মা, আমায় ক্ষমা করো!

0

শাকিল মাহমুদ:

বাবার হাতে মা নির্যাতিত হচ্ছে। প্রতিদিন, প্রতি রাতে। কোন না কোন কারণে বাবা সন্তানের চোখের সামনে মা’কে মারছে। সন্তানের বয়স তখন কত? ৮/১০ বছর বয়স। এই কচি বয়সে একটা ভয়ার্ত রূপ, বাবাকে সে দেখছে ভয়ে চুপসে যাওয়া তার মা’কে। প্রতিদিন, প্রতি রাতে তার মা ভয়ে চুপসে যায়। অথচ তার বাবা! ভয়ংকর সব অপরাধ করেও দানবের মত হুংকার ছেড়ে পেটাচ্ছে, থাপড়াচ্ছে, কখনও বা চুল ধরে ধাক্কা কিংবা লাথি দিয়ে মাটিতে ফেলে দিচ্ছে।

সন্তানটি দেখে যাচ্ছে। চোখ বন্ধ করে রাখছে, যাতে দেখতে না হয় পিতার ভয়ংকর রূপ, না দেখতে হয় মাতার ভয়ে চুপসে যাওয়া মুখ। সন্তানটা অসহায়, বাবা মা’কে মারছে। অথচ কিছুই করতে পারছে না সন্তান। বাবা যখন মা’কে মারতে মারতে ক্লান্ত, আর মা কাঁদো স্বরে বলছো – আর থাকবো না। তখন বাবা বলছে, তোর সন্তানদেরও নিয়ে যাবি সাথে।

তোর সন্তান! এই একটা কথা আমার কানে খুব করে লাগতো। নারীর একার সন্তান। সমস্ত পাপের ফল নারীর এই সন্তান। মায়ের বাবা তার মেয়েকে একটা লোকের সাথে বিয়ে দিয়েছে। বছর খানেক পর সন্তান জন্ম হয়েছে। কেবল নারীর একার ইচ্ছায়? ওই পুরুষের কোনো ইচ্ছে ছিলো না! তবে কেন একটুতেই তোর সন্তান বলে দায়-দায়িত্ব এড়িয়ে যায় পুরুষ?

আমার মা ভাল নেই। প্রতি রাতে বাবা নামক নরপশুর ভয়াল আক্রমণে আজ আমার মা অসুস্থ, মৃত্যু পথযাত্রী। আমার মাকে ওই নরপশুটা প্রতি রাতে মারতো। কেন মারতো! তা তখন বুঝতাম না। একজন পুরুষ একজন নারীর সাথে ঘুরতেই পারে। তা নিয়ে মারামারি? কিন্তু এখন উপলব্ধি করি।

আমরা তিনটা ভাই। আমরা ঢাকায় থাকতাম। তিনি চাকরি করতেন, কিন্তু ঠিকমতো টাকা দিতেন না। এই মাসে দিলে পরের মাসে দিতেন না। তিনটা সন্তানকে বিপাকেই পড়তে হতো মাকে। তাই কখনও কখনও মা প্রশ্ন করতো। আর সে প্রশ্নই হতো মারের কারণ। ভীষণ মারতো। মারতো আর গালি দিতো। আমি বড় সন্তান, কিছুটা বুঝতাম আবার কিছুটা বুঝতাম না। কিন্তু ওই নরপশুটা যখন মাকে মারতো মায়ের সাথে আমিও ভয়ে চুপসে যেতাম।

মা মার খেতো, আর ওই নরপশুটার কাছেই থেকে যেতো। কারণ আমার মায়ের মা নেই, বাবা থেকেও নেই। আর ভাইয়েরা! তাদের কথা বলাই বৃথা। সুতরাং সব সয়ে থেকে যেতো নরপশুটার কাছে। কেন থেকে যেতো? আমাদের তিন ভাইয়ের কথা ভেবে।

মা যদি চলে যায় তবে লোকজনে খারাপ কথা বলবে, ওই নরপশুটা আবার বিয়ে করে বউ আনবে। সে বউ আমাদের তিন ভাইকে মারবে। হয়তো এক সময় তাড়িয়ে দেবে। এই কথা ভেবে মার খেয়ে মা থেকে যান নরপশুটার কাছে। আমাদের সমাজের বেশির ভাগ নারীই আত্ম-সম্মানের কারণে স্বামী নামক নরপশুর নির্যাতন ভোগ করে থেকে যান।

মা-বাবার মান সম্মান নষ্ট হবে, সন্তান নষ্ট হয়ে যাবে, একটা গোছানো সংসার এলোমেলো হয়ে যাবে। তাই শত নির্যাতন মুখ বুজে সহ্য করে থেকে যায় সংসারে। আমার মাও থেকে গিয়েছে।

কিন্তু আজ! মা আজ খুব অসুস্থ। আগেও অসুস্থ থাকতেন। বাবা নামক ওই মানুষটা (?) মাকে কখনও চিকিৎসার জন্য হাসপাতাল নিতেন না। একবার মায়ের খুব জ্বর। বিছানা থেকে উঠতে পারছেন না। বাবাকে ফোন করে আমার ছোট ভাই বললো, – মায়ের খুব জ্বর। হাসপাতাল নিতে হবে। এর উত্তরে সে বললো, – নিতে হবে না। একটা নাপা এনে খাওয়া। ঠিক হয়ে যাবে।

আজ মা ভীষণ অসুস্থ। আমি তখনও মায়ের কষ্টে এগিয়ে আসতে পারিনি, আজও পারছি না।

আমি আমার মায়ের সে কু-সন্তান, যে সন্তানের জন্য সব নির্যাতন সহ্য করে গিয়েছে সারাটা জীবন, সে আমার মা। সে আজ মৃত্যু শয্যায়, আমি কু-সন্তান মায়ের পাশে নেই আজও। মা, আমায় ক্ষমা করো!

লেখাটি ১,৮১৪ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

RFL
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.