মানসিক অত্যাচারের যাঁতাকলে শিক্ষিত নারী

0

রামিছা পারভীন প্রধান:           

মেয়ের বিয়ে হচ্ছে বলে আপদ বিদায় হচ্ছে এটা না ভেবে বরং তাকে বলে দিন তোমার জন্য আমার দরজা সবসময় খোলা, শুধু তোমাকে একটা সামাজিক নিয়মের মধ্যে বেঁধে দিলাম যেটা বাবা-মা হিসাবে আমাদের দায়িত্ব। সে পথে তুমি হাঁটতে থাকো যদি কোনদিন পা পিছলে পড়ে যাও, কখন ভাববে না তোমার কেউ নাই।

দেখবেন আপনার এই কথাতেই সেদিন মেয়েটি বুক ভরে একটা নিঃশ্বাস নিতে পারবে। একজন ভাইকেও বলছি, বাবা-মা এর অবর্তমানে আপনার বোনটিকে সে কথাটি মনে করিয়ে দিন, তাহলে সে আর নিজেকে অবহেলিত মনে করবে না, আর কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনারও জন্ম হবে না। চরম বিপর্যয়ের দিনে সে আপনার  ওই কথাটিতে ভরসা  পাবে

আপনার শিক্ষিত মেয়েটি নিজে পছন্দ করে বিয়ে করেছে বলে খুব তাচ্ছিল্য করে বললেন, নিজে বিয়ে করেছো যেমন, তেমন বোঝো। কোনো সমস্যা হলে আমার বাসায় পা দিতে পারবা না, এতে করে কী করলেন, মেয়েটিকে একটি কঠিন পরীক্ষায় ফেলে দিলেন,  তখন থেকে সে চিন্তা করে শত কষ্ট হলেও আমাকে এই সংসারে টিকে থাকতে হবে। এটাই বাস্তবতা। ফলে যখন হেরে যায় তখন তার কোনো পিছুটান থাকে না  জীবনের মায়া সব ফুরিয়ে যায়, মনে করে জন্মই আমার আজন্ম পাপ। বেঁচে থাকাটাই অনর্থক।

মনে করুন অনেক  বাবা-মা, আত্মীয়স্বজন যখন শিক্ষিত বিবাহযোগ্য কন্যার সুপাত্র নির্বাচন করতে হিমশিম খায়, তখন বলে এতোদিনেও কাউকে পছন্দ করতে পারলি না, পছন্দ করা থাকলে আমাদের আর এতো কষ্ট করতে হতো না। মেয়েদের কপালটাই খারাপ পছন্দ করে বিয়ে করলেও সমস্যা, আবার না করলেও সমস্যা।

মেয়ে শিক্ষিত, চাকরিজীবী বলে নির্যাতিত হচ্ছে না, তা ভাবার অবকাশ নাই, তাঁদের ক্ষেত্রে মানসিক নির্যাতন অনেক বেড়ে গেছেআমি অনেকের কাছে শুনেছি যেমন  চাকুরী করো, তোমার টাকা তো চোখে দেখি না, বাবা-মাকে সব টাকা দিয়ে দাও নাকি? দুই টাকার চাকুরী করো, এতে সেজেগুজে যাওয়ার কী আছে? কাজের লোক নাই, তোমার বাবা-মাকে বলো খুঁজে দিতে, সন্তান সামলিয়ে কীভাবে জব করবা, সেটা তুমি জানো, চাকরিজীবী বউমা অফিস থেকে এলে শাশুড়ি ঠাস করে  দরজা লাগিয়ে বিরক্ত মুখে বলে, তোমার ছেলেকে আমি আর রাখতে পারবো না, অন্য ব্যবস্থা করো, অনেককে দেখেছি চাকরি করে তার স সাহস নাই তার স্বামীর সামনে বাবা-মাকে চিকিৎসার জন্য টাকা দিতে, ঈদ এলে বাবা-মাকে-শাশুড়ির ভয়ে  লুকিয়ে  গিফট দিতে হয়, কারণ শাশুড়ি জানলে অনেক কটু কথা শোনাবে, আবার ঈদ এ মেয়ের  বাবার বাড়ি থেকে কিছু এলো কিনা সে খেয়াল ভালোই  রাখে

স্বামী-স্ত্রী’র মধ্যে সামান্য ঝগড়া হলে অনেকে আছে আজেবাজে ভাষায়্ সন্তানের সামনে স্ত্রীকে গালিগালাজ করেএতে শুধু সে নিজে নয়, সন্তানটিও চরম হীনমন্যতায় ভুগেঅনেকে আছে সন্দেহবাতিক, আবার বউ যদি উচ্চশিক্ষিত, সুন্দরী ও চাকরিজীবী হয়, তাহলে তার সন্দেহের মাত্রাটা  আরও বেড়ে যায় অনেক বাজে মন্তব্য তার দিকে ছুঁড়ে দিতে দ্বিধা করে নাঅনেকে আছে বউ বেতন পাওয়ার  সাথে সাথে টাকাটা  কৌশলে নিয়ে কিছু টাকা ধরিয়ে দিয়ে বলে, এটা খরচ করো। নিজের পরিশ্রমের টাকা ইচ্ছামতো খরচ করার অধিকারও তার নাই।   আবার অনেকে উচ্চশিক্ষিত বউকে চাকরি করতে না দিয়ে ঘরে বসিয়ে রাখে।

পারিবারিক কোনো গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত যখন স্ত্রী’র আলোচনা ছাড়াই নেওয়া হয় আর এটা যদি ছেলেমেয়েদের ব্যাপারে হয়, তাহলে এটা একজন মায়ের জন্য চরম অমানবিক আচরণ, যা একজন শিক্ষিত মায়ের পক্ষে মেনে নেওয়া খুব কঠিন। আরও অনেক মানসিক অত্যাচার আছে যা লিখে শেষ করা যাবে না। এগুলোই হচ্ছে  শিক্ষিত মেয়েদের এক ধরনের মানসিক অত্যাচার যা উপেক্ষা করা যায় না।

আবার ঘুরে-ফিরে সেই আকতার জাহান জলি আপার কথা মাথায় আসে। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের শিক্ষক হয়েও তিনি অনেক শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের শিকার হয়েছিলেন, যা তাঁকে আত্মহত্যার মুখে ঠেলে দিয়েছেএসব মানসিক অত্যাচারের কথা আগে অনেক লেখা হয়েছে, ভবিষ্যতেও লেখা হবে, কিন্তু এর মাত্রা কমে না, বরং অত্যাচারের কৌশলগুলো ভিন্ন রুপ পায়শিক্ষিত মেয়েদের মানসিক অত্যাচারগুলো চোখে দেখা না গেলেও এগুলোই এক সময় একই ছাদের নিচে বসবাস করা দুটো মানুষের মধ্যে ধীরে ধীরে দূরত্ব সৃষ্ট করে। আর দূরত্ব যখন বাড়ে, শুধু বাড়তেই থাকে, কমে না।

লেখাটি ৭,৪৪৩ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

RFL
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.