তাহমিমা আনাম এঁর ‘গার্মেন্টস’ বনাম সাহিত্যের ‘সতীত্ব’ রক্ষা

0

জাহিদ হোসেন:

গল্পটি প্রকাশিত হওয়ার পর থেকেই ফেসবুকে নানান নিন্দামন্দ পড়ছি। হাতে গোনা অল্প কিছু মন্তব্যে গল্পের বা লেখকের প্রতি সহানুভূতি থাকলেও বাকিগুলো নির্ভেজাল নিন্দা। কিছু স্পষ্ট হেইট স্পিচ। অনেকে একদিকে স্বীকার করেছেন পড়েননি এখনও, আবার অন্যদিকে ‘এতো খারাপ লেখা’র বিরুদ্ধে আগে থেকেই আপত্তি  জানিয়ে রেখেছেন!

বোঝা যা, এসব মন্তব্যের বা ঘৃণার পিছনে আসলে লেখাটি যতোটা, তার চেয়েও নারী সম্পর্কে তাঁদের পুর্বনির্ধারিত ধারণা বেশি ভূমিকা রেখেছে। আলোচ্য ক্ষেত্রে এই নারী যেমন বাস্তবের লেখক তাহমিমা আনাম, তেমনি গল্পের তিনটি নারী চরিত্রও।  

অথচ তাঁরা ভাবছেন না যে, যা ঘটে বা ঘটেছে কেবল তা নিয়েই সাহিত্য হতে হবে তা নয়, যা হতে পারে তা নিয়েও সাহিত্য হওয়া সম্ভব। তাঁরা মানছেন না যে, কল্পনাশ্রয়ী গল্প আর বাস্তবাশ্রয়ী প্রতিবেদন এক নয়। একজন লিখেছেন, সারাদিন কাজ করে গার্মেন্টসের নারীর আবার যৌনকামনা থাকে নাকি! কী অবৈজ্ঞানিক ধারণা !

অনেক পুরুষ এখনো মানতে চায় না যে, নারীরও যৌন চাহিদা থাকে। তাঁদের এই চাহিদা বা দাবি বা অধিকার মেনে না নেওয়াটা লুক্কায়িত পুরুষতন্ত্রের প্রমাণ। অনেকের মনের সেই লুকানো পুরুষতন্ত্র তাহমিমা আনামের এই গল্পচ্ছলে বেরিয়ে এলো। ভালোই হলো।

বোঝা গেল, একজন নারী না হয়ে একজন পুরুষ লেখক গল্পটা লিখলে একই প্রতিক্রিয়া হতো না। নারীরা যৌনতা নিয়ে খোলামেলা লেখে না – এমন স্টেরিওটাইপড ধারণা থেকেই নারী লেখকের যৌন বিষয়ে দেওয়া বিবরণ পড়ে অনেকে ধাক্কা খেয়েছেন। এমনকি গল্পের চরিত্র মেয়েদের যৌনকামনার প্রকাশের কারনেও তাঁরা ধাক্কা খেয়েছেন।

গল্পের চরিত্রদের যৌন জীবন মুখ্য হয়ে উঠেছে – এই যদি নিন্দার কারণ হয়, তাহলে প্রশ্ন জাগেমুখ্য হয়ে উঠলেই বা ক্ষতি কী? মানুষের এক জীবনে তো অনেক জীবন থাকে। কোনো একজন লেখক সেই অনেক জীবনের মধ্যে একটাকে বেছে নিয়ে লিখলে তাতে আমাদের বাঁধে কেন? কোথায় বাঁধে? বরং যা নিয়ে কেউ লেখেনি, এই নবযৌবনা মেয়েদের যৌন অবদমন, যৌন বঞ্চনা বা যৌনসংকট, নিয়ে প্রথম একজন নারী লেখক (নারীরাই নারীদের এহেন বঞ্চনা ভালো বুঝবেন বিবেচনায়) লিখেছেন; একে তো ইতিবাচকভাবেও নেওয়া যেত।

মনে হয়েছে, পুরস্কার না পেলে বা লেখকের বাবা মাহফুজ আনাম না হলে হয়তো এতো নিন্দা জুটতো না। কিংবা মূল লেখাটা ইংরেজি না হলেও হয়তো এতো নিন্দা হতো না। জানি, প্রশংসার সংস্কৃতি নির্মিত হয়ে ওঠেনি আমাদের দেশে এখনও। ঈর্ষা, বিদ্বেষ আর প্রথাবদ্ধ চিন্তার শেকলে আবদ্ধ আমরা অনেকেই। নইলে কেবল গল্পে গার্মেন্টস কর্মীকেহেয়করার কারণেই যদি এতো নিন্দামন্দ তাহলে গার্মেন্টস কর্মীদের জীবন নিয়ে একটাভালো’ গল্প লিখেই তো তাহমিমা আনামকে উপযুক্ত জবাব দেওয়া যেত। তাতে গার্মেন্টস কর্মীদের প্রতি ‘দায়িত্ব’ পালন হতো, দেশের ‘ভাবমূর্তি’ও উজ্জ্বল হতো। তেমন হলে ইংরেজিতে অনূদিত হয়ে পুরস্কারও ‘বাগাতে’ পারতো।    

আসলে যা কিছু নতুন, যা কিছু প্রথা বিরোধী, তা গ্রহণ করায় এক ধরনের আড়ষ্টতা থাকে অনেকের। কিন্তু চিন্তার মুক্তিতে যাঁদের বিশ্বাস, তাঁদের তো এই আড়ষ্টতা মানায় না।

লেখাটি ভাল লাগলে শেয়ার করুন:
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

লেখাটি ৮০০ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.