‘ফ্যামিলি ডে কেয়ার’ হতে পারে একটা সমাধান

0

আলফা আরজু:

দুইদিন ধরে আবার ঝিম মেরেছিলাম – “উইমেন চ্যাপ্টার” এ শিশুদের নির্যাতন নিয়ে বাস্তব ঘটনার অবলম্বনে দুইটা লেখা পড়ার পর থেকে। আমার ব্যক্তিগত মারাত্মক কিছু মানসিক সমস্যা আছে। এর মধ্যে অন্যতম একটা হলো – কোনো দুর্ঘটনা অথবা অসুস্থতার symptom শুনলে অথবা পড়লে- আমি মেলাতে শুরু করি “এই অসুস্থতা আমার ও আমার পরিবারের কারোর আছে কিনা।”

আমি দশবছর স্বাস্থ্য বিষয়ক সাংবাদিকতা করেছি। প্রায় প্রতিদিন নতুন নতুন রোগ-বালাই নিয়ে কাজ। হাসপাতাল আমার বাড়িঘরের মতো। আর এর পরিণতি ছিলো সোজা সাপ্টা – “ধরেন কোনোদিন গেছি ডেঙ্গু জ্বর/ক্যান্সার/ডায়রিয়া/এইডস/যক্ষা/ফিস্টুলা নিয়ে সংবাদের তথ্য নিতে” – ব্যস, বিশেষজ্ঞদের কাছ থেকে তথ্য মতামত, রোগীর সাক্ষাৎকার ইত্যাদি করতে করতে মেলাতে থাকতাম – আমার কি এই symptom গুলা আছে, আমার মেয়ের, স্বামীর, আম্মার অথবা আব্বার কি আছে! নাকি আমার ছোটবোন বা ভাইয়ার, এইভাবে একের পর এক কাছের মানুষদেরকে নিয়ে উদ্বেগ।

একবার আম্মার খুব কাশি – ওই সময় আমি যক্ষা নিয়ে ব্যাপক ব্যস্ত (প্রতিবেদনের কাজ করছিলাম)। আম্মার কাশির দুই/তিন দিনের মাথায় জোর করে ধরে নিয়ে ডাক্তারের কাছে গেসিলাম – আর আব্বা-আম্মাকে যক্ষার সকল প্রস্তুতি নেয়ার মতো মানসিকভাবে প্রস্তুত করে ফেলেছিলাম। তারপর আর কী – ঠাণ্ডায় কাশির জন্য – এক পাতা নাপা নিয়ে বাসায় ফিরেছি।

আরেকবার তথ্য জোগাড় করতে গেছি “ব্রেকিং দা সাইলেন্স” নামক এক অলাভজনক প্রতিষ্ঠানে। সেখানে দাদা-নানা-মামা-চাচা থেকে শুরু করে নিকট আত্মীয় ও বাড়ির কাজের লোক, দারোয়ান, ড্রাইভারদের দ্বারা ছোট ছোট শিশু নির্যাতনের বেশ কিছু কেস ছিল। সেইদিন কোনোরকম ওই অফিসের লোকজনের সাথে কথাবার্তা শেষ করে – দৌড়ে ফিরেছিলাম ঘরে। আমার কন্যা বাসায়।

সারা রাস্তা আমি গাড়ি চালককে তাড়া দিয়েছি – তাড়াতাড়ি যাও, এই রাস্তায় কেন আসলে – জ্যামে পড়ার জন্য – ইত্যাদি। আসলে ওই একটা রাস্তা দিয়েই আমাদের বাসায় আসতে হয়, কিন্তু আমার সেদিন খুব তাড়া ছিল– ওই ভয় আমাকে তাড়িয়ে বেড়াচ্ছে – ঘরে আমার কন্যা সন্তান ও আমার ঘরকন্নার সহযোগিতায় অল্প বয়সী কন্যা। তারা নিরাপদে আছে কিনা! বাসা থেকে অফিসের কাজে বের হওয়ার সময় অনেকরকম আদেশ-নিষেধ করতাম ওদেরকে। কিন্তু সেইদিন আমার দুশ্চিন্তার নতুন নতুন সব কারণ – এতো কাছের মানুষগুলোও এমন হায়েনা হয়ে উঠতে পারে? সেই ভয়, আতঙ্ক নিয়ে ঘরে ফিরেছি। 

অনেকদিন ভুগেছি সেইসব আতংকে। আমার সন্তানরা জানে – কীভাবে নিজেদের নিরাপদে রাখতে হবে। আমি ও আমার ছোটবোন এইসব বিষয়ে যতরকম তথ্য ওদেরকে দেয়া যায়, দিয়েছি । কিন্তু তারপরও – মা’র মন। আবার কর্মজীবী মায়ের “Mother Guilt” খুব বেশি থাকে বলে আমার মনে হয়েছে – সেটা সমাজের চাপে অথবা পরিবাবের অসহযোগিতায় কিংবা দৃষ্টিভঙ্গির কারণে হতে পারে। জানি না। কিন্তু আমি “severely Mother Guilt” এর শিকার। আমার মেয়ে শুকনা কেন? আমার মেয়ে সবার সাথে মিশে না কেন? আরো অনেক কিছুর কারণ হিসেবে আমার পেশা’ প্রশ্নবিদ্ধ ! তারপরও আমি জানি – আমার উপার্জনের প্রতিটা পয়সা – আমার সংসারের জন্য খুব দরকার ছিল ওই সময়।

সেইরকমভাবে সত্য ঘটনা অবলম্বনে লেখা পড়ার সময়  – আমার শুধু হিয়া (কন্যা) ও কাব্য (ছেলে)র মুখ ভেসে উঠেছে। আমিও ওদের বাসায় রেখে কাজে গেছি। দেশে-বিদেশে থেকেছি। যাক এখন আমি আর কারোর উপর ভরসা করি না। পছন্দের চাকরিটার সাথে একটা বোঝাপড়া করে – পারিবারিক ব্যবসা করি – যার সময়, এপয়েন্টমেন্ট সব আমার হাতে। আর আমি সেইসব করি হিয়া ও কাব্য’র সময়ের সাথে ম্যাচ করে। 

কিন্তু আমি জানি কত বড় যুদ্ধ আমাকে করতে হয়েছে মনের সাথে। সান্তনা একটাই, আমি একদম লেটাপেটা করে ২৪ ঘন্টা ওদের সাথে থাকতে পারছি। এই আমার শান্তি। আমি প্রায় মাঝরাতে নিজের শোবার ঘর থেকে দৌড়ে যাই ওদের ঘরে। ওদের রুমের তাপনিয়ন্ত্রক মেশিন ঠিক মতো চলছে কিনা, কোলের বালিশটা পড়ে গেলো কিনা, মাথার বালিশটা এমনিতেই ঠিক করি কয়েকবার করে। 

কিন্তু আমার কর্মজীবী বোন, ভাবী, বন্ধুরা কিংবা অন্য সব মা, যারা সারাদিন অফিস করেন – আর সন্তানের জন্য বুকভরা দীর্ঘশ্বাস ছাড়েন।

আচ্ছা যাক সেইসব। যা লিখতে এতো কিছু দিয়ে শুরু করলাম – সেটা বলি। প্রবাসে (অস্ট্রেলিয়াতে) নির্বাসিত জীবনে আমি একটা অসাধারণ সমাধান দেখেছি – কর্মজীবী মা-বাবার জন্য। এখানে অনেক বড় আকারে যেমন চাইল্ড কেয়ার সেন্টার আছে, তেমনি “ফ্যামিলি ডে কেয়ার” বলেও এক ধরনের ব্যবস্থা আছে। বড় চাইল্ড কেয়ারগুলো খুব ব্যয়বহুল। অন্যদিকে “ফ্যামিলি ডে কেয়ার”গুলো তুলনামূলকভাবে সস্তা।

সাধারণত মায়েরা (যারা বাইরে কাজ করেন না) সরকারের অনুমতিক্রমে বেশ কিছু ক্লিয়ারেন্স সার্টিফিকেট নিয়ে “ফ্যামিলি ডে কেয়ার” গুলো চালান। অনুমতি পত্রের অন্যতম হচ্ছে “শিশুদের সাথে কাজ করার উপযুক্ত কিনা” ধরনের একটা ছাড়পত্র – এখানে দেখা হয় – যিনি “ফ্যামিলি ডে কেয়ার” চালাবেন তার শিশু নির্যাতনের কোন পূর্ব ইতিহাস আছে কিনা? যদি থাকে তাইলে, উনি এই কাজ করতে পারবেন না।

এই আদলে বাংলাদেশ কর্মজীবী মায়েদের জন্য কিছু করা যায় কিনা। শুনেছি গুলশান-বনানীতে খুব ভালো ভালো কিছু চাইল্ড কেয়ার আছে।  কিন্তু শহরের রাস্তাঘাটের জ্যাম পার হয়ে খিলগাঁও-শাজাহানপুরের কোনো মা কি গুলশান যাবেন রাখতে? পরে আবার মতিঝিল আসবেন অফিস করতে? সেইটা অসম্ভব।

তাই আপনি যেই বাসায় -থাকেন উপরে-নিচে প্রতিবেশীদের সাথে কথা বলে দেখুন – কাউকে না কাউকে আপনি পাবেন যিনি বাইরে কাজ করেন না এবং ভালো। তাদেরকে বলে দেখেন –  যাওয়ার সময় সন্তানকে ড্রপ করে যাবেন, কাজ শেষ বাসায় ফেরার সময় নিয়ে আসবেন। যেই বাসায় রাখবেন – সেই বাসায় আপনার সন্তানের খাওয়া-থাকা ও পড়ানোর বিষয়টা বিস্তারিত বলে নিন। এর বিনিময়ে আপনি ওই প্রতিবেশীকে আর্থিক সম্মানি দিবেন।

একসময় আমাদের মফস্বল শহরে দেখেছি – যে কাকীরা জব করতেন তাদের সন্তানদের আমাদের অথবা অন্য প্রতিবেশীর বাসায় রেখে দিব্বি সারাদিন ব্যাংক-স্কুলে চাকরি করেছেন। তখন পয়সা দিতে হতো না। কারণ আন্তরিকতা কি আর পয়সা দিয়ে পরিশোধ হয়? কিন্তু বর্তমানে আমাদের অনেক কর্মজীবী মায়ের হাহাকার। সন্তান হলেই চাকরি হুমকির মুখে। কে দেখবে সন্তানকে, কার কাছে রেখে যাবেন, ইত্যাদি।

দেখুন না একটু অন্যভাবে চিন্তা করে। কথা বলুন প্রতিবেশীর সাথে। একটু অন্যভাবে দেখুন। আমি এইবার দেশে ফিরে – এই কাজ করতে চাই। আমি যদি দিনে পাঁচজন বাচ্চা রাখি, যদি ৫০-১০০ টাকা প্রতি বাচ্চার মা দেয় – দিনে আয় হবে ২৫০-৫০০ টাকা।  আমাদের আশেপাশে অনেক শিক্ষিত ভালো প্রতিবেশী মা আছেন – খুঁজুন। সন্তানের উদ্বেগ মাথায় নিয়ে কর্মক্ষেত্রে মনোযোগী হওয়া সত্যি কঠিন।

অস্ট্রেলিয়াতে ঘণ্টা হিসেবে সম্মানী দেয়া হয়। আমাদের দেশের প্রেক্ষাপটে – দৈনিক হিসেবে করে – আপনার ইনকাম চিন্তা করে – সন্তানের ভবিষ্যৎ ও আপনার জবের নিশ্চয়তার কথা ভেবে দেখুন – কাজে লাগতে পারে।

লেখাটি ভাল লাগলে শেয়ার করুন:
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

লেখাটি ২,২৩৮ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.