েদের ওপর নির্যাতন চালিয়ে হ্যাডমওয়ালা পুরুষ ও আমার কাছে আমার বীর্যদাতা পিতা হতে গিয়ে একজন পুরুষ-ই রয়ে যায়। আমি সে সকল বাবাকে বাবা দিবসের শুভেচ্ছা জানাই, যারা স্বামী নয় সহযোদ্ধা হয়ে উঠে। আমি শ্রদ্ধায় মাথা নোয়াই সে সকল বাবার সামনে, যে বাবা বন্ধু হয় সন্তানের সামনে দাঁড়িয়ে, প্রথার বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে সন্তানকে সমাজ ভাঙার পথ দেখায়।”

লেখাটি ভাল লাগলে শেয়ার করুন:
  • 437
  •  
  •  
  • 2
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    439
    Shares

লেখাটি ১,২৩৮ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.