হায়রে রাজকন্যা!

0
মানসুবা তাবাসসুম হক:
প্রতিটি কন্যা প্রতিটি বাবা-মায়ের অতি আদরের প্রিন্সেস বা রাজকন্যা! 
হাসপাতালে গেলে খেয়াল করবেন, বিশেষ করে একটি মেয়ের বাচ্চা হওয়া থেকে শুরু করে বাচ্চার বেশির ভাগ জিনিস.. সেই রাত জাগা, বাচ্চাকে পাহারা দেয়া, তাকে খাওয়ানো থেকে শুরু করে বাচ্চার মায়ের যত্নআত্তি সব কিছুই বাচ্চার নানি, খালারাই বেশির ভাগ করে থাকেন। তাই বলে বলছি না দাদাবাড়ির লোকেরা এসব করেন না। তারাও করেন, তবে পর্যবেক্ষণে দেখা যায়, তার শতকরা হার নানির বাড়ির থেকে কম!
ঠিক একইভাবে একটি মেয়ে তার চিরচেনা ঘরবাড়ি আর প্রিয়জনদের ছেড়ে স্বামীর বাড়িতে উঠে আসেন। আস্তে আস্তে সব দায়িত্বই অলিখিতভাবে সেই ছেলের বউটির কাঁধে এসে পড়ে। বাবার বাড়ির সেই আদুরে মেয়েটির এ বাড়িতে এসে নাম হয়ে যায় ‘বউমা’! তার যে একটি নাম আছে এটাই এ বাড়িতে ভুলতে বসে মেয়েটি! কারণ তখন তিনি কারও ভাবি, কারও চাচি, কারও বা বউমা।
মজার বিষয় হলো, স্বামীর বাড়িটিকেই যখন তিনি নিজের বাড়ি আর মানুষগুলোকে নিজের প্রিয় মানুষ হিসাবে ভাবতে থাকেন এবং সেইভাবে সমস্ত দায়িত্ব নিজ হাতে পালন করতে থাকেন, তখন শাশুড়ির মনের ভেতর জন্ম নেয় হিংসা, ক্রোধ, বিরক্তি, সমালোচনা, ছেলেকে হারাবার ভয়, যন্ত্রণা! তিনি ভাবেন তার সেই ছোট ছেলেটি তো এখন অন্য এক মেয়ের! তার নিজের নয়! তাই তিনি ছেলের বউটিকে তার প্রতিযোগী ভাবতে শুরু করেন। শুরু হয় অসুস্থ এক প্রতিযোগিতা, খুঁত ধরা, ছেলেকে বউয়ের বাড়ির আত্মীয় স্বজন এবং বউ সম্পর্কে ভুল ধারণা দিয়ে মন নষ্ট করে দেয়ার প্রতিদিনের রুটিন! 
অনেক ছেলেই দিনের পর দিন এগুলো দেখেও না দেখার ভান করেন! কেউ হয়তো বা বউটাকেই বোঝান, আবার কখনও মাকে। কেউ হয়তো বা স্ত্রীটিকেই দায়ী করে যান একচেটিয়াভাবে! কেউ, কেউ আবার স্ত্রীকেই ধৈর্য ধরতে বলেন!  তার স্ত্রী যে শারীরিক, মানসিক, সামাজিক, অর্থনৈতিকভাবে নির্যাতনের শিকার হতে পারেন! এটিই হয়তো বা তিনি বুঝতেই পারেন না!  কিংবা বুঝলেও তিনি জেগে, জেগে ঘুমান!  
কষ্টের বিষয় হলো, ছেলের বউটি সবার জন্য শুধু করেই যাবেন, কিন্তু তার জন্য কেউ এগিয়ে আসবেন না, তার কোনো চাওয়া-পাওয়া থাকতে নেই। কারণ সে তো “বউমা”! মেয়ে তো নয়! ছেলের বউ মানে সবকিছুর খেয়াল রাখবে, কৃত্রিম হাসি দিয়ে সবার সামনে যেয়ে তাদের দরকার মেটাবে, এই আর কি!
আসলে অনেকে ভাবেন, সে একজন কেয়ারটেকার ছাড়া আর কিছুই নয় ! তাইতো  তার প্রতি কারও কোন দায়িত্ববোধ, ভালোবাসা, সহানুভূতি থাকতে নেই। সে যতই যোগ্য হোক না কেন, সে তো তাদের ঘরের ছেলের বউ! বাহ, কি বিচিত্র! ছেলের বউকে টাকা পয়সা, বাড়ি গাড়ি, সম্পদ, সম্পত্তির ভাগও দেয়া যাবে না, তাহলে ছেলেকে হতে হবে স্ত্রৈন! মনে হয় সব ঠ্যাকা আর দায় সেই বউমার বা বউমার মা, বাবা, ভাই, বোনদের! 
এ সবের পরিণাম হিসাবে ছেলের বউ এর মনটা দুমড়ে মুচড়ে ক্ষতবিক্ষত হয় হরহামেশাই! আস্তে আস্তে সেই মা বাবার আদুরে মেয়েটি বুঝতে পারেন, যে তার খোলা আকাশটি আর তার নেই! সেটা চুরি হয়ে গেছে অনেক আগেই! সেই আকাশে আর তারারা উঁকি দেয় না, খেলা করে না! :'(  
শাশুড়িদের বলছি, আপনারা ভেবে দেখুন! আপনার ছেলের বউটি যদি শিক্ষিত বা উচ্চশিক্ষিত, ভদ্র, মার্জিত পরিবারের সন্তান হন কিংবা নাও হন, তার সম্মান কিন্তু তার নিজের যেমন, ঠিক তেমনি আপনার ও আপনার ছেলেরও! তাকে সম্মান দেয়া মানে আপনি নিজেকে সম্মানিত করলেন। তাকে ছেলের বউয়ের বাইরে মানুষ হিসাবে ভাবতে শিখুন। আর হ্যা, এটিও মনে রাখবেন যে আপনিও একদিন কোন না কোন সময়ে কারও ছেলের বউ ছিলেন..! কিংবা ছিলেন কোন বাবা মায়ের প্রিন্সেস! 
আমরা কি পারি না সেই বাবা মায়ের আদরের মেয়েটিকে তার একান্ত নিজের আকাশটি ফিরিয়ে দিতে?! কেননা, সেও তো এক সময় খোলা আকাশে দৌড়ে বেড়াতো, চাঁদ তারাদের সাথী হত! বাবার বুকে মাথা গুঁজে তার সেই আকাশের তারা গুনতো। জড়িয়ে ধরে বাবা মায়ের গায়ের গন্ধ নিত! 
নিয়েছেন কি খবর কখনও, তার মন কী বলে, মন কী চায়?
লেখক পরিচিতি:
Chairman & Psycho-Social Counselor at Mansuba’s Counseling
Director at Health21
Former Chairman at BHEC, Dhaka University
লেখাটি ভাল লাগলে শেয়ার করুন:
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

লেখাটি ৪,৯৭০ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.