বড়ই অস্থির ও যাতনাময় এই সময়

0

রুনা নাছরীন:

প্রতিনিয়ত কতো রকমের অস্বাভাবিক ঘটনা যে ঘটছে আমাদের চারিদিকে, তার মাঝেই আমরা স্বাভাবিক জীবন যাপন করার চেষ্টা চালিয়ে যচ্ছি। যেতে হচ্ছে।  দুই একদিন অস্থির অস্থির ভাব, মানসিক যাতনা, জীবনের কিছুটা ছন্দপতন, তারপর যার যার জীবনের তাগিদে জীবনের পথে হেঁটে চলা। আবারও আর এক ভয়ংকর নতুন ঘটনা, আবারও হৈ চৈ, পুরাতন ঘটনাটা চাপা পড়ে যায় নতুন ঘটনায়। অস্থিরতার মাঝেই আমাদের জীবন। পারিবারিক, সামাজিক, রাষ্ট্রীয়-কোনভাবেই আমরা মানসিকভাবে সুস্থ থাকতে পারছি না।

বার বার ভুলতে চেষ্টা করছি রাগী চেহারার জেদী মেয়েটিকেমানতেই পারছি না ব্যাপারটা যে, জেলখানার মধ্যে থাকতে হবে তাকে বাকী জীবনটা এতোই কি সহজ নির্দিষ্ট গণ্ডির ভিতর এই দীর্ঘ সময় কাটিয়ে দেয়া? জেলখানার ভিতরের ভয়ংকর অনিয়মের কাহিনী কে না জানে! ভাবতেই গায়ে কাঁটা দিচ্ছে। এতো পঙ্কিলতার মাঝে কীভাবে যাপন হবে তার জীবন? ভয়ংকর কোনো অপরাধে না  আবার জড়িয়ে পড়ে ইত্যাদি ইত্যাদি এতোটুকু বয়সে কতো রকমের অন্ধকার অভিজ্ঞতার সম্মুখীন হতে হলো তাকে এবং হতে হবে সামনের দিনগুলোতেও ।

হয়তো বর্তমানের কঠিন সময় তাকে মনে করিয়ে দিবে তার আরাম আয়েশে যাপিত জীবনের কথা, তার সব ভুলভ্রান্তির কথা, কিন্তু সে যা হারিয়েছে তা আর কোনদিন কোনকিছুর বিনিময়ে ফিরে পাবে না, পাওয়া সম্ভবও না। হয়তো সংশোধনের প্রক্রিয়া তাকে বর্তমানের সাথে অভ্যস্ত হতে শেখাবে, কিন্তু তার মনে প্রতিনিয়ত যে রক্তক্ষরণ হবে তা কি আমরা উপলব্ধি করতে পারবো? সে কি পারবে স্বাভাবিক হতে? আসলে ঘটনাগুলো যার সাথে ঘটে সেই হাড়ে হাড়ে বুঝে এবং বুঝে সময় কতোটা কঠিন। জীবনের সবচেয়ে বড় শাস্তিটিই তাকে দেয়া হলো। একবার নয়, বার বার ক্ষণে ক্ষণে মৃত্যু, যতোদিন তার আসল মৃত্যু না হয় । তার চেয়ে বোধ হয় ভালো ছিল ফাঁসি 

প্রথম থেকেই একবারের জন্য ঐশীকে আমি দোষী ভাবতে পারিনি বরং কেমন যেন একটা মায়া কাজ করছিল। যে পরিস্থিতিতে, যে বয়সে সে কাজটি করেছে তার দায়ভার তো তার একার না সমাজের কথা বাদ দিলাম, সন্তানের প্রতি পরিবার কতটা উদাসীন হলে এই রকম পরিণতি সম্ভব, তা ভাববার বিষয়। সন্তানের অস্বাভাবিক আচরণ বাবা-মা-ই আগে বুঝতে পারে এবং বিষয়টাকে অবহেলা না করে সমস্যা অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে হয় সময়ের স্রোতে গা ভাসিয়ে ভালো হয়ে যাবে আশায় বসে থাকলে চলবে না। একদিনেই একটা বাচ্চা খুনি রুপে আত্মপ্রকাশ করে না বা বিগড়ে যায় না।

হয়তো মেয়েটি ঘরেই ছিল অবহেলিত, ছিল মানসিকভাবে অসুস্থ এবং ছিল বাবা মার ভালবাসা-আদরযত্ন থেকে বঞ্চিত। হয়তো মেয়ের পর ছেলে হওয়াতে অতি উচ্ছাসে ঠিকভাবে খেয়াল রাখা হয়নি মেয়েটির প্রতি। দ্বিতীয় সন্তান হবার পর প্রথম সন্তানের প্রতি যে আলাদা মনোযোগ দিতে হয় সেটা খুব কম অভিভাবক জানে বা মেনে চলে। সবার অগোচরে নিজের ভিতর ছোটো ছোটো ক্ষোভ জমিয়ে রাখতে রাখতে অভিমানী প্রথম সন্তানটি অবসাদে ডুবে যেতে পারে। চুপচাপ থাকা, কথায় কথায় রেগে যাওয়া, জিনিসপত্র ভেঙ্গে ফেলা, প্রয়োজনের চেয়ে অপ্রয়োজনীয় জিনিস পাবার জন্য জেদ করা, আরও অনেক কিছু যা স্বাভাবিক নয়, যা সে বাবা মার মনোযোগ পাবার জন্যই করে এবং এগুলো যে বিষণ্ণতার লক্ষণ তা আমরা বুঝতে পারি না বা জানি না।  হয়তো ঐশীর বেলায় তাই হয়েছে।

বিজ্ঞানের নব নব আবিষ্কারের এই অতি আধুনিক যুগে ছেলেমেয়েকে সুস্থ স্বাভাবিকভাবে বড় করা চারটি খানি কথা নয়। প্রতি পদে পদে বিপদ। হাজারও রঙ্গিন হাতছানি চারিদিকে। হাতের নাগালেই সবকোমলমতী বাচ্চাদের পক্ষে সবকিছুকে উপেক্ষা করে চলা খুবই কঠিন। এখনকার বাচ্চারা সেই বিশেষ কঠিন সময়টাই বেশি মোকাবেলা করছে। কোনটা ছেড়ে কোনটা নেবে, কতটা নেবে বুঝে উঠতে পারে না। সবকিছুই তারা পেতে চায়, উপভোগ করতে চায়। পাওয়া না পাওয়ার দ্বন্দ্বে মানসিক ভারসাম্য বজায় রাখা তাদের পক্ষে অনেক কঠিন হয়ে পড়ছে। সেজন্য সব ব্যাপারে বাবা-মাকে সন্তানের নিরাপত্তার জন্য অনেক বেশী সতর্ক থাকতে হয় প্রতিটি ব্যাপারেই সাবধানে বন্ধুবেশে খোঁজ খবর রাখতে হয় তাদের

যেকোনো পরিবর্তন হঠাৎ করে হয় না। ঐশীর ভালো মন্দ যা কিছু আচরণ, তাতো একদিনে হয়নি। ঐটুকু মেয়ের পরিবর্তন তাদের চোখে পড়েনি? মানসিকভাবে সুস্থ কোনো সন্তানের পক্ষে নিজের বাবা-মাকে হত্যা করা সম্ভব না। মেয়েটি বিষাদগ্রস্ত ছিল এতে কোন সন্দেহ নেই। মেয়েটির প্রয়োজন ছিল মানসিক চিকিৎসার, ছিল বাবা-মার মনোযোগ ও ভালবাসার। হয়তো তাদের সেই সময় ছিল না, ছিল শুধু বে-হিসাবের টাকা এবং তা দিয়ে মেয়েকে শান্ত রাখার অথবা নিজেদের কৃতকর্মের দুর্বলতা ঢাকার প্রচেষ্টা দুঃখিত এভাবে বলার জন্য। কোন প্রকার খোঁজ খবর না নিয়ে অপ্রাপ্ত বয়স্ক মেয়েকে চাহিবা মাত্র বার বার টাকা দিয়ে দেওয়া অভিভাবকদের কোন গুরুদায়িত্বের মধ্য পড়ে – বুঝতে কষ্ট হয়। পুরো বিষয়টা খুবই দুঃখজনক এবং শিক্ষণীয়ও বটে

সাধারণ দৃষ্টিতে মনে হয়, আমাদের দেশে আইনের প্রয়োগ সবার জন্য সমান না, ভেদাভেদ আছে এবং আইনের জটিলতাও বুঝে উঠতে পারি না। তবে মনে প্রাণে চাই, জেলখানায় নয়, মেয়েটি স্বাভাবিক পরিবেশে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসুক।

 

লেখাটি ভাল লাগলে শেয়ার করুন:
  • 352
  •  
  •  
  • 1
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    353
    Shares

লেখাটি ১,৩৬১ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.