সুখিয়া একজন নারী, সুখিয়া একজন সংখ্যালঘু

0

প্রমা ইসরাত:

সুখিয়া রবিদাস, নিজের প্রাণ বাঁচানোর জন্য ছুটে বের হয়ে গিয়েছিলেন ঘর থেকে। কিন্তু বেশিদূর যেতে পারেননি, হোঁচট খেয়ে পড়ে যান, তারপর তাকে ভারী একটি কাঠ দিয়ে পিটিয়ে মেরে ফেলে শাইলু মিয়া।

?

সুখিয়া রবিদাস, বয়স ৩০, যে হবিগঞ্জের সুতাং বাজারের পাশে আরো কয়েকটি রবিদাস পরিবারের সাথেই ছোট ভাইকে নিয়ে থাকতো। যার স্বামী মণিলাল দাসকেও প্রাণ দিতে হয়েছিল আট বছর আগে। সুখিয়ার চাচা অর্জুন রবিদাসকেও হত্যা করা হয়েছিল ২০১৩ সালে, যে হত্যা মামলার প্রধান আসামী শাইলু মিয়া, আর প্রধান সাক্ষী ছিল সুখিয়া রবিদাস।

একে তো সুখিয়া সংখ্যা লঘু সম্প্রদায়ের, তারপর সুখিয়া দরিদ্র, সুখিয়া স্বামীহারা, সুখিয়া একজন নারী। সুখিয়ার মতো এমন একজন মানুষ এতোদিন বেঁচে ছিলেন!! হয়তো বিচারের আশায় বেঁচে ছিলেন, হয়তো স্বামী আর চাচার হত্যার বিচারের আশায় বেঁচে ছিলেন। হয়তো তিনি বাঁচতে চেয়েছিলেন, তাই বেঁচে ছিলেন। ধর্ষণের শিকার হবার পর তিনি ছুটে বের হয়েছিলেন প্রাণে বাঁচতে। কিন্তু যে অপরাধী, তার যেহেতু শাস্তি হয়নি, যেহেতু তার ঘাড়ে অনেকগুলো মাথা, সেহেতু সে ভেবেছে সুখিয়াকে প্রকাশ্যে পিটিয়ে হত্যা করতেই পারে, তাই সে প্রকাশ্যে বাজারের মধ্যে সুখিয়াকে পিটিয়ে মেরে ফেলে। হ্যাঁ অনেক মানুষ ছিল, কিন্তু কেউ বাঁচাতে আসেনি। কেউ প্রতিবাদ করতে আসেনি।

কারো কি কোন দায় আছে,যে বাঁচাতে আসবে? সুখিয়া কি তাদের কেউ হয়?

সুখিয়া একজন অসহায় মানুষ, সংখ্যালঘু, দরিদ্র, বিধবা।   

পত্রিকায় এসেছে শাইলু মিয়াকে আটক করেছে পুলিশ, মামলার প্রস্তুতি চলছে। শাইলু মিয়ার বিচার হোক। কিন্তু শাইলু মিয়ার বিরুদ্ধে সাক্ষী দিবে কি কেউ? শাইলু মিয়ার বিরুদ্ধে সাক্ষী দেয়ার অপরাধেই তো সুখিয়াকে ধর্ষণের শিকার হয়ে প্রকাশ্যে মরতে হলো। আদালত তো ইভিডেন্স দেখে, সাক্ষী চায়, তথ্য প্রমাণ চায়।

আমরা সবাই মরে গেছি। আমরা কেউ আর কোনো ঝামেলায় থাকতে চাই না। আমাদের সবারই জীবনের জন্য টেনশন। আমাদের কোন নিরাপত্তা নেই, সব সময় সব জায়গায় মরে যাওয়ার ভয়, মরে গেলে যে মানুষ গুলো আমার উপর নির্ভরশীল তাদের কে দেখবে? সেই ভয়। প্রিয়জন হারানোর ভয়, এমনকি বেঁচে যে আছি, সেই বেঁচে থাকারও ভয়।

সুখিয়াদের মরতে হলো, কারণ সুখিয়ারা যে জায়গায় থাকে সেই জমির দখল চাইছিল শাইলু মিয়ারা। এই দেশে সংখ্যালঘু হয়ে জন্ম নেয়াটাই পাপ। ঠিক একই কারণে লংগদুতে, খাগড়াছড়িতে জ্বলছে বাড়ি, পুড়ে মরছে মানুষ। ধর্ষণের শিকার হচ্ছে নারীরা। প্রকাশ্যে বুট জুতা আর কালো হাতের থাবার নিচে আটকে পড়ছে মানুষ।

শাইলু মিয়াদের সাথে তাদের পার্থক্য এক জায়গাতেই, শাইলু মিয়া সিস্টেমের বাইরের লোক, আর ওরা সিস্টেমের ভেতরের। মননে মগজে তারা ভাই ভাই।

এই মানুষগুলোর আহাজারি, দুঃখ, তাদের সাথে দিনের পর দিন ঘটে যাওয়া অন্যায় এবং ন্যায় বিচার না পাওয়া একটা নিয়মে এসে দাঁড়িয়ে গেছে। কতদিন, আর কতদিন সুখিয়াদের এইভাবেই মরতে হবে?

রাষ্ট্র আমার জীবনের নিরাপত্তা দেবে। নির্ভয়ে বেঁচে থাকার অধিকার এই দেশের প্রতিটা মানুষের সমান। আর এই অধিকার দিয়েছে আমাদের দেশের সর্বোচ্চ আইন, বাংলাদেশের সংবিধান। সংবিধান বলে, এই দেশের রাষ্ট্রপতির জীবনের মূল্যের চাইতে সুখিয়ার জীবনের মূল্য কোন অংশে কম নয়।

লেখক: প্রমা ইসরাত

আইনজীবী

লেখাটি ভাল লাগলে শেয়ার করুন:
  •  
  •  
  •  
  • 2
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    2
    Shares

লেখাটি ৩,৮০৬ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.