প্রধানমন্ত্রী আশা হারান না, আমরা আশাই করি না

সুপ্রীতি ধর:

সাংবাদিক দম্পতি রুনি-সাগরের ছেলে মেঘকে জিজ্ঞ্যেস করবো, মেঘ বাবা, তুমি কি আশা হারিয়েছো বাবা-মা হত্যার বিচারের ব্যাপারে?
আমি ত্বকীর বাবা রাফিউর রাব্বী ভাইকে জিজ্ঞাসা করবো, ভাই, আপনি কি আপনার ওই সুন্দর কিশোর ছেলেকে হত্যার বিচারের ব্যাপারে আশা হারিয়ে ফেলেছেন?
আমি জানতে চাইবো পাহাড়ের সেই ছেলেটির কাছে, যে তার অসুস্থ মাকে হাসপাতালে নেয়ার পথে এরেস্ট হয়, চিকিৎসা না পেয়েই মা’টি মারা যায় তার। সে কি তার আশা হারিয়েছে কোনরকম টিকে থাকার ব্যাপারে?
আমি জানতে চাইবো পাহাড়ি ছোট ছোট কন্যাসম মেয়েগুলোর কাছে, যারা ধর্ষণের শিকার হয়ে মারা গেছে বা যাবে, বা যাচ্ছে, ওরা কি আশা হারিয়েছে বিচার পাওয়ার?
আমি তনুর মাকে বলবো, মা, তুমি কি এখনও আশা করো যে, তোমার একমাত্র মেয়ে হত্যার বিচার তুমি পাবে?
আমি ছোট্ট পূজাকে আদর করে কোলে নিয়ে বলবো, মারে, তুই কি আশা করিস, বল তো! সংখ্যালঘু পরিবারে জন্মের পরপরই যে কষ্ট তুই পেয়েছিস, তোকে কি ওরা আর ছিঁড়ে খাবে না, তুই নিশ্চিত?
আফসানা, রিশার মা-বাবাদের কাছেও যাবো আমি একই প্রশ্ন নিয়ে।
আমি যাবো গাইবান্ধার গোবিন্দগঞ্জের ওই সাঁওতাল পল্লীতে। ভূমিপুত্রদের গিয়ে জিজ্ঞাসা করবো, বাবা, তোমরা কি এখনও আশা করো যে, তোমাদের সুযোগ্য পুনর্বাসন হবে অন্যের ভূমিতে? তোমাদের নিজেদের ভূমি আজ কোথায়? কার দখলে?
প্রশ্ন করবো নাসিরনগরের সংখ্যালঘু বাসিন্দাদের কাছে। যাদের ঘরবাড়ি পুড়িয়ে দেয়া হয়েছিল, ভেঙে ফেলা হয়েছিল। যাদের চোখ-মুখ ছিল ভয়ার্ত-বেদনার্ত। তারা কোন আশা নিয়ে আছে এই দেশে? সেই আশাকে কি তারা হারিয়ে ফেলেছে কোথাও? যদি না হারায়, তবে কোথায় সেই আশা? তারা কি দেখেনি কক্সবাজারের রামুকে?
আমি যাবো রামুতে। সেই বিধ্বস্ত জনপদের বাসিন্দাদের কাছে গিয়ে জিজ্ঞাসা করবো। তার চেয়ে বরং স্বয়ং গৌতম মুনিকেই জিজ্ঞাসা করি, এতো অহিংস বাণী প্রচার করে কোন আশার বীজ বপন করেছো ভিক্ষুদের মনে? সেই আশা কি এখনও আছে? সেই যে ছেলেটি, কী যেন নাম, উত্তম বড়ুয়া। সে কোথায় আজ? তার বাড়িতে গিয়ে জানতে চাইবো, তারা কি আশা করছে এখন? ছেলে ফেরত আসবে স্বাধীন ভূমিতে? এই সাম্প্রদায়িক দেশে কোন সাহস নিয়ে তারাই বা টিকে আছে এখানে? কোন আশায়?
আর সেই যে রসরাজ! মনে আছে আপনাদের? যে মানুষটার বরাত দিয়ে একটা কুৎসিত ফটোশপ করে খোদ কিছু মুসলমান নাম্নী মানুষই সেই রাতে হামলা চালিয়েছিল নিরীহ মানুষগুলোর ওপর! উত্তম বড়ুয়া পালিয়ে বেঁচেছে। বাঁচতে পারেনি রসরাজ। তাকে অনেকদিন জেলের ভাত খেতে হলো। এখন যেমন খাচ্ছে সিলেটের রাকেশ রায়। শুনেছি সে আওয়ামী লীগের নেতা বা কর্মী। কিন্তু তার এই রাজনৈতিক পরিচয়ও বাঁচাতে পারেনি তার ধর্মীয় পরিচয়কে। পরিণামে গায়ের কাপড় খুলে তাকে বেদম পেটাচ্ছে পুলিশ, আবার তারাই তা গর্বের সাথে জনসম্মুখে তুলে ধরছে। রাকেশ এখন কোন আশার স্বপ্ন দেখে, এটা আমাকে জানতেই হবে যে!
তালিকাটা দীর্ঘ। যদি যেতে হয়, তবে হাজার বছর ধরে আমাকে চলতে হবে পথ আশার বাড়ির খোঁজে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, আশা হারিও না। উনি নাকি কখনও আশা হারান না। উনি তারাবির নামাজ পড়ে ক্রিকেটারদের জন্য দোয়া করেন। উনি কি রাকেশকে চেনেন? উনি কি লংগদুর ওই ঊন মানুষগুলোকে চেনেন? তাদের জন্য কোনো রাকাত কি নির্ধারিত ছিল কখনও? 
উনি নিজেই বলেছেন সাংবাদিকদের যে, খেলা শেষে উনি ফোন করেছেন সাকিবকে, মাহমুদুল্লাহকে। এটা উনি করেই থাকেন সবসময়। তাঁর ক্রিকেটপ্রেম নিয়ে আমার কোনো দ্বিমত নেই। এখানেই উনার উচ্ছাস আর আমাদের আমজনতার উচ্ছাস এক হয়ে যায়। কিন্তু ব্যবধানটা অনুভব হয় অন্য ইস্যুগুলোতে। উনি যদি একইভাবে দেশের অন্য ক্ষতিগ্রস্ত মানুষগুলোরও খোঁজখবর নিতেন, তবেই উনাকে আমি সেরা উপাধিটা দিতে পারতাম। 
তো, আমরা যারা ক্ষমতার কাছেপিঠেও নেই কোথাও, যারা সংখ্যালঘু শুধুমাত্র সংখ্যায় কম বলে নয়, মতান্তরের কারণে, আদর্শের কারণে, তারা আজ কোন আশায় বুক বাঁধি! আদৌ কোনো আশা আর আছে কোথাও!
প্রধানমন্ত্রী আশা করতেই পারেন। উনার ক্ষমতা। উনার ইচ্ছা। কর্তার ইচ্ছায় কর্ম। উনি তাঁর পিতা-মাতা হত্যার বিচার করেছেন। আমি/আমরা ক্ষুদ্র মানুষ, ঊন মানুষ, আমাদের পিতা হত্যা, সন্তান হত্যা, স্বজন হত্যার বিচারের আশা আমরা তো আর করতে পারছি না মাননীয়া!
আমাদের পিতা-স্বজনদের রক্তে স্নাত এই ভূমিতে আজ শকুনের পদচারণা, ধর্ষকদের আস্ফালন, ক্ষমতার দাপট। কোথাও কোন বিচার নেই। আমরা কোণঠাসা। মানব ধর্মচ্যুত হয়ে বিশেষ ধর্মীয় লেবাসে মোড়া সাম্প্রদায়িক, উগ্র এই দেশে আমাদের যে কোনো আশাই আর নেই। 
শেয়ার করুন:
  • 1.1K
  •  
  •  
  •  
  •  
    1.1K
    Shares
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.