তারা কি প্রকৃতিগতভাবেই ম্যাজিক মশারির নিচে বাস করে?

0

শাহানা হুদা:

সেদিন এক বাসায় বিকালে বেড়াতে গিয়ে আমার তো ভিড়মি খাওয়ার অবস্থা। দেখলাম ঐ বাসার সবচেয়ে বয়স্ক সদস্যাটি একটি চেয়ারে বসে আছেন এবং একটি ম্যাজিক মশারি ওনার চেয়ারটাকে ঘিরে আছে। উনি ভেতরে বসে ফিকফিক করে হাসছেন। বুঝলাম চিকনগুণিয়ার হাত থেকে রক্ষার জন্য এই ব্যবস্থা।

বড় হওয়ার পর থেকে মশারি জিনিসটাকে আমি দু’চোখে দেখতে পারি না এবং পারতপক্ষে টাঙাতেও চাই না। কিন্তু এখন আমার বাসাতেই চারিদিকে মশারি, নেটিং-ফেটিং, ধূপ সব ফেল। বুঝছি বারোয়ারি বাসায় এইসব ঢং কাজ করে না। আর আম্মার বিছানা থেকে তো মশারি প্রায় খোলাই হচ্ছে না। কারণ এসব মশা নাকি সকালে, দুপুরে, বিকালে কামড়ায়।

আম্মা বেচারা বিছানাতেই মশারির নিচে বসে দোয়া-নামাজ পড়ছে, দুপুরে ঘুমাচ্ছে, অসময়ে অতিথি এলে এর নিচে বসেই কথা সেরে নিচ্ছে। কী যে বিরক্তিকর ব্যাপার, কিন্তু না মেনে উপায় নেই। মশার সাইজ তো এমনই যে, সে যে কোনো সময় যেকোনো দিক দিয়ে ঢুকে যেতে পারে। তার প্রবেশের জন্য আদতে কোন পথ লাগে না। ভাবছি আম্মাকেও একটা হ্যাংগিং ম্যাজিক মশারি কিনে দেবো কিনা?

সত্যি বলতে কী নগরীতে বসবাসকারী অধিকাংশ সাধারণ মধ্যবিত্ত বা উচ্চ মধ্যবিত্ত পরিবারে পরিস্থিতিটা এরকম দাঁড়িয়েছে যে — যেমন আপনি প্রবল জ্বর নিয়ে অফিস থেকে বাসায় ফিরলেন। বিছানায় থাকতে থাকতেই দেখবেন বাসার আরো ২/৩টি উইকেটের পতন ঘটেছে। হয় চিকনগুণিয়া, নয় ডেঙ্গু । আর বাকি ২/১ জনের ভাইরাল জ্বর, ফ্লু, হাঁচি-কাশি, ডায়রিয়া বা পাতলা পায়খানা বা আরো অন্যকিছু। তাছাড়া ঢাকা শহরে পানি, বিদ্যুৎ, গ্যাস, সবুজ বনবনানী, পাখির ডাক, নাগরিক সুবিধার অনেক অভাব থাকলেও, রোগ শোক আর দুর্ভোগের কোন অভাব নেই।

ঢাকার নাগরিক জীবনে এন্তার দুর্ভোগ। ঢাকায় যদি থাকতে চাও ট্যাক্স দিয়ে এসবকে সাথী করে নিয়ে থাকতে হবে । মশা, মাছি, খানা-খন্দ, শব্দদূষণ, ভীড়-ভাট্টা, ট্র্যাফিক জ্যাম, ভেজাল খাবার, বস্তিজীবন, অনিরাপদ পরিবেশ, ছায়াহীনতা, নাগরিক কপটতা, উচ্চচাপ, নিম্নচাপ, আজ ডেঙ্গু, কাল চিকনগুণিয়া। সত্যি ভেবে অবাক হয়ে যাই এই নিয়েই এতোগুলো বছর এই নগরে বাস করছি, শুধু বাস করছি বলা ভুল, ভালোও বাসি। আর আমাদের এই দুর্বলতাকে পুঁজি করে দায়িত্বপ্রাপ্তরা স্ব স্ব জায়গায় দায়িত্বে গাফিলতি করেও গোঁফে তা দিয়ে আছেন।

আমাদের অবস্থা এখন এই পর্যায়ে পৌঁছেছে যে দেখবেন অফিসে, পরিবারে, বিবাহবাসরে, দাওয়াতের টেবিলে একটি অবশ্য আলোচনা হচ্ছে “ রোগ-শোক “ কোন পরিবারে ৫০ ভাগ মানুষও এই অসুস্থ পরিবেশে সুস্থ থাকতে পারছেন না। কিন্তু তাতে কার কী যায় আসে? গণমাধ্যম নগরবাসীর নাকাল হওয়ার খবর দিতে দিতে হয়রান। নাগরিক নিজেরা সোশ্যাল মিডিয়াতে তুলে ধরছেন। কিন্তু কিছুতেই কিছু হচ্ছে না। নগর পরিস্কার রাখার, মশার প্রজনন স্থানে ওষুধ ছিটানোর দায়িত্ব কার, এতো যে রোগ ছড়িয়ে পড়ছে তা কীভাবে প্রতিরোধ করা যাবে – একথা জানানোর দায়িত্ব কার? এতো যে গরম গেলো, এই গরম মোকাবিলার কোনো স্বাস্থ্য টিপস কি সংশ্লিষ্ট দফতরের কউ জানিয়েছে আমাদের?

না জানায়নি, জানায়ও না। মিডিয়া নিজ উদ্যোগে প্রচার করে অনেককিছু। সোশ্যাল মিডিয়াতেও আসে সতর্কমূলক বার্তা। কিন্তু এসব সমস্যা সমাধানের দায়িত্ব যাদের, তারা তো নাকে তেল দিয়ে ঘুমাচ্ছে।

সরকার তাদের বিভিন্ন অর্জন নিয়ে ক্রমাগত বিলবোর্ড, ব্যানার, ফেস্টুন, দেয়ালিকা, চিকা মেরে প্রচার প্রচারণা চালিয়ে যাচ্ছে। সেক্ষেত্রে তো দেখি লাফিয়ে লাফিয়ে যা দরকার তাও দিচ্ছে, যা দরকার নাই তাও দিচ্ছে। তাহলে জনস্বাস্থ্যের মতো এতো গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়ে সরকারের সংশ্লিষ্ট মহল ও নগরপিতাদের এই উদাসীনতা কেন? কোথাও কোনো প্রচার প্রচারণা কিচ্ছু চোখে পড়ছে না তাদের পক্ষ থেকে।

আমার সন্দেহ যে চিকনগুণিয়া বা ডেঙ্গু বা ডায়রিয়া এসব টাইপের রোগগুলো সেরকম বিশিষ্ট পর্যায়ের লোকদের বা তাদের পরিবারের হয় না। তারা প্রকৃতিগতভাবেই ম্যাজিক মশারির নিচে বাস করে, মানে প্রটেকটেড। 

দারুণ কাণ্ড, স্ট্যাটাসটা ঠিক পোস্ট করবো যখন, তখনই সরকারি এসএমএস এলো, ১৭ জুন চিকনগুণিয়া প্রতিরোধে সচেতনতা অভিযান চালানো হবে । বাহ ভালো তো, ভালো না? কথায় আছে , ”বেটার লেট দ্যান নেভার।”

লেখাটি ভাল লাগলে শেয়ার করুন:
  • 265
  •  
  •  
  • 2
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    267
    Shares

লেখাটি ২,৮০৩ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.