চরিত্রের ফরমালিনে যখন সব ছেয়ে যায়

0

তনয়া দেওয়ান:

সাধারণত যারা নম্র-ভদ্র, যারা ধর্মকর্ম করে, যারা দানশীল টাইপ হয়, যারা পরিবার ও সমাজের প্রতি দায়িত্ব ও কর্তব্য পালন করে এবং যারা মুখে ভালো ভালো বুলি আউড়াতে পারে, তাদেরকে আমাদের  সমাজ চরিত্রবানের অলিখিত সার্টিফিকেট দিয়ে দেই। 

ব্যাপারটা অনেকটাই এমন, সবার অন্তরালে টেবিলের তলায় উপরি পাওনা নিতে যে লোক যত বেশি ওস্তাদ, সে লোক সমাজের চোখে ততবেশি চরিত্রবান, প্রয়োজন না থাকা সত্ত্বেও রোগীকে কিছু টেস্ট করানোর জন্য যে ডাক্তার পার্সেন্টেজের আশায় যতবেশি ডায়াগনস্টিক সেন্টারে পাঠাবে, বা সার্জারির প্রয়োজন না থাকা সত্ত্বেও বাড়তি টাকার আশায় যে ডাক্তার রোগীকে অপারেশনের টেবিলে বসাবে, সে ডাক্তার তত ভালো, অত্যন্ত চাতুরতার সাথে যে ব্যবসায়ী তার কাস্টমারকে ২ নাম্বারি জিনিস দিয়ে ধরা না খাওয়া পর্যন্ত ঠকাতে পারবে, সেও নীতিবান, যে ছাত্র পরীক্ষায় ভালো নাম্বার পাওয়ার আশায় অসদুপায় অবলম্বন করে ধরা না খেয়ে খুব ভালো সার্টিফিকেট নিয়ে আসতে পারে, সেও রেজাল্ট দিলে ভালো ছাত্রের  তকমা পায়, ঘরের চার দেয়ালের ভেতর নিজের বউকে যে নির্যাতন করে, কেউ না জানা পর্যন্ত সেও ঠিকই আদর্শবান স্বামী হয়, যতক্ষণ না একজন স্বামী তার বউয়ের কাছে প্রতারণায় ধরা খাচ্ছে, ততক্ষণ পর্যন্ত সেও একজন চরিত্রবান স্বামী, নিজের প্রেমিকা থাকা সত্ত্বেও যে আরো দশটা মেয়ের পেছনে ঘুরে, বা মেলামেশা করে, সেও দিনশেষে তার প্রেমিকা না জানা পর্যন্ত তার প্রেমিকাটির কাছে চরিত্রবান হয়।
কারোরটা প্রকাশ হয়, কারোরটা হয় না, এই আর কী!!

অর্থাৎ যতক্ষণ না পর্যন্ত কারও অপকর্ম সবার সামনে উন্মোচন হচ্ছে, ততক্ষণ পর্যন্ত সে নীতিবান, আদর্শবান, চরিত্রবান, এভাবে আমরা সমাজে তথাকথিত চরিত্রবান প্রেমিক, স্বামী, ব্যবসায়ী, ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার,  শিক্ষক থেকে শুরু করে চরিত্রবান পিয়ন, দারোয়ান, এমনকি চরিত্রবান ও নীতিবান ছাত্রেরও দেখা পায়!  

সমাজে তথাকথিত চরিত্রবানের সংখ্যা এতো পরিমাণে বেড়ে গিয়েছে যে আর কাউকে বিশ্বাস করা যাচ্ছে না, চরিত্রের মধ্যে যেমন ফরমালিন ঢুকেছে, তেমনি বিশ্বাসেও ফরমালিন।

তা না হলে দেশে এতো এতো ডাক্তার থাকতে আমরা কেনইবা আর্থিক সংগতি না থাকা স্বত্তেও বিদেশে গিয়ে চিকিৎসা নিচ্ছি,  কেনইবা ডেভেলাপার কোম্পানির বানানো বিল্ডিংয়ের মান নিয়ে সংশয়, কেনইবা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার মান নিয়ে এতো হইচই,  কেনইবা একজন বেকারকে সার্টিফিকেটের টাল নিয়ে অন্যের দ্বারে দ্বারে ঘুরতে হয়, কেনইবা যোগ্যতা থাকা সত্তেও মামা, চাচা,  টাকা না থাকার ব্যর্থতায় এতো হতাশা আসে !!!!  কিন্তু সমাজের চোখে প্রত্যকেই একেকজন চরিত্রবান ব্যক্তি !!!

সবারই নিজের ইচ্ছেমতো জীবনযাপন করার ও চলার অধিকার রয়েছে, কিন্তু তা কখনোই অন্যের ক্ষতি করে নয়, এটা কখনোই সৎ চরিত্রের মধ্যে তো পড়েই না, মানবাধিকারের পর্যায়েও পড়ে না। অন্যের ক্ষতি করে কি আর চরিত্রবান হওয়া যায়?

কিছুদিন আগে মামাকে (যিনি দেশের সর্বোচ্চ বিদ্যাপিঠে বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসের ওপর গবেষক হিসেবে কাজ করছেন) জিজ্ঞেস করেছিলাম, চরিত্রবান কাকে বলে? 

মামার প্রতি উত্তর ছিল, “শোন ভূতের ছানা (আদর করে মামা ডাকে), যার ঘুষ খাওয়ার কোনো সুযোগই নাই, তাই সে কখনো ঘুষ খায়নি, সে কি কখনো সৎ চরিত্রবান হওয়ার দাবি রাখে? 

চরিত্রবান তো সে,  যার ঘুষ খাওয়ার হাজারটা সুযোগ থাকা সত্ত্বেও যে জীবনে ঘুষ খাইনি।
চরিত্রবান তো সে, যে সুযোগ থাকা সত্ত্বেও কাউকে ঠকায়নি
চরিত্রবান তো সে, যে সুযোগ থাকা সত্ত্বেও কারো সরলতা নিয়ে খেলেনি
চরিত্রবান তো সে, যে সুযোগ থাকা সত্ত্বেও কারো বিশ্বাস ভাঙেনি

অর্থাৎ সৎ চরিত্রবান ব্যক্তিরা কোন কিছুর বিনিময়ে নিজের সততা নীতিকে কখনোই বিসর্জন দিবে না আর যার নীতি সততা এসব নেই, সে তো সবসময় সু্যোগের অপেক্ষাই থাকবে।”

আসলেই তাই, আপনি যতই নিয়মের বেড়াজাল দিয়ে রাখেন না কেন, যতই পেছনে ক্যামেরা লাগিয়ে রাখেন না কেন, যাদের সততা, নীতি, আদর্শ এসব নেই তারা আজ হোক আর কাল হোক, যেভাবেই হোক, আপনাকে তারা ঠকাবেই। আজকে হয়তো পরিস্থিতির চাপে পড়ে তারা চরিত্রবানের রুপ ধারণ করেছে, কাল যদি সুযোগ পায়, তাহলে ঠিকই তার অপব্যবহার করবে।
 
আর যারা সততা নীতি নিয়ে চলেন, তাদেরকে কোন কিছুর প্রলোভন দেখিয়ে কখনোই নীতি বিচ্যুত করতে পারবেন না, এটাই তাদের বিশেষত্ব, যেটা সবার কাছে থাকে না।

যারা ভাবছেন, চরিত্রবানরা তাদের চরিত্র নিয়ে থাকুক, আমার যা ইচ্ছে আমি তাই করবো,  তাদের বলবো, সৃষ্টিকর্তাকে বিশ্বাস করুন আর নাই করুন, ভুলে যাবেন না, পৃথিবী গোল, অন্যের সাথে যা করবেন তাই আপনার সাথে ঘটবে, আপনার কাছেই ঘুরে ফিরে আসবে, এটাই প্রকৃতির নিয়ম।

লেখাটি ভাল লাগলে শেয়ার করুন:
  •  
  •  
  •  
  • 2
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    2
    Shares

লেখাটি ২,৫০৪ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.