পুরানের কর্ণ এবং বর্তমানের কর্ণরা

0

প্রমা ইসরাত:

মহাভারতে আমার পছন্দের চরিত্র কর্ণ। কুন্তীপুত্র কর্ণ জন্মেছিলেন, মুনি দুর্বাসার বরের কল্যাণে। কুন্তী তার কৌতুহল দমন করতে না পেরে, কুমারী অবস্থায়ই বর হিসেবে পাওয়া মন্ত্র উচ্চারণ করেন, সুর্যদেবতার আবির্ভাব ঘটে এবং সূর্য দেবতা জন্ম দেন কর্ণকে। জানা যায় কুন্তীর কান দিয়ে প্রসব করানো হয়েছিল কর্ণকে , আর তাই তার নাম কর্ণ। কর্ণের কানে সোনার দুল আর , অভেদ্য বক্ষ্যবর্ম।  

যেহেতু কুন্তী কুমারী ছিলেন তথা অবিবাহিত ছিলেন তাই কর্ণকে তিনি ভাসিয়ে দিলেন কাঠের বাক্সে।

জীবনে প্রতি পদে পদে কর্ণ অপমানিত হয়েছেন। তার লড়াইটা ছিল নিজের প্রাপ্য সম্মান আর মর্যাদার জন্য। কর্ণ এই জন্যই আমার পছন্দের চরিত্র, কেননা, তিনি নিজে একজন নিপীড়িত মানুষ, এবং তা হওয়া সত্ত্বেও তিনি অসাধারণ,বিশ্বজয়ী,অদম্য এক যোদ্ধা তিনি যখন যুদ্ধ কৌশল, অস্ত্রবিদ্যা শেখার জন্য দ্রোনাচার্যর কাছে যান তখন, তিনি নিগৃহিত হন, কারণ তিনি একজন সুতপুত্র। তার বাবা ভীষ্মের গাড়োয়ান।

তিনি পরশুরামের কাছে যান, এবং মিথ্যা কথা বলেন যে, তিনি ব্রাহ্মণ। কারণ পরশুরাম ব্রাহ্মণ ছাড়া কাউকে শিক্ষার্থী হিসেবে গ্রহণ করেন না। তাই বাধ্য হয়ে তিনি মিথ্যা বলেন। তার মিথ্যা যখন প্রকাশ পায়, তখন তাকে অভিশাপ দেওয়া হয় যে তিনি চরম মূহুর্তে যুদ্ধের সমস্ত বিদ্যা ভুলে যাবেন। কর্ণ যখন প্রস্তুত হয়ে পাণ্ডব কৌরবের রাজসভায় যান, তখন আবার তাকে অপমানিত হতে হয়, না তিনি ক্ষত্রিয়, না তিনি ব্রাহ্মণ, তিনি সূতপুত্র। আর শুধুমাত্র এই জন্য তার সমস্ত গুণকে অস্বীকার করা হয়। তখন তাকে গ্রহণ করেন দুর্যোধন। কারণ দুর্যোধন বুঝতে পেরেছিলেন, পাণ্ডবদের হারানোর জন্য কর্ণ হবে তার সবচেয়ে মূল্যবান অস্ত্র।

দ্রৌপদীকে বিয়ে করার সময় কর্ণও ছিলেন একজন দাবিদার, কিন্তু দ্রৌপদী ভরা মজলিসে বলে বসলেন যে, সূতপুত্রকে তিনি বিয়ে করবেন না। কারণ দ্রৌপদী চান অর্জুনকে। দ্রৌপদী জানতেন, অর্জুনকে বিয়ে করতে হলে কর্ণকে হটাতে হবে। কর্ণের যোগ্যতায় নয়, তাই তিনি কর্ণকে বাদ দিতে বেছে নিলেন, ধর্মের বা সমাজের প্রচলিত বিধান যে, সূতপুত্রকে ক্ষত্রিয় নারী বিয়ে করতে পারে না।

প্রতি পদে পদে শুধু মাত্র নিম্ন গোত্রের মানুষ হিসেবে বেড়ে ওঠায় কর্ণকে অপমান করা হয়েছিল,তিরস্কার করা হয়েছিল। এমনকি যুদ্ধে সে যেন হেরে যায় সেই জন্য স্বয়ং দেবতাদের রাজা ইন্দ্র ছলচাতুরি করে তার পিতা সূর্যের দেয়া স্বর্ণ বর্মটিও খুলে নেয়।

কর্ণকে আমি নিঃসন্দেহে নায়ক বলতে পারতাম। কিন্তু, এখানে একটা কিন্তু আছে। দ্রৌপদীর বস্ত্র হরণের জন্য যখন তাকে টেনে হিঁচড়ে রাজসভায় নিয়ে আসা হয়েছিল, তখন কর্ণ বলেছিলেন যে ধর্ম মতে একজন স্ত্রীর একজন স্বামী নির্ধারিত, দ্রৌপদীর যেহেতু পাঁচজন স্বামী তাই তিনি একজন গণিকা। নারীর অপমান স্বচক্ষে দেখার পরও কর্ণ চুপ ছিলেন এই জন্যই হয়তো তাকে নায়ক আমি বলবো না। কর্ণ এখানেও দ্রৌপদীর মতো ধর্ম বা প্রচলিত সমাজের বিধানই দিয়েছেন, ঠিক যেমনটি দ্রৌপদী তাকে স্বয়ম্বর থেকে বাদ দেয়ার জন্য বলেছিলেন।  

ধরুন এই কর্ণকে বন্ধু হিসেবে যদি পাণ্ডবরা তাদের দলে নিতেন, তাহলে কী হতো? এই মহাভারতের কাহিনীই পালটে যেত। না হতো যুদ্ধ, না হতো প্রাণ ক্ষয়।  

কর্ণ মহাভারতের একজন ট্র্যাজিক হিরো।

এখন মহাভারতের কর্ণকে ২০১ তে নিয়ে আসুন। মনে করুন কর্ণ হচ্ছে কিরণ কুমার রায়, কিংবা কিরণ বড়ুয়া অথবা কিরণ চাকমা, কিরণ গোমেজ, কিরণ চিসিম, কিংবা সে কিরণ নয়, করিম মিয়া, যে একজন কৃষকের সন্তান, যে অত্যন্ত মেধাবী, পড়ালেখায়, খেলাধুলায়, সব ক্ষেত্রে। আমাদের দেশে তাদের ভবিষ্যৎ কতোটুকু?তাদের যোগ্যতা অনুযায়ী তারা কি তাদের প্রাপ্যটুকু পায়? একটা ভালো স্কুল, ভালো থাকার জায়গা, মানসম্মত চিকিৎসা সেবা কোনকিছুতেই কি তারা নিশ্চিন্ত! জীবনের নিরাপত্তা কি আছে তাদের? আজকে যে বাড়িতে সকাল দেখেছে, রাতের আঁধারে সেই বাড়িটি যে জ্বালিয়ে দেয়া হবে না সেটার নিশ্চয়তা কোথায়? আর সম্মান তো দূরের কথা।

দুই লাইন লিখতে পারে না যে ব্যক্তি সেও শুধু মাত্র ধর্মের নামে গালি দিয়ে বসে উচ্চপদস্থ বা অত্যন্ত সম্মানিত একজন জ্ঞানী ভিন্ন ধর্মাবলম্বীর বা ভিন্নমতাবলম্বীর ব্যক্তিকে। বাংলাদেশের মানুষ ক্রিকেটের মাধ্যমে তাদের দেশপ্রেম জাহির করে। সেই দেশপ্রেমিক জনগণ শুধুমাত্র ভিন্নধর্মাবলম্বী হওয়ায় অপমান করে জাতীয় দলের ক্রিকেটারকে। একটু সুযোগ পেলেই আমাদের দেশের সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের যারা আছেন, তারা বিদেশে চলে যেতে চান।

কারণ কি? কারণ তারা জানেন এই দেশে তাদের কোনো নিশ্চিত নিরাপত্তা নেই। শুধুমাত্র ধর্মের দোহাই দিয়ে তাদের সমস্ত ডিগ্রী, সমস্ত অর্জনকে মাটির সাথে মিশিয়ে দিতে পারে সংখ্যাগরিষ্ঠরা। তাদের উন্নয়ন, তাদের উন্নতি দেখামাত্রই চোখ টাটিয়ে তাদের পেছনে লাগতে আসার মানুষের কোনো অভাব নেই। তারা জেনে গেছে শুধুমাত্র ধর্মকে ব্যবহার করেই মানুষকে তার অধিকার থেকে বঞ্চিত করা যায়। তাদের বাড়ি ঘর, জায়গা দখল করা যায়, ধর্ষণ করা যায়, হত্যা করা যায়।

আগের দিনের কোনো ধনী সম্ভ্রান্ত বাড়ির সামনে দিয়ে, পায়ে জুতো পড়ে যেতে পারতো না সাধারণ মানুষ। জমিদারের ছেলে বিলেতে ব্যারিস্টার হতে যাবে আর কৃষকের ছেলে হবে কৃষক। সেই যে ধনী-গরীব আর শোষক-শোষিতের শ্রেণী বৈষম্য, সেটা দূর তো হয়ইনি, উলটো গ্লোবালাইজেশনের এই যুগে তা আরও পোক্ত হয়েছে।

শিক্ষা কার্যক্রম মানুষের মুক্তির একটি উপায়। শিক্ষা কোনো সুযোগ নয়, শিক্ষা অধিকার। কিন্তু সেই শিক্ষা ব্যবস্থায়ই তাকিয়ে দেখলে এটা স্পষ্ট যে এতে গরীবের কোনো জায়গা নেই। উচ্চমূল্য দিয়ে কেনা হচ্ছে ডিগ্রী। একটি পাবলিক স্কুলে ভর্তি হতে গেলেও প্রচুর অর্থ ব্যয় করতে হয়। কোচিং, প্রাইভেট টিউটর, ভালো নোট বই, গাইড বই এইগুলোর পেছনে ব্যয় করার মতো অর্থ কি এই দেশের সীমিত আয়ের মানুষের মধ্যে আছে?

শুধুমাত্র মেডিকেলের পড়ার খরচ চালাতে পারবে না দেখে কতো ছেলেমেয়ে স্বপ্নকে গলা টিপে মেরে কৃষি ইউনিভার্সিটি কিংবা অন্য কোন ইউনিভার্সিটিতে ভর্তি হতে বাধ্য হয়েছে। একটি ভালো ক্রিকেট ব্যাট কেনার সামর্থ্য নেই বলে কতো ছেলে আজ মুদির দোকানে আছে, কিংবা অন্য কোনো কাজে নিজের স্বপ্ন জ্বালাচ্ছে কেউ বলতে পারে? যে কোনদিন ভালো চিত্রশিল্পী হতে পারতো, সে পেটের দায়ে ব্যানার লিখে, দেয়াল লিখে। লিখে না? যাদের টাকা আছে তারাই টিকে থাকবে, যাদের নেই তারা বেঁচে যে আছে এই বড় পাওয়া। পুঁজিবাদের কাছে অর্থই পরম ধর্ম। “Money is God”।  

মানব সৃষ্ট নানা রকম ধর্মের কাছে কত শত কোটি কর্ণ যে নিজেকে প্রমাণ করতে ব্যর্থ হলো। নিজের প্রাপ্য সম্মানের আশায়, নিজের অপমানের জ্বালায় কতো কষ্ট পেয়ে সমাজ-রাষ্ট্রকে ধিক্কার দিয়ে মরে গেল, এই দেশ থেকে বিতাড়িত হলো, সেই হিসাব কেউ দিতে পারবে না।

হয়তো একটি ধর্মের কাছেই কর্ণরা কোনদিনও হারবে না। মানব ধর্ম।

লেখক- প্রমা ইসরাত

আইনজীবী

লেখাটি ভাল লাগলে শেয়ার করুন:
  •  
  •  
  •  
  • 1
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    1
    Share

লেখাটি ২,৯২৬ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.