রায়ে আনন্দ, রায়ে ক্ষোভ

উইমেন চ্যাপ্টার (১৭ জুলাই): একাত্তরে মানবতাবিরোধী অপরাধের সর্বোচ্চ হোতা গোলাম আযমের বিরুদ্ধে রায় ঘোষণার দুদিনের মাথায় ঘোষিত হলো জামায়াতে ইসলামির সেক্রেটারি জেনারেল আলী আহসান মুজাহিদের বিরুদ্ধে ফাঁসির রায়। গোলাম আযমকে বয়স বিবেচনা করে ফাঁসি দণ্ডাদেশ থেকে অব্যাহতি দিলে দেশজুড়ে ক্ষোভে ফেটে পড়ে মানুষ। ফলে আজকের রায়ে কিছুটা স্বস্তি, কিছুটা ক্ষোভ, সব মিলিয়ে এক মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা যাচ্ছে।
অনেকেই বলছেন, সবই পরিকল্পিত। সব অভিযোগ প্রমাণের পরও শুধুমাত্র বয়স বিবেচনা করে কারও সর্বোচ্চ শাস্তি না হওয়াটা একাত্তরে শহীদদের প্রতিই অবমাননা। এদিকে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার দাবিতে আন্দোলনরত গণজাগরণ মঞ্চ বরাবরের মতোই আজও শাহবাগ চত্বরে জমায়েত হয় সকাল থেকেই। রায় আসার পরপরই সবাই হাততালি আর স্লোগান দিয়ে স্বাগত জানালেও অন্যান্যবারের মতো আনন্দ মিছিল বের করা থেকে বিরত থাকে।
মুজাহিদের বিরুদ্ধে আনা সাতটি অভিযোগের প্রথমটিই ছিল একাত্তরে দৈনিক ইত্তেফাকের বার্তা সম্পাদক সিরাজউদ্দিন হোসেনকে বাড়ি থেকে ডেকে নিয়ে যাওয়া এবং তারপর আর তাঁর খোঁজ মেলেনি। শহীদ সাংবাদিকের ছেলে জাহীদ রেজা নূরকে (তিনিও সাংবাদিক) ফোন করা হলে ধরা গলায় শুধু বললেন, একটা প্রত্যাশা তো থাকেই মানুষের। এরপর আর কিছুই বলতে না পেরে শুধুই সময় চাইলেন।
এদিকে রায় ঘোষণার পরপরই আওয়ামী লীগ সন্তোষ প্রকাশ করেছে। মাহবুবুল আলম হানিফ এক প্রতিক্রিয়ায় বলেন, এই রায়ের মধ্য দিয়ে দেশে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। তবে বিএনপির পক্ষ থেকে দুপুর ২টা পর্যন্ত কোন আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি।
সরকার পক্ষের প্রসিকিউটর তুরিন আফরোজ এক প্রতিক্রিয়ায় বলেন, এই রায়ের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো বুদ্ধিজীবী হত্যার বিচার। মেধাশূন্য করবার যে প্রয়াস চালানো হয়েছিল একাত্তরে, আজ সেই শহীদ পরিবারগুলোর ঋণ কিছুটা হলেও শোধ করার দায় থেকে মুক্তি পেল দেশ। মানবসভ্যতার কলংকমুক্ত করার একটি দিন আজ।
সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যম ফেসবুকেও রায় ঘোষণার সাথে সাথেই নানারকম প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন সবাই।
মিজানুর রহমান লিখেছেন, ‘মুজাহিদের রায় ফাঁসি হইছে খুবই ভালো খবর। তার পরেও রাষ্ট্রপক্ষ দুইটা অভিযোগ প্রমাণ করতে ব্যর্থ হলো কেন? সেটা প্রশ্ন…
কিন্তু আমি গোলাম আযমের রায়ের কথা ভুলিনি। শাক দিয়ে মাছ ঢাকতে চাইবেননা। কামারুজ্জামান, আর মুজাহিদের রায়ের সাথে নিজামীর রায় ফাঁসী হলে গোলাম আযমের রায় অটোমেটিক ফাঁসি হয়েই যায়। সুতরাং নো চুদুরবুদুর… কাদের মোল্লার আপিলের রায় কবে?’
সৈয়দ এএসএম নাজমুল হায়দার নামের একজন লিখেছেন, ‘শহীদ জননী জাহানারা ইমামের পুত্র শহীদ শাফী ইমাম রুমীর হত্যাকারী মুজাহিদের ফাঁসি হয়েছে। আলহামদুলিল্লাহ। জয় বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু। আনহা এফ খান নামের একজন অ্যাক্টিভিস্ট লিখেছেন, ‘পরশু তুমি আমার গরু মারছো সরকার বাহাদুর, তাই আজ তোমার দেয়া জুতাটি নিয়ে উল্লসিত হতে পারছি না, হোক না তা hushpuppies.
“একাত্তরের দালালবাহিনীর প্রধান হোতা গোলাম আজমের ফাঁসি চাই”
যুক্তরাষ্ট্র প্রবাসী লুতফুন নাহার লতা লিখেছেন, ‘ক্ষমা কর কামাল ! তোমার ঐ ১৫ বছর বয়সের শরীর থেকে তোমাকে ঝুলিয়ে দিয়ে চামড়া তুলে নিয়েছিল ওরা গোলাম আযমের নির্দেশে ! ঈদের দিন তোমার মাকে ফিরিয়ে দেবার কথা ছিল তোমাকে কিন্তু ঐ গোলাম আযমের নির্দেশে তোমার বাবার আর তোমার রক্ত মাখা জামাকাপড় ফিরিয়ে দেয়া হয়েছিল ! তার ফাঁসি হল না কামাল ! গোলাম আযমের ফাঁসি দিলাম না আমরা ! বেগম আপা ক্ষমা করে দিয়েন এই জাতীকে আপনি ! ক্ষমা করেন !
যুদ্ধাপরাধীদের বিরুদ্ধে ট্রাইব্যুনালের দেয়া রায় থেকে আওয়ামী লীগ নানাভাবে ভোটের ফায়দা ঘরে তুলতে সব রকম চেষ্টা চালাবে। তা নিকৃষ্টতম কিছু হলেও, এটি জানা কথা। তবে গোলাম আজমের রায়ের ভিত্তিতে এখন থেকেই জামাতে ইসলামকে নিষিদ্ধ করার সুযোগ আছে। সে বিষয়ে আ. লীগ ষ্পষ্ট করে কোন কথা বলছে না। আন্দোলনকারীদের এই বিষয়টিতে দৃষ্টি দেয়ার আহ্বান জানাচ্ছি। সময় বহিয়া যায়…..
আরেক প্রবাসী সাংবাদিক শহীদুল ইসলাম লিখেছেন, ‘ঘাতক মুজাহিদের রায়ে আমি খুশী। কিন্তু আনন্দে উদ্বেলিত নয়। কারণ একাত্তরের ঘাতকদের প্রধান সেনাপতি গোলাম আজমকেই একপ্রকার অনুকম্পা দেখানো হয়েছে। মৃত্যুদণ্ডের অপরাধ করেও বয়সের কারণে তাকে ৯০ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। সবচেয়ে বড় কথা, যুদ্ধাপরাধের বিচার নিয়ে আমার আগ্রহ দিন দিন কমে যাচ্ছে। কারণ বর্তমান সরকারের মেয়াদ আর মাত্র চার মাস। এই স্বল্প সময়ের মধ্যে কারো মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হবে বলে আমার মনে হয় না’।
ব্লগার সুব্রত শুভ লিখেছেন, ‘রায় শুনে হাফ খুশি। ফুল খুশি হমু ঝুলানোর পরে। ঝুলবে তো?’
সাংবাদিক রাকিবুল ইসলাম মুকুল লিখেছেন, মুজাহিদের রায় নিয়ে বলার কিছু নাই..কারন এটি তার প্রাপ্য ছিল এবং এক্ষেত্রে ব্যালান্স হোক আর যাই হোক সঠিক রায় টা এসেছে.. এখন প্রশ্নটা হলো এই রায় কার্যকর দেখার জন্য যেন তরুন সমাজের সামনে আরেকবার নির্বাচিত হয়ে আসার মুলো দেখানো না হয়.. আর সবচেয়ে বড় কথা হলো গোলাম আযমের রায়ে আদালত স্পষ্ট করে জামাত-শিবির সম্পর্কে মতামত দিয়েছে… রাজনৈতিক দল হিসেবে জামাতের নিবন্ধন বাতিল এবং নিষিদ্ধ করতে ওই রায় ই যথেষ্ট বলে আমি মনে করি..সেক্ষেত্রে আও্য়ামী লীগ কি জামাতকে নিষিদ্ধ করার কোন উদ্যোগ নেবে.. নাকি ভোট আর ক্ষমতার নোংরা খেলা চলতেই থাকবে আর এজন্য জামাতকে বেছে নেবে টোপ আর ইস্যু হিসেবে ?
শাহবাগ আন্দোলনের সময় গড়ে উঠা সংগঠন শাহবাগ সাইবার যুদ্ধ লিখেছে, ৭ টির মধ্যে ৫ অভিযোগ সন্দেহাতীত ভাবে প্রমানিত হওয়ায় আল মুজাহীদ কে মহামান্য আদালত সর্বচ্চো শাস্তি মৃত্যুদণ্ড দিয়েছে, আমরা এই রায়কে স্বাগত জানাই এবং অবিলম্বে এই রায় কার্যকর করার দাবী জানাই।

শেয়ার করুন:
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.