তাহমিমা আনামের ‘গার্মেন্টস’ কি ‘ভাবমূর্তি’ সমস্যা?

0

তানিয়া মোর্শেদ:

তাহমিমা আনামের “গার্মেন্টস” গল্পটি আজ সকালে পড়েছি। এর আগে তাঁর কোন লেখা পড়িনি। এই গল্পটির জন্য তিনি ও’হেনরি পুরস্কার পেয়েছেন।

লেখাটি সম্ভবত অনেকেরই পছন্দ হয়নি। কার লেখা কার অপছন্দ বা পছন্দ হবে তা ব্যক্তিগত ব্যাপার। তবে কিছু লেখা পড়ে মনে হয়েছে, লেখক বুঝি বাংলাদেশের ভাবমূর্তিতে আঘাত করেছেন! ইদানীং সবকিছুতেই কোনো না কোনো মানুষের অনুভুতি আঘাতপ্রাপ্ত হচ্ছে!

কারো কারো অভিযোগ, একসাথে কী করে তিনজন নারীকে বিয়ে করা যায়? কাজীর (বিয়ের উকিল) সামনে এই তো প্রশ্ন? মুসলিম আইনে চারজন স্ত্রী একসাথে রাখা যায়। বাংলাদেশের আইন যতোটুকু জানি, এই আইন চালু আছে। একসাথে চারজন স্ত্রী রাখা গেলে একসাথে বিয়ে করতে কী অসুবিধা? কোন আইন আছে কি একই সময় একাধিক (চারজন পর্যন্ত) বিয়ে করা যাবে না? কেউ করেনি বলে যে করা যায় না, মানে আইনে আটকায়, তা কি জানা আছে কারো? একসাথে চার স্ত্রী রাখা গেলে একই সময়ে বিয়ে করার বিষয়টি লেখাতে এতো আপত্তি কেন? আপত্তি কি শুধু চারজনকে বা তিনজনকে এক সাথে বিয়ে করাতেই? নাকি আপত্তি হবার কথা একসাথে কেন একাধিক স্ত্রী? একই সময়ে একাধিক বিয়ে করাটা কি বেশী অমানবিক, একসাথে একাধিক স্ত্রী রাখার থেকে?

গার্মেন্টসের নারী ঘর ভাড়া নেবার জন্য একজনকে বর হিসাবে বেছে নিতে বাধ্য হোন, তা কি খুব অবাস্তব কিছু? গার্মেন্টসের নারী তো সমাজের নিচুতলার মানুষ, বাংলাদেশের অধিকাংশ মানুষের চোখেই। বাংলাদেশে উচ্চ শিক্ষিত, চাকুরীজীবী একাকী নারী (বিবাহিতা, অবিবাহিতা, ডিভোর্সি) খুব সহজেই বাসা ভাড়া পান? তাঁদের প্রশ্ন করা হয় না, তাঁর স্বামী কোথায়? একা এক বা একাধিক পুরুষকে যেমন বাড়ী ভাড়া দিতে চান না অধিকাংশ বাড়িওয়ালা, তেমনই একা বা একাধিক নারীকেও বাড়ি ভাড়া দিতে অনেকেই ইচ্ছুক নন।

“পরিবার” ছাড়া পুরুষ কী নারী বাড়ি ভাড়া পেতে শিক্ষিত সমাজেই অনেক বাঁধা। সেখানে গার্মেন্টসের নারীদের “পুরুষ” ছাড়া ঘর (ঘর বলা যায় কি?) ভাড়া কে দেয়?! ঘর ভাড়ার জন্য গার্মেন্টসের কোনো নারী কাউকে স্বামী সাজিয়েছেন বা কাজীর সামনে কাগজে সই বা হাতের ছাপ দিয়েছেন, একথা গল্পে পড়তে কিসের অসুবিধা?

বেশ কয়েক বৎসর আগে এক খবরের কাগজে (অনলাইনে) ছবি দেখেছিলাম একটি। গার্মেন্টসের শ্রমিকদের জীবনের উপর খবর। ছবিটিতে একটি ঘরে (ঘর!? ছাপরা বলা যায়) কাঠের তক্তা ইটের উপরে রেখে বিছানা। সেই বিছানায় একাধিক নারী-শিশু শুয়ে আছেন। তাদের পায়ের দিকে একজন পুরুষ উলটো দিক করে শুয়ে। মানে তাদের মাথার দিকে তার পা। ইট দিয়ে উচুঁ করা কাঠের নিচে একাধিক নারী শুয়ে। শিশুও আছে। ঘরটির (ছাপরা) বাকি যেটুকু জায়গা আছে সেখানেও গাদাগাদি করে নারী, শিশু। ছোট্ট ঘরে (ছাপরা) এতোজন মানুষ গায়ের সাথে গা লাগিয়ে ঘুমিয়ে আছে দেখে আমি স্তম্ভিত হয়েছিলাম! নিজেকে অপরাধী মনে হয়েছে! এখনও হয়। পৃথিবী কী নিষ্ঠুর! জীবন কী বৈষম্যের!

এরকমই ছবি দেখেছি বিভিন্ন দেশে শ্রমিক, কর্মী হিসাবে বাস করা বাংলাদেশের পুরুষদের! অথচ বাংলাদেশের জিডিপি যাঁদের রক্ত ঝরা শ্রমের বিনিময়ে, গার্মেন্টসের নারী ও প্রবাসের শ্রমিক, বেড়ে চলেছে তাঁদের খবর কেউ রাখে না! আমরা কেউই বাদ যাই না এই অপরাধ থেকে। তাহমিমা আনাম হয়তো কমই লিখেছেন! তাঁর লেখার জন্য বাংলাদেশের “ভাবমূর্তি” নষ্ট হচ্ছে? আকাশ সংস্কৃতির এই যুগে কোনো তথ্য আজ আর কোথাও আটকে থাকে না। পৃথিবীর সব প্রান্তেই সব কথা, খবর, ছবি পৌঁছে যায়।

“ভাবমুর্তি” নষ্ট হচ্ছে ভেবে যারা কষ্ট পাচ্ছেন তারা ভাবুন, আপনি বা কেউ স্বীকার না করলেও সত্যটা প্রকাশিত হচ্ছেই, হবেই। সত্যকে অস্বীকার করে, ধামাচাপা দিয়ে আর কত কাল? লেখক কি এ কারণেও সমালোচনার শিকার হচ্ছেন, তিনি একজন বাংলাদেশী নারী হয়ে গল্পে “যৌনতা” নিয়ে এসেছেন তাই?

লেখক, কবি, শিল্পী, বৈজ্ঞানিক বা যেকোনো পেশা বা নেশার মানুষকে “পুরুষ” বা “নারী” ট্যাগ দেওয়া বন্ধ করুন। শারীরিক কিছু বিষয় ছাড়া নারী আর পুরুষের কোনো পার্থক্য নেই। একজন পুরুষ যদি লেখায় যৌনতা আনতে পারেন, একজন নারীও পারেন। কে আনবেন আর কে আনবেন না, তা ব্যক্তিগত ব্যাপার। নারীকে মানুষ ভাবুন। তাহলে আর তাহমিমা আনামের এই লেখা পড়ার সময় মনে হবে না, একজন নারী (তাও আবার বাংলাদেশী) এভাবে লিখতে পারলেন? কয়েক বৎসর আগে আমার ছোট্টবেলার বন্ধু বলেছিল, যে একজন লেখক পরিবারের, “তুই যদি গদগদ প্রেমের উপন্যাস লিখতি বা রান্নার বই লিখতি, দেখতি কতজন তোর প্রশংসা করতো! তুই তা করিসনি। এখন দেখবি বিনা কারণেই তোকে কিছু মানুষ অপছন্দ করছে।”

আমার বই প্রকাশের পর বলেছিল সে। আমি তো লেখক নই। তাতেই বুঝেছি কিছু! আর তাহমিমা আনামের এই লেখা ও’হেনরি পুরস্কার এনেছে! অনেক পুরুষেরই অনুভূতি আঘাতপ্রাপ্ত হয়েছে, অনেক দেশপ্রেমিকের কাছে দেশের “ভাবমূর্তি” ক্ষুন্ন হয়েছে! দেশ মানে কি শুধুই এক খণ্ড ভূমি?

গার্মেন্টসের নারী, প্রবাসের শ্রমিক, দেশের শ্রমিক-কৃষক, নির্যাতিত অমুসলমান যে কেউ, পাহাড়ের ও সমতলের নির্যাতিত আদিবাসী এবং অবহেলিত যে কোন মানুষের জীবনের সত্যিকারের চিত্রে যদি আপনাদের কাছে দেশের “ভাবমূর্তি” ক্ষুন্ন হয়, তাহলে আপনি সেই ক্ষুন্ন হওয়া “ভাবমূর্তি” ধুয়ে পানি পান করুন!

লেখাটি ১,৮৭২ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

RFL
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.