১৬ জুন রাঙামাটির পাহাড়ি মানুষগুলোর পাশে দাঁড়ান

0

মুক্তাশ্রী চাকমা সাথী:

ভেবেছিলাম এই সংক্রান্ত কোন পোস্ট দেবো না , কাজ করতে করতেই শিখতে হয়েছে, বুঝতে হয়েছে কখনো কখনো চুপচাপ কাজ করে যেতে হয়, কোনো কথা না বলে…… কখনো কখনো সামাজিক, আর্থিক, শিক্ষাগত ও অন্যান্য যে কোন দিকে হাজার গুন বেশী সুবিধাজনক অবস্থানে থাকার পরও যেহেতু আমি পাহাড়ি, যেহেতু আমার/ আমাদের সাথে যারা আছেন তাঁদের নাক চ্যাপ্টা আমাদের থাকতে হবে অনেক বেশী অসুবিধাজনক, রিস্কি অবস্থানে।

যেকোনো মুহূর্তে গুম হয়ে যেতে হবে, গ্রেফতার হতে হবে, পুরুষ পুলিশ/বিজিবি আপনি নারী হলেও শুধুমাত্র আদিবাসী হওয়ার কারণে মারতে পারবে বড়ো বড়ো কাঠের লাঠি দিয়ে, বুকে হাত দিতে পারবে “শান্তি – শৃঙ্খলা” রক্ষার নামে – গুটিকয়েক হাতে গোনা মানুষ (আদিবাসী বাঙ্গালী) ছাড়া কেউ এই ব্যাপারে কোন কথা বলবে না। আমাদের আর্মি জওয়ান, বিজিবি জওয়ান, পুলিশ কনস্টেবলের গালি শুনেও থাকতে হবে চুপচাপ, কোন কথা বলা যাবেনা। কারণ কাজ যেন সুসম্পন্ন হয়, কাজের লক্ষ্য যেটি তা যেন পূরণ করতে পারি, বাংলাদেশের নাম কোথাও গেলে যেন বুক ফুলিয়ে বলতে পারি, মাথা নিচু করে নয়। চুপ করে থাকা, অপমানজনক গালি শুনেও “ধুর করবো না” না বলে মাথা উঁচু, সিনা টান করে কাজ করে যাওয়া পার্বত্য চট্টগ্রামে নিয়ে, বাংলাদেশ নিয়ে, মানুষকে নিয়ে শিখতেই হবে আপনাকে এখানে… আর কোন উপায় নাই।

চাকমা সার্কেলের রানী এবং উপদেষ্টা য়েন য়েন লংগদুতে ঘটে যাওয়া ঘটনার প্রতিবাদ জানাতে এক কর্মসূচির ডাক দিয়েছেন। ১৬ জুন, সকাল ৮।৩০ টায় । কোথায় হবে? রাঙ্গামাটির রাজবাড়ি রোড-এর সামনের মার্কেটের ডানে বাঁয়ে সবখানে।

কী হবে এইখানে ?
যানবাহন চলাচলে যেন বিশেষ ব্যাঘাত সৃষ্টি না হয়, তার খেয়াল রাখা হবে
লম্বা কাপড়ে/ প্ল্যাকার্ডে যা বলতে চাই আমরা তা লিখে আনা হবে
প্রতিরোধের, প্রতিবাদের, চেতনার আওয়াজ তোলা হবে।
দ্রোহের , চেতনার গান গাওয়া হবে।

কী হবে না এইখানে ?
কোন মঞ্চ থাকবে না যেখানে বিশিষ্ট ব্যক্তিরা বসবেন/ দাঁড়াবেন।
কোন উগ্র জাতীয়তাবাদী শ্লোগান ও সহিংসতার আহ্বান চলবে না ( অর্থাৎ “ফাঁসি চাই, বাঙ্গালী নিপাত যাক/ জবাই কর , মারি ফেলো” এইসব সাম্প্রদায়িক, সহিংসতার কথাবার্তা বলা চলবে না )

এম্নি সাদা চোখে, একজন মানুষ হিসেবে যদি এই কর্মসূচি দেখেন, এই ডাকে কারোর ভড়কে যাওয়ার মতো কিছু নেই। একজনকে (নয়ন) খুন করা হয়েছে। কে করেছে তা আমরা সাধারণ মানুষ জানি না। প্রশাসন কোন তদন্ত করা ছাড়াই বলছেন তাঁরা জানেন, কিন্তু কাউকে গ্রেফতার করছেন না এই খুনের দায়ে। এই খুনের রেশ ধরে একটা ঘটনা ঘটেছে বা ঘটানো হয়েছে। প্রায় ৩০০ মানুষের ঘর বাড়ি পুড়ে গেছে, প্রায় ১০০০- ১২০০ মানুষ জঙ্গলে থাকছে, স্কুলে থাকছে । শিক্ষার্থীদের বই- খাতা সার্টিফিকেট, ছোট ছোট বাচ্চাদের খেলনা, তিল তিল করে গড়ে তোলা সংসারের জিনিষ, কারো মা, নানী পুড়ে গেছেন, মরে গেছেন – এই রাঙ্গামাটি জেলারই লংগদু এলাকায়।

বাংলাদেশে কতো কতো ঘটনা ঘটে, কতো কতো খুন হয়, আর কোথাও এমন সাম্প্রদায়িক রূপ দেখেন খুনের বদলা নিতে আপনারা? বাংলাদেশ আর কোথাও দেখেন যেখানে আওয়ামী লীগ, বিএনপি, জামাত , জাতীয় পার্টি সব দলের মানুষ এক লাইনে এসে বলে – “আওয়ামী লীগ, বিএনপি, জামাত , জাতীয় পার্টি বুঝিনা , মারা গেছে বাঙ্গালী ভাই। একটা একটা চাকমা ধর , ধইরা ধইরা জবাই কর”?

এই স্লোগান দেয় আর কোথাও? আমাকে প্লিজ আপনি বলেন। আমি পাহাড়ের চিপায় থাকি, আমি হয়তো জানি না, আপনি হয়তো জানেন- বলে এমন স্লোগান? আওয়ামী লীগ, বিএনপি, জামাত, জাতীয় পার্টি একসাথে? বলে? এই সময় আওয়ামী লীগের “মুক্তিযুদ্ধের চেতনা” কোথায় যায়? কেন যায়?

আপনি বলেন আমাকে, আমি নিচু জাতের জংলী মানুষ, সাপ – ব্যাঙ খাই, আমি জানি না। আপনি আমাকে জানান, এই সময় কেন “মুক্তিযুদ্ধের চেতনা” কে পার্বত্য এলাকায় পাওয়া যায় না…?

রাঙ্গামাটির মানুষ হিসেবে, বাংলাদেশের মানুষ হিসেবে আমাদের একদিন এক জায়গায় কিছু সময় দাঁড়িয়ে ক্ষতিগ্রস্তদের প্রতি সমবেদনা জানানোর অধিকার নাই? আপনারা কি চান রাঙ্গামাটির বাঙ্গালী পাহাড়ি মানুষ ঢেঁড়স হয়ে বসে থাকুক? আপনারা কি জানেন কেমন আছে নয়নের পরিবার? কোথায় তাঁরা? তাঁদের উপরও কি আমাদের উপর যেমন বিভিন্ন ভাবে চাপ আসছে , তেমন করেই তাঁদের মুখ বন্ধ করে দেওয়া হচ্ছে? প্রকৃত খুনি কারা তা যেন আমরা জানতে না পারি , সেই উদ্দেশে?

আপনারা কারা যারা ভয় পাচ্ছেন ১৬ তারিখ মানুষের এক হওয়াকে? কেন এই কর্মসূচি ডাকার পর য়েন য়েনের ফেইসবুক একাউন্ট রিপোর্ট করে/ হ্যাক করে বন্ধ করে ফেলার মত হাস্যাস্পদ কাজ আপনারা করছেন? আপনারা ওইদিন মোবাইল নেটওয়ার্ক বন্ধ করে দিবেন পার্বত্য চট্টগ্রামে? ট্যাক্সি, গাড়ি, বাস , লঞ্চ সব চলাচল বন্ধ করে দিবেন ঐ দিন কোন এক ছুতা দেখিয়ে? আপনরা এই সব প্ল্যান কি হিন্দি সিরিয়াল দেখে শেখেন? ঐ দিন আমরা আমদের বন্ধুদের সাথে যোগাযোগ করতে পারবোনা? – তো কি হয়েছে? পার্বত্য চট্টগ্রামে রাস্তা হয়েছে ক’ দিন হল? এর আগে আমরা কাজ করিনি? মোবাইল নেটওয়ার্ক আসছে ক’ দিন হলো? এর আগে ঘটে যাওয়া অবিচারের কথা, গণহত্যার কথা লুকাতে পেরেছেন আপানারা? আমরা তখন বন্ধুর সাথে যোগাযোগ করিনি?

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম শক্তিশালী একটি মাধ্যম যা আমরা এখন ব্যবহার করছি না থাকলে আমরা কাজ করতাম না? এটা বন্ধ করলে আপনারা যা চান তা পাবেন?

আমার একাউন্টেও কাল কেউ ঢুকতে চেষ্টা করেছিল। আমি আমার টেক গিগ বন্ধুদের সাথে সঙ্গে সঙ্গে যোগাযোগ করি, ঐ সময়ই দুজন বন্ধু আমাকে জানান য়েন দির একাউন্ট খুঁজে পাওয়া যাচ্ছেনা।

উনি নাহয় কর্মসূচি ডেকেছেন দেখে আপনাদের গা জ্বলে, মানুষ একত্র হলে আপনাদের স্বার্থে আঘাত লাগে তাই উনার উপর রাগ। আমি কী করেছি! আমি তো শুধু মানুষের কাছ থেকে লংগদুর জন্য ভালবাসা নিচ্ছিলাম!! আপনাদের মনে এতো ঘৃণা? ঘর পুড়িয়ে দিলেন, মানুষ পুড়িয়ে দিলেন, এখন ভালবাসাও পৌঁছাতে দিবেন না? লংগদুর মানুষকে জানতে দিবেন না আপনাদের মত হিংসাত্মক বাঙ্গালী ছাড়াও ভালবাসায় পূর্ণ, শ্রদ্ধা করা যায় এমন বাঙ্গালী আছেন দেশে? কেন? আপনারা এতো ইতর কেন?

কাল রাতে যা হলো , চুপ থাকার এখন সময় নেই আর।

আমি আজ য়েন য়েন দির কর্মসূচিতে পূর্ণ সমর্থন জানাচ্ছি। আমি থাকবো। গাড়ী চলুক আর না চলুক, মোবাইল নেটওয়ার্ক থাকুক আর না থাকুক। আমাকে যদি মেরে ফেলা না হয়, মেরে ফেলার মত ঘটনা সাজানো না হয়, গুম করে ফেলা না হয়, আমি থাকবো। আমি থাকবো। আমি থাকবো। আমি থাকবো।

সংহতি!

লেখাটি ৫,২০০ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

RFL
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.