জ্যাবন আমার – নছিমনের জবানবন্দী

0

শশাঙ্ক সাদী:

আমার কাছে আষাঢ়ে গল্পের মতো লাগে যখন তুমি পেট ভরা ভাত আর দালান ঘরে থাকার কথা বলো। আমার মাইয়েটা সারাদিন ভাতের জন্য গুমরে গুমরে কান্দে। রাস্তার আনাচে কানাচে শুধু ভাত খোঁজে। আমি বেবাগী এক কালভ্রষ্টা মাইয়ে মানুষ। যার হাত ধরে বের হয়ে আসলাম সুখের লালসায়, বাপের আদুরে হাত আর মায়ের আঁচল ছিড়ে, সে আমারে কেন ইরাম করলো?

প্রথম ছয়মাস কী ঘোরে যে কাটলো! শরীরের প্রতিটি রোমকূপে তার নিশানা। হায় রে, শরীর যেন তখন বানভাংগা নবগংগা। দালানে থাকি, ফ্যানের তলায় ঘুমাই – আহ কী যে সুখ! নিজেরে মনে হইতো রানী। একদিন আমারে বেড়াতে নিয়া গেল বড় নদীর ধারে। সন্ধ্যার অন্ধকারে আদরে ভরায় দিল সারা শরীর। আমারে কী যেন একটা দিল খাইতে, পানি পানি। আমি তো সুখের নেশায় বেদিশা, খাইলাম এক চুমুকে। একটু পরে কেমন যেন ঘোর নাইমা আসলো চারদিকে। অবশ দেহ, চোখ ভারী। খালি মনে হইলো অনেকগুলা শুয়োর আমারে গুঁতায়, আঁচড়ায়। ঘোর যখন কাটলো তখন দেখলাম পইড়া আছি মাওয়া ঘাটের দক্ষিণে। সারাগায়ে শিয়াল আর হায়েনার কামড়ের যন্ত্রণা, তলপেটের নীচে তাজা রক্তের স্রোত।

আবার পরে জ্ঞান ফিরলো হাসপাতালের বারান্দায়। জানলাম আমার নাগর আমারে বেইচা দিসিলো একপাল ভাদ্রমাসী কুত্তার কাছে। দুই মাস পরে বুঝলাম মাইয়েটা আমার প্যাটে। মাইয়ে হইবো বুঝলাম ক্যামনে জানি না। সবাই জাইনা বলে – ‘ফ্যালায় দাও, তোমার পুরা জীবন পইড়া আছে, নতুন কইরা বাঁচো’।

আমি পারি নাই। আমার মনে হইলো, কী আশ্চর্য! আমার ভিতর বাড়ে আরেক প্রাণ। গাছের ভিতর গাছ কেমন কইরা হয়! আর, জীবন তো আছেই। যা পাইছি তা কম কী! শরীরের সুখ চাইছিলাম, পাইসি অনেক। এখন আর কাউরে বিশ্বাস করি না। এইটা-ওইটা যা পাই, তাই করি। হোটেলের কাম, বাসার কাম। সব জায়গায় পুরুষ খালি ছোক ছোক করে, কী রাস্তার কামলা, হোটেলের ম্যানেজার বা ভদ্দরলোক।

কামলা বা ম্যানেজার তো তাও সামনাসামনি চায়। ভদ্দরলোকেরা বউ ঘরে না থাকলে তহন ঝাপ্টায় ধরে, শিয়াল যেমন মুরগি ধরে। আর আমার যখন শরীরে বান ডাকে, তখন একজন বা দুইজনরে জায়গা দেই কাছে। যেই বান শুকায়, অমনি লাত্থি দিয়া ভাগাই। সব পুরুষ এখন আমার কাছে ভাদ্রমাসী কুত্তা।

খালি আমার মাইয়েটার জন্যি মায়া লাগে। সারাদিন ভাত দিতে পারি না যে। এবার একটা বিহিত করমু। শরীরে চাকচিক্য এহনো আছে অনেক। শরীরটারে বেচাকেনার রসদ বানামু ঠিক করসি। মেয়েটা আমার পেট ভইরা ভাত খাইবো, স্কুলে যাইবো – আমি যেমন যাইতাম! তুমি আমার এতো কথা শুনলা, কীসের জন্যি! এতো ঘুরঘুর কর ক্যান? এতোবার কাছে আসো ক্যান? ঘরে নিতে চাও?

আমি রাজী। তুমি যদি ঘরে নিতে চাও, নিতে পারো। কাগজপাতি করতে পারো। আমার মাইয়েটার একটা বাপ দরকার। কিন্তু মনে রাইখো – যদি কোনরকম কষ্ট দাও মাইয়েটারে, তাইলে বটির এককোপে নামাবো তোমার মাথাটা। এলাকার মাস্তান সব আমার চিনা। আর দুই-একটারে কোপায়ে হাত ভালোই রপ্ত হইসে, হাত আর এখন কাঁপে না। আমার জীবন তো নাই, আছে এক প্রাণ ভোমরা, আমার মাইয়েটার জীবনে।

লেখাটি ভাল লাগলে শেয়ার করুন:
  • 105
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    105
    Shares

লেখাটি ৫৯১ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.