ফ্যামিলি ডে কেয়ার: উদ্বেগ ও সমাধান নিয়ে চিন্তা-ভাবনা

0

আলফা আরজু: 

আমার নিজের একটা লেখা শিরোনাম “ফ্যামিলি ডে কেয়ার হতে পারে সমাধান” পড়ার পর পরিচিত ও অপরিচিত বেশ কয়েকজন কর্মজীবী মা ও যারা কাজটা করতে চান – কিছু উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। উদ্বেগগুলোকে সংক্ষেপে বলি, “যার কাছে রাখবো তিনি যে ভালো হবেন তার কী নিশ্চয়তা, যার বাড়িতে থাকবে সেই বাড়ির পুরুষদের বিশ্বাস করা ঠিক হবে কিনা”। 

প্রথম উদ্বেগ: “যার কাছে রাখবো তিনি যে ভালো হবেন তার কী নিশ্চয়তা”। এটা অবশ্যই উদ্বেগের সঠিক কারণ। কিন্তু সমাধান সহজ। একজন মায়ের “ইনস্টিংক্ট” খুব strong হয়। আপনি যখন আশেপাশের ৮/১০ জন প্রতিবেশীর সাথে মিশতে শুরু করবেন, তাদের বাসায় যাবেন, আপনার বাসায় তাদের দাওয়াত করবেন – আপনার মা’মন ও বিবেকবুদ্ধি দিয়ে বুঝে যাবেন – কে কেমন। 

আরেকটু সহজ করে বলি – আমরা জীবনে পথ চলতে পরিবার থেকে শুরু করে স্কুল -কলেজে-বিশ্ববিদ্যালয়-পরে কর্মক্ষেত্র-বিভিন্ন সামাজিক, সাংস্কৃতিক, রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে সহস্র মানুষের দেখা পাই, কথা বলি, একসাথে চা খাই ইত্যাদি। কিন্তু এই সহস্র মানুষের মধ্যে আস্তে আস্তে ফিল্টার্ড হয়। বিভিন্ন কাজের খাতিরে সবার সাথেই মিশি – আবার কোনো ঘরোয়া দাওয়াতে এতো মানুষের মধ্যে ২/৩ জনকে দাওয়াত করি।

এই দুয়েক জনের মধ্যে আবার কারোর সাথে পরিবারের অনেক কিছু শেয়ার করি – এইভাবে একেকটা সম্পর্ক অনেক দুর যাই।

আমার বড়বোন-দুলাভাই সরকারি চাকরি করার সুবাদে কুমিল্লা শহরের সরকারি এক কোয়ার্টারে থাকেন। আপুদের দুই বাচ্চা। স্বভাবতই, কর্মজীবী বাবা-মায়ের দুঃশ্চিন্তা – তাদের কোথায় রাখবেন। আপু ওই কোয়ার্টারে উঠার দিনই – মালামাল যখন বাসায় তুলছে – পাশের বাসায় – নক করেছে, পরিচিত হয়েছে, জানিয়েছে আপু কী করে, ভাই কী করেন, বাচ্চাদের পরিচয় করিয়ে বলেছে, “উনি তোমাদের আন্টি”, “দুলাভাই-আপু ওই প্রতিবেশীকে আপা/ভাবি ডাকেন”।

তারপর একদিন আপু তাদের বিকেলে চা খেতে বলেছেন, ছাদে অথবা নিচে বাচ্চাদের খেলতে নিয়ে যাবে – পাশের দরজায় নক করে বলছে, “আপা/ভাবি, আপনার বাচ্চারা খেলতে যাবে, চাইলে আমাদের সাথে দিতে পারেন। এরপর….গত আট/দশ বছর আপুদের পাশের বাসার ঘরের দরজা আর আপুর দরজা সকালে খুলে – মধ্যরাতে ঘুমানোর সময় বন্ধ হয়। 

আপু অফিস যাওয়ার সময় ভাবি/আপা ‘র কাছে ঘরের সব চাবি দিয়ে যায় – সেই ভাবি/আপা উনার দুই বাচ্চা ও আপুর দুই বাচ্চা নিয়ে থাকেন। ওই বাচ্চারা একসাথে খায়, খেলে, ঘুমায়। একসাথে ছবি আঁকার, গানের ও আরবি শিক্ষকদের কাছে পড়ে। ঈদ-পার্বনে দুই পরিবারই জামা-জুতা উপহার দিচ্ছেন, সারাক্ষণ তরকারির বাটি চলা-চালি। সেই বাচ্চারা কী সুন্দর গান করে, ছবি আঁকে, আবার ক্যাডেট কলেজের মতো কম্পিটিটিভ জায়গায় ভর্তির সুযোগ পায়। বাচ্চাগুলো সুস্থ-সুন্দর-প্রাণবন্ত হয়ে বেড়ে উঠছে।

আপুর ছেলে এখন অনেক বড় ক্যাডেট কলেজের হোস্টেলে থাকে – পেরেন্টস ডে’র দিন ওই প্রতিবেশী আন্টি – বাচ্চার পছন্দের খাবার-দাবার নিয়ে আপু-দুলাভাই এর সাথে চলে যায়। ছেলেও আন্টি আসবে শুনলেই খুশি। ইত্যাদি ছোটোখাটো সব বিষয়ে মাখামাখি দুই পরিবারের।

দুই বাড়ির কারোর অসুখ-বিসুখে, বিপদে-আপদে, উৎসবে – সবাই এক সাথে। এখন প্রশ্ন আসবে, উনাদের ভাগ্য ভালো – দুই পরিবারের সব মিলে গেছে – এই মিল কোনোদিন একপক্ষ থেকে হয় না। দুই জনকেই “approachable” হতে হবে। আমরা ঢাকা শহরে কখনও কখনও বছরের পর বছর এক বাড়িতে থাকি – কিন্তু জানি না – পাশের বাড়ি কে থাকেন, কেমন আছেন, ইত্যাদি।

তাই মানুষজনের সাথে মিশে দেখেন – যারা ভালো (আপনার বিচারে) তাদের সাথেই সখ্যতা গড়ে তুলুন – অনেক কিছু সহজ হয়ে যাবে। সহজ-স্বাভাবিক ভাবে মিশে দেখুন। মনের মধ্যে নয়-ছয় (আমার কী স্বার্থ অথবা গাইয়া-খ্যাত-ফকিরের সাথে আমরা মিশি না) এইসব ভাব দেখতে যেয়ে আমাদের অনেক ক্ষতি হয়ে যাচ্ছে। কেউ কাউকে বিশ্বাস করে না, শ্রদ্ধা নাই, ভালোবাসা-সহানুভূতি নাই। আমরা এমন আধুনিক হয়েছি – কারোর তারকাখচিত চাকরি, পোশাক, অর্থ-বিত্ত দেখে মিশি। কিন্তু ওই মেলামেশাগুলো শুধু ফেইসবুকে সেলফি অথবা ছবি দেয়ার জন্য খুব ভালো। অনেক লাইক পাবেন, লোকজন টের পাবে, “আপনি কত বড় মাপের মানুষ”, কত নামি-দামি লোকজন চেনেন ইত্যাদি।

কিন্তু ঐ-যে আপনার সন্তান – ওকে আপনি কী শিক্ষা দিবেন? আপনি কি বলবেন – “ক্লাসে যে বাচ্চা দামি জুতা/জামা/ব্যান্ড পরে অথবা দামি গাড়িতে করে স্কুলে আসে -ওর সাথে শুধু মিশবা”! কিংবা এইসব কী বলেন, গরিবদের সাথে কথা বলবা না, গ্রাম অথবা মফস্বল থেকে যারা আসে, তাদের সাথে কথা বলবা না? এইসব বলবেন, নিশ্চয়ই না। বাইরে দেখানো চাকচিক্য শুধুই আর্থিক সামর্থ্যের চিহ্ন। আপনার বিপদে কতটা এগিয়ে আসবে? অন্যদিকে, যিনি অন্তর থেকে ভালো মানুষ – তারাই অন্যের বিপদে কাজে আসে।

আমি জানি এইসব কোনো বাবা-মা মুখে বলে না। বাচ্চারা আপনার শুধু মুখের কথা দেখে না – তারা আপনার/আমার জীবনাচরণ অনুসরণ করে। তাই আজকে যখন আমরা সিংহভাগ সময় কর্মক্ষেত্রে থাকি, আমাদের সন্তানেরা ঘরে দুমড়ে-মুচড়ে মানসিকভাবে ছোট হতে থাকে। 

দ্বিতীয় উদ্বেগ: “যার বাড়িতে থাকবে সেই বাড়ির পুরুষদের বিশ্বাস করা ঠিক হবে কিনা।” সাধারণত আমরা যারা শহরে থাকি – বেশির ভাগ একক পরিবার। যেখানে – স্বামী-স্ত্রী ও সন্তান। আপনি যেই সময়টুকু আপনার সন্তান প্রতিবেশীর কাছে রাখবেন – সেই সময় – ঘরের পুরুষরা বাসায় থাকার সম্ভাবনা কম। যদি থাকেনও ওই আগের বিষয়টাই আসবে – মায়েরা এমন মানুষ যারা মানুষ চেনে। আপনি কিছুদিন না মেলামেশা করে আপনার সন্তানকে দেবেন না। সেইজন্য, এই প্রক্রিয়া শুরু করতে হবে যে যত তাড়াতাড়ি পারেন তখন থেকেই।

পাশের বাড়ি বেড়াতে যান, কথা বলুন, মিশে দেখুন, আপনার বাসায় আসতে বলুন। একসাথে কিছুদিন চলাফেরা করে পরে সিদ্ধান্ত নিন। আপনি বুঝে যাবেন – ওই বাড়ির পুরুষ মানুষটা কেমন।

আমার এক বন্ধু দীর্ঘদিন শ্বশুর বাড়িতে থেকেছে। সেই বাড়িতে সবাই নিজেরা ভাই-বোন পরিবার নিয়ে আলাদা আলাদা ফ্ল্যাটে থাকে। ওই বন্ধুকে দেখতাম – যদিও সবাই ওর আত্মীয় – কিন্তু তবুও ওর বাচ্চাদের সবার বাসায় রাখতো না। বিশেষ একজন-দুইজনকে বিশ্বাস করতো। তার কাছে খাওয়া থাকুক বা না থাকুক, একটাই শোবার ঘর – তবুও ওদের কাছে ভরসা ছিল। কেন? মায়ের মন। ও বলতো “আমার অন্য ননদ-ভাশুরদের বাসায় উঠতি বয়সের ছেলে বাচ্চা আছে, ওদের অনেকগুলো শুবার ঘর। কোথায় কী হবে, কেউ টের পাবে না। এইটা কোনো অবিশ্বাস অথবা কাউকে ছোটো করা না। ওর এই আশংকার অনেকগুলো কারণের একটা বড় কারণ – যেই জা’এর একটাই শোবার ঘর – তার পক্ষে বাচ্চাগুলারে মনিটর করা সহজ।” হিসাব সোজা। 

তাই কোন প্রতিবেশী দামি চাকরি করে, ঘর কত সুন্দর সাজিয়েছে, কত বড় বাড়ি এইসব কিছু গণনা না করে – খোঁজ রাখুন সেই প্রতিবেশীর – যার হয়তো দামি ফার্নিচার নেই – এটা নেই – সেটা নেই। কিন্তু মানুষ ভালো, পারিবারিক শিক্ষা ভালো, সৎ-নীতিবান এইসব দেখুন।

লেখাটি ৩৩৭ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

RFL
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.