ধর্ষকদের কাছে ওদের পাঠানো হচ্ছে কেন?

0

শান্তা মারিয়া:

আশির দশকের একটি ঘটনা বলি। তখন মধ্যপ্রাচ্যে বাংলাদেশের প্রচুর পুরুষ শ্রমিক হিসেবে ও অন্যান্য চাকরিতে গেলেও নারীরা খুব কমই যেতেন। বাংলাদেশের এক নারী চিকিৎসক তার স্বামীর সঙ্গে গিয়েছিলেন মধ্যপ্রাচ্যে। দুজনেই একটি ক্লিনিকে চাকরি নিয়ে সেখানে যান। ভালোই চাকরি করছিলেন। একদিন এক স্থানীয় ধনী ব্যক্তি লেডি ডাক্তারকে প্রস্তাব করেন যে, ভদ্রমহিলা যদি তার বাড়িতে গিয়ে তাকে ম্যাসাজ করে দেন এবং অবধারিতভাবে তার শয্যাসঙ্গিনী হোন, তাহলে কত টাকা তাকে দিতে হবে।

ডাক্তার বিস্ময়ে হতবাক হয়ে বলেন, যে তার স্বামী আছে। তাছাড়া তিনি যৌনকর্মী নন। লোকটি বলেন, তিনি বেআইনি কিছু করতে চান না। তাকে তিনি প্রয়োজনে বিয়ে করে হারেমে রাখবেন। আর তার স্বামীকেও উপযুক্ত মূল্য দিবেন যাতে তিনি তালাক প্রদান করেন।

বুদ্ধিমতী ডাক্তার বলেন, তিনি ভেবে দেখার জন্য দুই সপ্তাহ সময় চান। সেদিনই তিনি স্বামীর সঙ্গে পরামর্শ করে এক সপ্তাহের মধ্যে চাকরি ছেড়ে দেন। ক্ষতিপূরণ দিতে হয় অবশ্য কিছুটা। তারপরের সপ্তাহেই তিনি দেশে ফিরে আসেন।

সেই চিকিৎসক আমার পরিচিত ছিলেন। তার মতে  মধ্যপ্রাচ্যের পুরুষরা নারীকে ভোগ্য পণ্য ছাড়া আর কিছুই ভাবে না। বিশেষ করে সৌদী আরবের পুরুষরা নারীকে নিতান্ত যৌন সামগ্রী বলেই মনে করে। ২০১৭ সালে পৌঁছেও তাদের মানসিকতা যে অগ্রসর হয়নি সেটা বোঝা যায় সম্প্রতি প্রকাশিত পত্রিকার রিপোর্ট থেকে। মধ্যপ্রাচ্যে যে বাংলাদেশী নারীরা গৃহকর্মীর চাকরি নিয়ে যান তারা সেখানে প্রভ‚ত নির্যাতনের শিকার হন। এই অভিযোগ নতুন নয়। এর আগেও অনেকবার এই অভিযোগ উঠেছে। নির্যাতনের মধ্যে রয়েছে ধর্ষণ, গণধর্ষণ, প্রহার, অঙ্গহানি ইত্যাদি। সৌদী পরিবারে গৃহকর্মী হিসেবে কর্মরত নারীর উপর একই পরিবারের বাবা, ছেলে এবং অন্য পুরুষরা ধর্ষণ চালিয়েছে এমন অভিযোগ হরহামেশাই পাওয়া গেছে।  সৌদী পুরুষদের চোখে গৃহকর্মী নারী মানে ক্রীতদাসী। তাকে ইচ্ছামত ব্যবহার করা যায়, নির্যাতন চালানো যায়, ধর্ষণ করা যায় এবং হাত পাও ভেঙে দেওয়া যায়। নির্যাতনের কারণে তার মৃত্যু হলেও কিছু আসে যায় না। কারণ সে হলো ‘কেনা বাঁদী’।

উন্নত বিশ্বে এই যুগে ক্রীতদাস প্রথা অকল্পনীয় হলেও সৌদীদের চোখে তাদের গৃহকর্মীরা দাস-দাসী ছাড়া আর কিছুই নয়।  যারা একসময় টিভিতে ‘রুটস’ সিরিজ দেখেছেন তাদের নিশ্চয়ই মনে আছে আফ্রিকা থেকে ধরে নিয়ে যাওয়া মানুষদের আমেরিকায় দাস হিসেবে বিক্রি এবং তাদের উপর নির্মম নির্যাতনের কথা। দাসপ্রথা বিশ্ব থেকে বিলুপ্ত হলেও সৌদীতে তা জাঁকিয়ে আছে। শুধু এখন দাসদের কিনে নেওয়ার বদলে বেতন দেওয়া হয়। সেই বেতনও যে সবসময় ঠিকঠাক দেওয়া হয় তা নয়। দালাল এজেন্সিগুলো নানা ছলচাতুরি করে এই বেতন নিয়ে। নির্মমভাবে ঠকায় শ্রমিকদের।

গৃহকর্মী নারীদের উপর ধর্ষণসহ বিভিন্ন নির্যাতনের কারণে  ইন্দোনেশিয়া ও ফিলিপাইন সৌদি আরবে তাদের নারীদের কর্মী হিসেবে পাঠানো বন্ধ করে দিয়েছে। কিন্তু বাংলাদেশ থেকে নারীদের পাঠানো হচ্ছে সৌদি আরবে গৃহকর্মী হিসেবে। সেখানে তারা নির্মম নির্যাতনের শিকার হচ্ছে। অনেকে পালিয়ে চলে আসছে দূতাবাসে আশ্রয় পেতে। অনেকে আত্মহত্যা করছে। বেতন বাকি থাকায় নিঃস্ব হয়ে দেশে ফিরেছেন অনেকে। ধর্ষণ ও যৌন নির্যাতনের কারণে রোগাক্রান্ত, আহত, মরণাপন্ন হয়েও দেশে ফিরেছেন অনেকে। সৌদিতে বিদ্যমান শরিয়া আইন অনুসারে এইসব ধর্ষণ প্রমাণও করা যায় না, কোনো সৌদি নাগরিকের বিরুদ্ধে মামলা করাও সাধ্যাতীত এবং সুবিচার পাওয়া তো সুদূর পরাহত।

প্রশ্ন হলো এই বর্বর, ধর্ষকদের দেশে আমাদের নারীদের পাঠানো হচ্ছে কেন? আমাদের কি বৈদেশিক মুদ্রা এতোই প্রয়োজন এবং ঘরে ভাতের এতোই অভাব যে ধর্ষিত, নির্যাতিত হওয়ার জন্য আমাদের নারীদের ওখানে পাঠাতে হবে?

আর তাদের বেতনও তো খুব স্বল্প। সৌদি আরবে নারী গৃহকর্মীদের যে বেতন দেওয়া হয়, বাংলাদেশে অনেক উচ্চ মধ্যবিত্ত পরিবারে গৃহকর্মীকে সেই পরিমাণ অর্থই দেওয়া হয়। আর গ্রামে-গঞ্জে নারীদের নানাভাবে কর্মসংস্থান করা যায়, করা হচ্ছেও। সমন্বিত পরিকল্পনা থাকলে দেশেই নারীর কর্মসংস্থান হতে পারে।

আমি বলছি না যে, নারী বিদেশে যাবে না বা বিদেশে তার কর্মসংস্থান হতে পারবে না। অবশ্যই হবে। দক্ষ শ্রমশক্তি হিসেবে নারীরা অবশ্যই বিদেশে চাকরি করতে যাবে। তারা বিশ্বের সর্বত্র পাড়ি দিবে, জয় করবে সারা বিশ্ব। কিন্তু মধ্যপ্রাচ্যের মতো পশ্চাৎপদ মূল্যবোধের দেশে, নারীকে যৌনবস্তু বলে ভাবার দেশে এবং ধর্ষক নির্যাতকদের দেশে বাংলাদেশের নারীদের কেন পাঠাতে হবে?

তাদের চিন্তাধারা হচ্ছে, নারীদের না পাঠালে তারা বাংলাদেশ থেকে পুরুষ শ্রমিকও নেবে না। অতি অপমানজনক এই শর্ত। এই ধরনের বর্বরদের পরিত্যাগ করে আমাদের শ্রমশক্তি মন্ত্রণালয়ের উচিত বিকল্প দেশ সন্ধান করা। বাংলাদেশ শ্রমশক্তি রপ্তানী করে। কিন্তু সে শ্রমশক্তি তো হতে পারে প্রযুক্তি-দক্ষ মানুষও।  

তথ্য প্রযুক্তিতে দক্ষ জনশক্তি দিয়ে আজ ভারত বিশ্বে নিজের অবস্থান গড়ে নিচ্ছে। ইংরেজি ভাষার দক্ষতায় শ্রীলংকাবাসী সর্বত্র সমাদর পাচ্ছে।

আমাদের নারী-পুরুষ কি তেমন দক্ষতার খ্যাতি অর্জন করতে পারে না? উপযুক্ত প্রশিক্ষণের মাধ্যমে জনশক্তি সমৃদ্ধ করুন। এবং তারপর তাদের বিদেশে পাঠান। আমাদের নারীদের ধর্ষণের মূল্যে প্রাপ্ত বৈদেশিক মুদ্রায় বাংলাদেশের কোনো প্রয়োজন নেই।

লেখাটি ৪,০২৭ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

RFL
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.