সিন্ড্রেলার আরেক পাটি জুতো

0

প্রমা ইসরাত:

বৃষ্টি বাদলার দিন এলেই মনটা কেমন উদাস হয়ে যায়। ছোটবেলায় চলে যাই। ড্রেনেজ সিস্টেম ভালো না থাকায় বাসার সামনে প্রায়ই পানি জমতো। সেটা জমতে জমতে বারান্দা পর্যন্ত চলে আসতো। কাগজের নৌকা বানিয়ে সেই পানিতে ছেড়ে কী আনন্দ যে পেতাম।

দাদা-দাদীর কাছে গল্প শুনতাম। ডালিম কুমার, কাজল রেখা, শুয়ো রানী, দুয়ো রানী, আরো কত গল্প। সব গল্পেই রানী অত্যন্ত রূপসী, কুৎসিত ডাইনীর হাতে বন্দী হয়, সুপুরুষ রাজকুমার বা রাজা এসে তাকে উদ্ধার করে।

বাসায় যখন ডিশের ক্যাবল এলো, বিদেশী চ্যানেলে ডিজনির কার্টুনের ভক্ত হয়ে গেলাম। আমার দাদাও তখন আর জীবিত নেই। আমার দাদী উঠতে বসতে আমাকে শোধরানোর আপ্রাণ চেষ্টায় নিয়োজিত। আমার দাদীর চোখে আমার মতো বেয়ারা, অবাধ্য একটি মেয়ে হয়তো আর কোথাও নেই। আমি সিনড্রেলার কার্টুন দেখতাম। আমার অসম্ভব ভালো লাগতো। আমি মনে মনে সিন্ড্রেলা ভাবতাম নিজেকে। আমার দাদার মুখে দেশী রাজকুমারী আর ডিজনির সিন্ড্রেলার মধ্যে পোশাক আর কালচারের কিছু পার্থক্য ছাড়া আর তেমন একটা পার্থক্য ছিল না। দুই জায়গায়ই রাজকুমারের জন্য অপেক্ষা। কবে রাজকুমার আসবে এবং উদ্ধার করবে রাজকন্যাকে।

আমার মতো সব মেয়েই হয়তো ছোটবেলায় নিজের মনেই নিজেকে সিন্ড্রেলা ভেবে নেয়। সিনড্রেলার মতো রাজকীয় পোশাক, ওর কাঁচের জুতো আর রাজকুমার যার হাতে আছে সিনড্রেলার আরেক পাটি জুতো। ছোট থেকেই একটি মেয়ে যেন এই ট্রেনিং পেয়েই বড় হয় যে একসময় তাকে অন্যের বাড়িতে যেতে হবে। তার জীবনে আসবে এমন একজন রাজকুমার যে তাকে নিয়ে সারাজীবন সুখে শান্তিতে কাটাবে।

সেই রাজকুমারের সাথে গাঁটছড়া বাধার আগ পর্যন্ত কিংবা গাঁটছড়া বাধার পর কিছুদিন সবকিছু যেন রুপকথার কথার মতোই মনে হয়, স্বপ্ন মনে হয়। কিন্তু কিছুদিন যেতে না যেতেই রাজকুমারের চেহারা কেন যেন পালটে যেতে থাকে। প্রেমিক ছেলেটি যখন স্বামী রূপ ধারণ করে তখন তার ভেতরে আর প্রেম কাজ করে না, সে হয়ে যায় তার স্ত্রীর মালিক। বিয়ে করেছি না? আর কী লাগে তোমার? তুমি এখন আমার স্ত্রী, তোমাকে স্ত্রীর দায়-দায়িত্ব পালন করতে হবে। সংসারের যাবতীয় কাজ, স্বামী, শ্বশুর-শাশুড়ির সেবা যত্ন করা, এবং নিজের জীবনের প্রতিটি নিঃশ্বাসের কৈফিয়ত দিতে তখন মেয়েটি বাধ্য। কিছু ছেলে রাজকুমারের বেশে এলেও আসলে সে ভিখিরী আর ভিখিরী বলেই যৌতুক কিংবা নানান গিফট (!) এর জন্য তাদের মনের গহীনে তাক ধিনাধিন চলতেই থাকে।

হ্যাঁ, মাঝে মাঝে কিছু প্রগতিশীল(!) পরিবার পাওয়া যায়, তারা যৌতুক নেয় না, এবং তারা যে যৌতুক না নিয়ে মেয়েটির জীবন কতটা ধন্য করে দিয়েছে এবং তাদের ছেলে যে কত হীরার টুকরা এবং মেয়েটি যে এই ছেলেটিকে পেয়ে কত্ত ভাগ্যবতী, তা বার বার মনে করিয়ে দিতে ভুলে যায় না। কিন্তু তারা উপহারে বিশ্বাসী। তারা বিশ্বাস করে যৌতুক দণ্ডনীয় অপরাধ, তাই মেয়েকে সাজিয়ে গুছিয়ে দেয়া প্রতিটি বাবা-মা’র মৌলিক দায়িত্ব। মেয়ের সুখের জন্য নানান জিনিসপত্র বাজার সদাই মেয়ের বাপের বাড়ি থেকে তো দিবেই, এটা কি আবার বলে দিতে হয় নাকি!!

বিয়ে-সংসারের এই রাজনীতিতে একটি মেয়ের মূল্যায়ন কীভাবে হবে তা নির্ধারিত হয় নানান পয়েন্টে। যেমন একটি মেয়েকে যদি সংসারে মূল্যায়ন পেতে হয়, তাহলে তাকে কিছু কিছু ক্যাটাগরিতে পড়তেই হবে। এবং সেই অনুযায়ী কিছু প্যাকেজ সার্ভিস বর্তমান সময়ে চলমান।

১। নন সুন্দরী+স্বল্প শিক্ষিত+ঘরোয়া+ প্রচণ্ড ভারী যৌতুক= ভালো সম্বন্ধ, ঘরের লক্ষ্মী। (*শর্ত প্রযোজ্য)

২। উচ্চ বেতনের চাকরিজীবী+সুন্দরী+বেশি ঘরোয়া না+হালকা যৌতুক= খুব ভালো সম্বন্ধ, আমরা প্রগতিশীল বউকে চাকরি করতে দেই, বউ খুব লক্ষী, ঘরের কাজ কম পারে তো কী হইছে। (*শর্ত প্রযোজ্য)

৩। স্বল্প বেতনের চাকরিজীবী+ সুন্দরী+ ঘরোয়া+ হালকা যৌতুক= সম্বন্ধ খারাপ না, দেখতেও সুন্দর, চাকরিও করে, ঘরের কাজও করে, খুব ভালো, লক্ষ্মী (*শর্ত প্রযোজ্য)

৪। সরকারি চাকরিজীবী+ সুন্দরী+ যৌতুক/উপহার+ রান্নার ব্যাপারে শৌখিন = এতোদিন কোথায় ছিলে?(*শর্ত প্রযোজ্য)

৫। সরকারি চাকরিজীবী+ নন সুন্দরী+ যৌতুক নাই= শুধু চাকরি করলেই হবে না, এই চাকরির দেমাগ দেখাও? আর কী আছে? (*শর্ত প্রযোজ্য)

৬। বেকার+সুন্দরী+ ভারী যৌতুক= খুব ভালো সম্বন্ধ, মেয়ে বাড়িতেই থাকবে ঘরের লক্ষ্মী বলে কথা। (*শর্ত প্রযোজ্য)

৭। বেকার+যৌতুক নাই+কম সুন্দরী= বাড়ির সকল কাজ, স্বামী শ্বশুরবাড়ির ফুট ফরমাইশ এবং নানান টিটকারি। (*শর্ত প্রযোজ্য)

এই সাত রঙের প্যাকেজে সব সময়ই শর্ত প্রযোজ্য থাকবে। মেয়েকে শ্বশুরবাড়ির, কিংবা স্বামীর ইচ্ছা অনুযায়ী চলতে হবে এই হচ্ছে শর্ত। এবং সেই শর্ত গুলো একটার পর একটা লেজের মতো জুড়ে দেয়া হয়। সেই ইচ্ছার ব্যতিক্রম হলেই মেয়েটির উপর নেমে আসবে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন।

মানসিকভাবে মেয়েটিকে যতটা তুচ্ছ করা যায় তাই করা হবে, তখন না তার ডিগ্রীর কোন মূল্যায়ন হবে না, তার বাবার দেয়া যৌতুকের কোন দাম থাকবে। আর সেই প্রতিবাদে মেয়েটি যদি মুখ খুলে জোর গলায় কথা বলেই ফেলে তখন সেই লক্ষ্মী বউ, বেয়াদব অলক্ষ্মী মেয়েতে রূপান্তরিত হয়ে যাবে যার শাস্তি হবে শারীরিক নির্যাতন, বাড়ি থেকে বের করে দেয়া, বা দেয়ার কথা বলা, হুমকি দেয়া, তালাক দেয়ার কথা বলা ইত্যাদি।  

অনেক ছেলে এবং অনেক পরিবার একটি বিয়ের আগে নানান কথা বলে মেয়েটিকে বিয়ে করে এবং বিয়ের পর দেখা যায় যে তারা ৩৬০ ডিগ্রী এঙ্গেলে ঘুরে গেছে। তাদের মানসিকতাটাই হলো যে আগে বিয়েটা তো হোক। বিয়ের পর মেয়ে মেয়ের পরিবার বাগে চলে আসবে এবং তখন সুড় সুড় করে যা চাই, তাই আদায় করা যাবে।

অনেক ক্ষেত্রে একটি মেয়েও তার নিপীড়ক, বদ মেজাজি, ড্রাগ নেয়া প্রেমিককে বিয়ে করে বিয়ের পর ভালোবাসা দিয়ে বাগে আনবে বলে। বিয়ের পর এই বাগে আনার জন্য বাচ্চা নেয়ার ঘ্যানঘ্যানানি শুরু হয়ে যায় চারপাশ থেকে, এই রকম জটিল এক রাজনীতিতে আরেকটি মানব শিশুকে নিয়ে এসে বিপদে পড়ে মেয়েটি। তখন না সে সেই সংসারে থাকতে পারে, না সে সেই সংসার থেকে বেরিয়ে আসতে পারে।

যে জায়গাটা ভালোবাসাময় হওয়ার কথা ছিল, যেই জায়গায় মনে আনন্দ নিয়ে শান্তিতে বসবাস করার কথা ছিল, সেই জায়গা একজন নারীর জন্য রূপকথার ডাইনীর অন্ধকার গুহায় পরিণত হয়।

বাস্তবতা হচ্ছে, কোন রাজকুমার আমাকে উদ্ধার করতে আসবে না। আমিই একমাত্র ব্যক্তি যে আমাকে উদ্ধার করতে পারে। আমি কোন প্যাকেজ ডিলে পড়ি না যেখানে প্রতি পদে পদে শর্ত প্রযোজ্য থাকে।

আমাদের কল্পনায় রূপকথার সিন্ড্রেলার বসবাস। আমাদের সেই গল্পটা পালটে দিতে হবে। আমাদের মনকে বোঝাতে হবে অন্য কারো হাতেই সিন্ড্রেলার আরেক পাটি জুতো থাকে না। আর হাঁটতে গেলে জুতোর দরকার হয় না।       

লেখাটি ভাল লাগলে শেয়ার করুন:
  •  
  •  
  •  
  • 1
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    1
    Share

লেখাটি ১,৭৮৯ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.