পাহাড়িদের কান্না আদৌ থামবে কি কখনও?

0

প্রমিতা চাকমা:

লিখবো লিখবো করে কিছু কাজ থেকে নিজেকে বিরতি দিয়ে কিছু লিখতে বসলাম। একটার পর একটা ঘটে যাওয়া মর্মাহত, শোকাহত আমার পাহাড় আর আমার নিজ জাতি পাহাড়িদের কথা তা সত্যি আমার অজানা। আজ পাহাড়-পাহাড়িদের কান্না আমাকে লিখতে বাধ্য করছে। আমার মতো অনেকে আছে যারাও কখনো লিখেনি, কিন্তু তারাও তো আজ লিখতে বসেছে আমার মতো করে পাহাড় এবং পাহাড়িদের কান্না সহ্য করতে না পেরে।

যারা লিখছে চারিদিক হাহাকার আর কান্নায় ভরা আমাদের পাহাড় আর পাহাড়িদের কষ্টের কথা, প্রতিবাদের কথা, সে হোক পাহাড়ি, হোক মন থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন বা বাঙালী, যারা এখনো ভালবাবাসে আমাদেরকে আর পাহাড়কে, তাদেরকে আমি আমার মন থেকে কৃতজ্ঞতা জানাই। 

আমি সব বাঙালীকে উদ্দেশ্য করে কোনো কথা বলবো না। তাদেরকেই বলবো যারা আমাদের এই করুণ পরিস্থিতির একমাত্র কারণ। যারা ধ্বংস করতে চায় আমাদেরকে, আর আমরা যারা বছরের পর বছর আঁকড়ে ধরে আছি আমাদের পাহাড়কে। যার বিশুদ্ধ বাতাসে আমরা সতেজ হই, যার গন্ধে মিশে আছি আমরা। উঁচু-নিচু পাহাড় আর বিভিন্ন প্রজাতির গাছগাছালির রূপ দেখে কেটে যায় আমাদের পুরো দিন। রাত হলেই নামে অন্ধকার, কোনো ঝামেলা নেই, আছে শুধু কিছু ঝিঁঝি পোকার ডাক।

কেন রে তোরা (নরপিশাচ বাঙালী) শেষ করতে চাস আমাদের? ভেঙ্গে দিতে চাস বছরকে বছর আঁকড়ে ধরে থাকা এই পাহাড়কে? কেড়ে নিতে চাস আমাদের শান্তির নীড়, জায়গা জমি, বসত বাড়ি! আমরা তো শহরকে ছেড়ে পাহাড়কে ঘিরেই বাঁচতে চাই। যোগাযোগ বিহীন, সুযোগ-সুবিধাহীন হয়ে পড়ে আছি পাহাড়ের কাছে। শুধু জায়গাজমি, বসত বাড়ি কেন, তোরা তো আমাদের পাহাড়ি মেয়েদেরও ছাড়িস না। এতো ক্ষমতা, এতো দম্ভ, এতো জ্বালা তোদের! তোরা তো নিজের জাতের মা-বোনকে পর্যন্ত ছাড়িস না, আমাদেরকে কীভাবে ছাড়বি? তোরা তো নরপিশাচ। তোরা শকুন।

আর যারা ভালবাসে আমাদের পাহাড়কে, আমাদেরকে, যারা বুঝে পাহাড়ের নরম শীতল অম্লান হাসি আর কান্না, যারা এই পরিস্থিতিতে আমাদের হয়ে কথা বলছে, আমাদের পাশে থেকে আমাদের সাহস জোগাচ্ছে, সেই বাঙালী ভাইবোনদেরকে জানাই ভালবাসা আর গভীর শ্রদ্ধা। আজ যদি আপনাদের ক-জনের মতো সবাই বুঝতো, তাহলে এই দিনটি আমরা কেউ দেখতাম না।

মূল কথাটাই তো এখনো শুরু করতে পারিনি।

সংখ্যার দিক থেকে আমরা বাঙালীদের থেকে পিছিয়ে। বাংলাদেশের চার ভাগের এক-অর্ধাংশে আমাদের বাস। কিন্তু তাও আমাদের থেকেই কেড়ে নিতে চায় সবকিছু (যা যা আমাদের আছে)। আজ অবধি অনেক কিছু আমাদের সাথে ঘটে যাচ্ছে, কিন্তু এই ঘটে যাওয়ার কোনো প্রতিকারই সরকার (মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা) করতে পারেননি। পারবেনই বা কোথা থেকে? করারই তো চেষ্টা করেননি।

আমি বেশি কিছু উল্লেখ না করে কয়েকদিন আগে ঘটে যাওয়া রমেল হত্যা থেকে শুরু করতে চাই। রমেল চাকমা একজন নিরীহ মধ্যবিত্ত পরিবারের মা-বাবা আর ভাইবোনের আদরের মণি ছিল। যে নিরপরাধ হয়েও নিজের জীবনকে শকুনের হাত থেকে রক্ষা করতে পারেনি। ওর মনে অনেক আশা ছিল, বড় হওয়ার আশা। কিন্তু সেই আশাকে আজ গলা টিপে হত্যা করে দিলো কিছু নরপিশাচ/শকুনেরা (সেটেলার বাঙ্গালীরা)। মা বাবা, ভাইবোনের বুক খালি করে পাঠিয়ে দিলো রমেলকে মাটির নিচে।

কী দোষ করেছিলো সে? রমেল হত্যার পর্ব শেষ হতে না হতেই আর এক পর্ব শুরু হলো লংগুদু বাসিদের নিয়ে। জ্বালানো আগুন না নিভতেই সেই আগুনে কেরোসিন ঢেলে দিয়ে আগুনটাকে করা হলো সতেজ। পুড়িয়ে দিলো কয়েক শত মানুষের ঘর। সেইসাথে পুড়ে গেলো কয়েকজন। তারা আদৌ মানুষ ছিল কীনা, তা সেটেলাররাই বলতে পারবে ভালো।

আজ তাদের মাথার উপরে ছাদ নেই। মাথা গোঁজার ঠাঁই নেই। আজ তারা অন্ন, বস্ত্র,বাসস্থান, শিক্ষা, চিকিৎসা সবকিছু থেকে বিচ্ছিন্ন। তাদের দিকে তাকানোর মতো কেউ নেই। যেই দেশে আমাদের বাস, সেই দেশের দেশপরিচালক একবারও এসে দেখে যাননি তার দেশে চার ভাগের এক-অর্ধাংশে বাস করা পাহাড়,পাহাড়িদের কী করুণ অবস্থা!

আশার কথা বাদই দিলাম, কিন্তু দূর থেকে থেকে কী এইগুলোর প্রতিকার করার মতো সাধ্য নেই উনার কাছে? আমরা তো উনার দেশেরই নাগরিক, নাকি? এই বাংলাদেশের জন্য ১৯৭১ সালে যে মুক্তিযুদ্ধ হয়েছিলো, সেখানে কি আমাদের কোনো অবদান ছিল না? 

লংগুদু ঘটনার পর টানা ২/৩ দিন ভারি বর্ষণে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত অঞ্চল রাঙামাটি সবদিক থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। যোগাযোগ বিহীন, খাদ্য সংকট এখন মারাত্মক। দ্রব্যমূল্যের দাম দ্বিগুণ বেড়ে গেছে। মানুষ একদিকে হারিয়েছে বসত বাড়ি, হারিয়েছে পরিবার, হারিয়েছে বেঁচে থাকার মতো তিলে তিলে গড়া ভবিষৎ সম্বল। আর সেই জায়গায় মানুষ কী করে এতো দামে কিনবে তার খাবার?

পাহাড় আজ কাঁদছে, কাঁদছে পাহাড়ের মানুষ। এই কান্না কি শুনতে পান না আমাদের দেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা? উনি কী করে তার দেশের চার ভাগের এক-অর্ধাংশে বাস করা পাহাড়ি আর পাহাড়ের এই করুণ অবস্থায়ও অবিচল, স্থির হয়ে আছেন? শুনতে পাচ্ছি নানা পদক্ষেপ  নেয়া হচ্ছে সরকারিভাবে, কিন্তু কোথায় সেগুলো?

এই এমন দিনে আমাদের পাশে থাকাটা কি উনি প্রয়োজন মনে করছেন না? আজ যদি বাঙালীদের ক্ষেত্রে এরকম হতো, তাহলে সাথে সাথে লোক পাঠাতেন, পরিস্থিতি নিরূপণের জন্য। ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় গিয়ে ডান হাত তুলে আশ্বাস দিয়ে আসতেন, আর আশ্বাস দিয়ে বলা কথাগুলোও রাখতেন। বাঙালীদের বেলায় ষোল আনা, আর আমাদের বেলায় এক আনাও তো নেই! এটা আমরা কোন দেশে আছি? আমাদের দেশ পরিচালনা করেন কে?

যে দেশ পরিচালনা করেন, উনার তো মাথায় থাকার কথা যে আমি একজন দেশ পরিচালক। আমার দেশের সর্বস্তরের মানুষের জাতি, বর্ণ, ধর্ম, নির্বিশেষে সবার সকল অসুবিধায় আমার পাশে থাকাটা একান্ত জরুরি। যখন নিজেকে দেশ পরিচালনার আসনে বসাচ্ছেন, তখনতো শপথ করেই বসেছেন, তাহলে আজ শপথের মূল্যটা কোথায়? শুধু কি বাঙালীদের জন্য শপথ করেছেন?

আমরা তো মানুষ। সৃষ্টির সেরা জীব। মানুষ চাইলেই সবকিছু পারে এই ক্ষমতা মানুষের আছে। মানুষ সবকিছু করতে পারেই বলে মানুষকে সৃষ্টির সেরা জীব বলে আখ্যায়িত করা হয়। আবার মানুষের মধ্যে ও ভাগ আছে। সবাই সৃষ্টির সেরা জীব বলে নিজেকে প্রমাণ করতে পারে না। প্রমাণ করতে গেলে তার কথাবার্তা, চিন্তা-চেতনা, বুদ্ধিমত্তা, সবকিছুর দরকার পড়ে।

এই সবকিছু তো আমাদের দেশের দেশ পরিচালকের থাকার কথা। একজন রাষ্ট্রের পরিচালক হয়ে কেন শুনতে পাচ্ছেন না আমাদের এই হাহাকার, কান্নার ধ্বনি? সবকিছুর খবর তো ওনার হাতের কাছে। সব জেনেও চুপ???আমাদের এই হাহাকার,নির্মম পরিস্থিতির প্রতিকার করতেই হবে।

পরিশেষে একটা কথায় বলবো, যে দেশের দেশ পরিচালক দেশের মানুষের খবর রাখে না, সব দেখেও মুখ বুঁজে থাকে, প্রতিকার করে না, উদ্যোগ নেয় না, জাতি, ধর্ম, বর্ণের ভাগ করে সেই দেশের দেশ পরিচলককে আমরা মানি না।*

শেয়ার করুন:
  • 122
  •  
  •  
  •  
  •  
    122
    Shares

লেখাটি ৩৪৫ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.