রাঙামাটির এই ধ্বংসস্তুপ আমার অচেনা

0

তনয়া দেওয়ান:

রাঙামাটির বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে গত দুদিন ধরে লিখতে বসেছি, দুই তিন লাইন লিখার পর আর কোন লেখা আসে না , লিখতে লিখতে কোথায় যেন হারিয়ে যাই, চোখে ভাসতে থাকে সেই সবুজে শ্যামলে ভরা লেকবেষ্টিত পাহাড় ঘেরা  রাঙামাটির বদলে বর্তমান রাঙামাটির বীভৎস চেহারা।

আঁতকে উঠে ভাবি, এ কী হলো আমার প্রাণপ্রিয় শহর রাঙামাটির?

রাঙামাটির পাহাড়ে, বাতাসে, পরিবেশে আমি হেসে খেলে বড় হয়েছি, কিন্তু কখনো তো ভাবিনি আমার এ জন্মভূমিকে এভাবে দেখতে হবে! 
রাঙামাটির আকাশ-বাতাস আমার চেনা, মাটির ঘ্রাণ আমার চেনা, লেকের পানি আমার চেনা, কিন্তু রাঙামাটির এই ধ্বংসস্তুপ আমার বড়ই অচেনা!!!

পর্যটন নগরী রাঙামাটি আজ ধ্বংসস্তুপে পরিণত, চারিদিকে হাহাকার,  রাঙামাটির আকাশে বাতাসে আজ মলিনতার ছোঁয়া।

প্রবল বৃষ্টিপাতে পাহাড়ধসে এতগুলো (১৪০+) মানুষের প্রাণহানি, মৃতের সংখ্যা আরো বাড়তে পারে
> পাহাড়ধসে রাঙামাটি-চট্টগ্রাম-ঢাকা সড়কপথের যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন
>  তিন চার দিন ধরে রাঙামাটিবাসী বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন,
> বিদ্যুত না থাকায় চার্জ দিতে না পারায় মোবাইল ফোন অচল হওয়ায় সার্বক্ষণিক যোগাযোগ বিঘ্নিত  
> নিত্য প্রয়োজনীয় জিনিসের দাম দ্বিগুণ
> অর্থের বিনিময়েও মিলছে না নিত্য প্রয়োজনীয় জিনিস
>জ্বালানি তেলের অভাবে জেনারেটর হয়ে পড়েছে অচল
> আহতদের চিকিৎসা সেবা দিতে হিমশিম খাচ্ছেন হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ
> ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় বসবাস করা মানুষজন ছুটছে নিরাপদ আশ্রয়ের আশায়

আর কতো?
এটাই বোধ হয় রাঙামাটির ইতিহাসে স্মরণকালের বড় দুর্যোগ।
বর্ষা তো মাত্র শুরু, এতেই এ অবস্থা! ভবিষ্যতের কথা ভাবতেই গা শিউড়ে উঠে! 

ইট মারলে পাটকেল খেতে হয়,  দিনের পর দিন আমরা প্রকৃতির সাথে যে রূঢ় আচরণ করে যাচ্ছি, তার বিনিময়ে প্রকৃতি আমাদের পাটকেল হিসেবে দিয়েছে এই দুর্যোগ। এখনও যদি আমাদের হুঁশ ফিরে না আসে তাহলে কবে হবে? 
পাহাড় কেটে যারা ইচ্ছেমতো ঘর তুলছেন কোনো ভবিষ্যত পরিকল্পনা ছাড়াই, একবারও কি ভেবেছেন নিজের পরবর্তী প্রজন্মের কথা!  আমরা শুধু মুখে নামধারী আধুনিক হতে চাই, চলন-বলন, মনন, চিন্তাশীলতায়, প্রগতিশীলতায় এর কোনো প্রতিচ্ছবিই দেখা যায় না। না হলে কী আর এতো শহুরে নামধারী হওয়ার আশায় প্রকৃতির বিরুদ্ধে গিয়ে এতো ঘনবসতি, দালানকোঠা, দোকান, মার্কেট প্রভৃতি তৈরি করছি !!!

পর্যটন নগরী রাঙামাটিকে বিশ্বের দরবারে নিয়ে যাওয়ার জন্য আমরা যেন এক অলিখিত প্রতিযোগিতায় নেমেছি প্রকৃতিরই বিরুদ্ধে !!! 
জী, অবশ্যই আমরা চাই,  রাঙামাটির সৌন্দর্য্য বিশ্বের মানুষ জানুক, রাঙামাটিকে বিশ্বের দরবারে তুলে ধরতে চাই, তা অবশ্যই প্রকৃতিকে সাথে নিয়ে। কিন্তু আমরা যা করছি তাতে রাঙামাটির সৌন্দর্য্য নিয়ে নয়, বরং রাঙামাটির ভয়াবহ রুপ নিয়ে বিশ্বের সামনে আমাদের মাথা নিচু করে দাঁড়াতে হবে।

কয়েকদিন আগে রাঙামাটিতে ঘটে যাওয়া আদিবাসী আর সেটেলারদের সহিংসতা!  সেটেলারদের দাবি, পাহাড়ি সন্ত্রাসী দিয়ে নয়ন হত্যা, আর তারই ক্ষোভে পাহাড়িদের ২৫০+ বাড়িতে অগ্নিসংযোগ।  

ভাই, এতো ক্ষোভ দিয়ে কী করবেন বলেন তো? আজ প্রকৃতিই যদি না থাকে, তাহলে কি আপনি থাকবেন? ক্ষোভের দাবানলে যে যেখানে পারছেন, জায়গা দখল করে ঘরবাড়ি করছেন, একবারও ভাবেননি কাল কী হবে, ভবিষ্যতে কী হবে,  আপনার ভবিষ্যত প্রজন্মের জীবন নিরাপদ তো? বলেন তো, যে ঘরবাড়িগুলো ভূমিধসের শিকার সে ঘরবাড়িগুলোই বা কয়দিন আগের তোলা? 
আসলে এ ব্যাপারে কিছুই বলার নেই,  নিজেরা যদি নিজেদের হুঁশ ফিরিয়ে না আনেন তাহলে হাজার বার বলেও লাভ নেই। জেগে থেকে যে ঘুমের ভান করে তার ঘুম কি আর ভাঙানো যায়!  

এবার আসি আমাদের পর্যটক ভাইদের কথায়, আপনারা পাহাড়ের সৌন্দর্য্য দেখতে ভালোবাসেন, তাই পাহাড়ে গিয়ে মাতোয়ারা হয়ে উল্লাস প্রকাশ করেন, যা ভার্চুয়াল জগতেও প্রতিফলিত হয়, হয়তো ভাবছেন, এহেন অবস্থায় আমাদের কী করার আছে!

ভাই, আপনিও এদেশের নাগরিক, এই দেশ, এই মাটি আমার আপনার সবার, আমি রাঙামাটিতে জন্মেছি বলে রাঙামাটির প্রাকৃতিক সৌন্দর্য্য রক্ষার দায়িত্ব শুধু আমার নয়, আপনারও। তাই সুনাগরিক হিসেবে ছড়িয়ে দিন সচেতনতার বার্তা। আজ রাঙামাটিবাসীর উপর দিয়ে যে প্রাকৃতিক দুর্যোগ যাচ্ছে, তা যদি রাঙামাটিবাসী কাটিয়ে উঠতে না পারে তাহলে আপনার আমার ভালোবাসার পাহাড়ঘেরা লেকবেষ্টিত এই রাঙামাটিও তার আগের সৌন্দর্য্য ফিরে পাবে না, তাই আসুন সবাই, চিরচেনা রাঙামাটিকে ফিরে পেতে সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিই। সরকারের দিকে তাকিয়ে না থেকে যে যার অবস্থান থেকে যে যেভাবে পারি এগিয়ে যাই। একদিন আপনিও বিশ্বের দরবারে বুক ফুলিয়ে বলতে পারবেন, এই প্রাকৃতিক সৌন্দর্য্যমন্ডিত রাঙামাটি আমার সোনার বাংলাদেশে অবস্থিত।

পরিশেষে, নিহত ব্যক্তিদের পরিবারদেরকে জানাই গভীর সমবেদনা এবং সেই সাথে প্রার্থনা করি, ফিরে  আসুক রাঙামাটির সেই রুপ লাবণ্য, যে রুপ লাবণ্য মানুষকে মাতোয়ারা করে, যে রুপ মানুষের মনকে রাঙিয়ে দেয়, যে রুপ লাবণ্য বিশ্বের দরবারে বাংলাদেশের নাম উঁচু করে। 

লেখাটি ভাল লাগলে শেয়ার করুন:
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

লেখাটি ৯৬৩ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.