মা বাজিয়েছিল নি:শব্দ বিপ্লবের তানপুরা!

0

দিমা নেফারতিতি: 

তখন আমি লন্ডনে। ২০১৪ সাল। বঙ্গবন্ধু বইমেলার মঞ্চে দাঁড়িয়ে বক্তৃতায় আমি বলেছিলাম, “প্রত্যেক প্রবাসী বুকে কান্না মেশানো অমলিন অনুভবে মোড়ানো থাকে মায়ের মুখ, আর দেশের মুখ।আজ এই ২০১৭ এসে যখন প্রবাসের আলো বাতাস আমাকে বেঁধে ফেলেছে আষ্টে-পৃষ্ঠে, যখন আমার নামের আগে প্রবাসী বিশেষণটা মোটামুটি বসে গেছে পাকাপোক্তভাবেই, তখন অনুভব করছি, আমারই বক্তৃতার উক্তি আজ অমোঘ সত্য হয়ে আমার ভেতরেই ডানা মেলছে।

এই প্রিয় আমেরিকায় কতো কিছুই তো আছে মন ভালো করে দেবার মতো। ইস্ট রিভারের নীল্ জলের উপর রোদ আল্পনার মাতামাতি দেখে পার করে দেওয়া যায় একটা পুরো সামার। সেন্ট্রাল পার্কের অবারিত সবুজের উপর চেরি কিংবা ম্যাপল লিফের আয়েসী পাপড়ির চাদরে, আধশোয়া হয়ে পাবলো নেরুদা কবিতা পড়তে পড়তে মনে হয়লাইফ ইজ ট্রুলি বিউটিফুল। কিংবা রাতের ঝলমলে আলোয় রূপসী ম্যানহাটানে, সহপাঠি সারাহ সাথে বসে স্টারবাকসের কফিতে চুমুক দিতে দিতে, আর আমাদের দুজনের নির্মিতব্য ডকুমেন্টারি ফিল্মের শট ডিভিশন প্ল্যান করতে করতে, না ছোঁয়া স্বপ্নগুলো ম্যানহ্যাটানের আলোর মতই আরও একবার ঝলমল করতে থাকে আমার চোখের তারায়।

তবু আমি তৃষিত থাকি, কোনকিছুতেই মন ভরে না আজকাল। কারণ আজকাল চাইলেই ইচ্ছেমতো যখনতখন মাকে ছুঁতে পারি না, দুমদাম করে যমুনা ব্রিজ পার হয়ে মায়ের শহর রংপুরে মাএর কাছে যেতে পারি না।
আমার শোবার ঘরের দেওয়ালে সাঁটা মাএর ছবিটা তাই এখন আমার কাছে হয়ে ওঠে তৃষ্ণার অমোঘ জল, আমার চলার পথে বিচ্ছুরিত আলো দেওয়া ধ্রুবতারা, আমার সকল কাজের প্রেরণা এবং শক্তি অপার।

অাববা মারা যাবার পর, গত সাতটা বছর ধরে আলঝেইমারস নামের অসুখটার সাথে যুদ্ধ করে পরাজিত আমার মা। এখন তিনি নির্বাক শুয়ে থাকেন আমাদের রংপুরের বাসার শোবার ঘরের নীল বেডশিট পাতা বিছানায়। ছোট ভাই তান্না কিংবা ওর বউ বিথী যখন ভিডিও কলে মাএর সাথে আমার দেখা করিয়ে দেয়, তখন মা কি তার ভাবলেশহীন চোখে বুঝতে পারে যে তার মেজো মেয়ে তাকে হাজার হাজার মাইল দূর থেকে মা বলে ডাকছে?

মাকে নিয়ে আমার চেতনার গহ্বরে অযুত নিযুত স্মৃতির দেরাজটা যখন খুলে বসি একান্ত নির্জনে, সবচেয়ে প্রথম যে ছবিটা চোখে ভাসে সেটা হলো, মাএর হাত ধরে স্কুলে যাবার স্মৃতি। মাএর পরনে সোনালী জরি পাড় নীল্  শাড়ি আর আমি বুবু (আমার বড় আপা ডা: তানজিলা) সাদা শার্টনেভি ব্লু ফ্রকের স্কুল ড্রেসে।

মা ছিলেন ঢাকা শহরের মধ্যবিত্ত সুশিক্ষিত সংস্কৃতিমনা ঘরের ভীষণ আদুরে বড় কন্যা। কিন্তু অসম্ভব রূপসী ছিলেন বলেই ইডেন কলেজে উচ্চ মাধ্যমিকের ছাত্রী থাকাকালেই আমার মেধাবী প্রকৌশলী বাবার সাথে বিয়ের পিঁড়িতে মাকে বসিয়ে দিলেন আমার নানানানী। সম্ভবত সেসময়কার সমাজ বাস্তবতায় মেয়েকে সুযোগ্য পাত্রের হাতে তুলে দেওয়াটাকেই প্রথম প্রায়োরিটি হিসেবে বেছে নিয়েছিলেন নানানানী। বিয়ের পরপরই স্বামীর সাথে মাকে ঘুরে বেড়াতে হলো দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে, নদী বিশেষজ্ঞ প্রকৌশলী স্বামীর বিভিন্ন কর্মস্থলে। তারপর সংসার, কন্যাপুত্রের জন্ম, তাদের বেড়ে ওঠা, তাদের পড়ালেখা আর সর্বোপরি  মেধাবী এবং ভীষণ কাজপাগল স্বামীর দেখভাল করতে করতেই মায়ে বেলা গড়াতে লাগল। নিজের পড়ালেখাটা চালিয়ে নিয়ে উচ্চতর ডিগ্রী নেওয়ার সুযোগ আর তার হয়ে উঠলো না।

সংসারে আমার মা ছিলেন শিশিরের শব্দের মতন নিশ্চুপ। তুষারশুভ্র হিমালয়ের ঋজুতা আর দৃঢ়তা ছিল তার অবয়বে। সকালের শিউলি ফুলের স্নিগ্ধতা আর সন্ধ্যের কামিনী ফুলের সুবাস ছিল তার ব্যক্তিত্বে। কিন্তু নিজের সত্ত্বাকে বিকশিত করে, নিজের আইডেন্টিটিকে প্রখর করে, নিজের অর্থনৈতিক স্বনির্ভরতা অর্জনের সাহস কিংবা সুযোগ কোনটাই মাএর ছিল না। স্বামীর প্রবল আইডেন্টিটির চাপে, সংসারের নিত্য নৈমিত্তিকতার চাপে এবং সর্বোপরি পুরুষতান্ত্রিক সমাজের কাঁচের দেয়ালের আবরণে আড়াল হয়ে গিয়েছিল আমার মাএর অর্থনৈতিক স্বনির্ভরতা অর্জনের সুপ্ত বাসনা।

আমাদের নানানানী, দাদাদাদী সবাই ধরেই নিয়েছিল, “মুক্তার (মানে আমার মায়ের) চাকরি করবার কোন প্রয়োজন তো নেই। বরং ইঞ্জিনিয়ার স্বামীর বিলাসবহুল সংসারকে সাজিয়ে গুছিয়ে রাখার মতো গুরু দায়িত্ব পালন করাটাই লক্ষী মেয়ের কাজ হওয়া উচিত।” 

মা সেই লক্ষীমেয়ে হয়েই ছিলেন সারাজীবন। রান্নাঘরের চার দেওয়ালের ভেতর চারবেলা চুলোর গনগনে আগুনের উত্তাপে নিভে গিয়েছিল মাএর চাকুরিজীবী, অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী নারী হবার সাধ। আজকাল আমি যখন আমার নিউ ইয়র্কের কিচেনে ফোর বার্নার জ্বালিয়ে, প্রিয় সন্তুরের মিউজিক শুনতে শুনতে, কালো কফিতে চুমুক দিতে দিতে, কিচেনের জানলায় তুষার কুচির অভিবাদন দেখতে দেখতে এক সপ্তাহের রান্না সেরে ফেলি, তখন আমার চোখ দিয়ে জল গড়ায়, চুলোর গনগনে আগুনের দিকে তাকিয়ে মনে মনে প্রশ্ন করি, মাকী করে কাটিয়ে দিলেন হাজার হাজার দিবস রজনী এই চুলোর আগুনের সাথেপোলাওরোস্টপায়েসপুডিং এর সুখদ পুরুষতান্ত্রিক সমীকরণের ধুম্র্জ্বালে?

আমার লক্ষী মা কখনো কোনদিন প্রতিবাদ করেননি, কিংবা অর্গল ভেঙ্গে বেরিয়ে পড়তেও চাননি। বরং তিনি তার ভালবাসার আভিজাত্যে সযত্নে শিল্পিত বুনটে বেঁধেছেন তার সংসারের চৌকাঠ। মা কেবল নেপথ্যের কারিগর হয়ে প্রেরণার প্রদীপ শিখা জ্বালিয়েছেন স্বামীসন্তানদের জন্য। এখনো চোখে ভাসে, সবুজ জীপ গাড়ী চলিয়ে আমাদের সবাইকে নিয়ে আমার ইঞ্জিনিয়ার বাবা যখন ওয়ার্ক সাইট  ভিজিটে যেতেন, লাল মাইসোর সিল্কের শাড়ি পরিহিতা, গলায় হলুদ বিডস এর মালা জড়ানো আমার মায়ের অনিন্দ্য সুন্দর দেহাবয়ব থেকে তখন বিচ্ছুরিত হতো স্বামীসন্তানদের জন্য অপার অনুপ্রেরণার আলো

তবু সব কিছুর আড়ালে মাএর একটা নি:শব্দ দীর্ঘশ্বাস ছিল। নিজের সত্ত্বাকে বিকশিত করতে পারেননি বলেই ভীষণ নি:শব্দে তিনি একটা ভীষণ বিপ্লবের তানপুরা বাজিয়েছিলেন তার মেয়েদের মনের ঘরে। নিজে এতো রান্না করতেন, কিংবা রান্না করতে ভালোবাসতেন, কিন্তু কোনদিন মেয়েদের রান্না শিখতে জোর করেননি। তিনি জানতেন, সমাগত একুশ শতকের প্রাক্কালে তার মেয়েদের রান্না শেখার চেয়েও আরো অনেক জরুরি কিছু শিখবার আছে। তাই তার ধ্যান জ্ঞান ছিলমেয়েদের পড়ালেখা দেখভাল করা, আবৃত্তি শেখানো, ছবি আঁকার খাতারং পেন্সিল কিনে দেওয়া, ক্লাসের পড়ার বাইরেও ধ্রুপদী পড়ালেখার চর্চা যেন বন্ধ না হয় তা দেখা, স্কুলের টিফিনে মেয়েরা কী খাবে তা নিয়ে উদ্বিগ্ন থাকা, রাত জেগে মেয়েদের জন্য মজার মজার টিফিনের নাস্তা বানানো, সন্ধ্যেবেলা টিচারের কাছে পড়তে বসার আগে মেয়েরা দুধ খেলো কিনা তা খেয়াল রাখা, মেজো মেয়ের হাতের লেখাটা খারাপ হয়ে যাচ্ছে, রুটিন করে হাতের লেখা প্রাকটিস করানো, বড় মেয়ে ফাস্ট টার্ম পরীক্ষায় অংকে একটু কম পেল, তাই তাকে বেশি বেশি অংক করানো – এসমস্ত ধ্রপদী ভাবনায় আর উদ্যোগে মাএর বেলা গড়াতে লাগলো। 

আমাদের আব্বা আমাদের মাকে কখনো উচ্চশিক্ষা নিতে অনুপ্রাণিত করেননি সত্যি। কিন্তু নিজের মেয়েদের পড়ালেখা এবং উচ্চশিক্ষার বিষয়ে তার উদ্বেগ, উৎকন্ঠা এবং উদ্যোগ ছিল প্রয়োজনের চেয়েও খানিকটা বেশি। আব্বা ছিলেন ভীষণ এক্সট্রোভার্ট অলরাউন্ডার, মা ছিলেন একেবারেই বিপরীত, প্রচণ্ড ইন্ট্রোভার্ট। অনেক বিষয়েই দুজনের আকাশসম অমিল থাকলেও, মেয়েদের পড়ালেখার বিষয়ে দুজনেই ছিলেন প্রচণ্ড একরোখা। মেয়েদের পড়ালেখার প্রশ্নে মা ছিলেন, বাবার চেয়েও এক কাঠি সরেস গোছের।

উচ্চশিক্ষা নিতে মেয়েদের যখন তার বুক থেকে আলগা করে কলেজবিশ্ববিদ্যালয়ে পাঠানোর সময় এলো, মা নিশ্চয়ই নি:শব্দে চোখের জল ফেলেছিলেন, কিন্তু সেই চোখের জল আড়াল করে মা কেবল তার মেয়েদের অনুপ্রাণিত করেছেন শুধু একটি কথাই বারবার বলে, “তোমরা পড়ালেখা করো, নিজেদের শক্ত মানুষ করে তৈরি করো  মেয়েদের শৈশবকৈশোরযৌবনে এই একটি কথাই তিনি তার মেয়েদের লক্ষ্যকোটি বার বলেছেন কেবল। 

আজ যখন মধ্যপ্রাচ্যে একজন নামী চিকিত্সক হিসেবে আমার বড় আপা অর্জন করছে শত শত মানুষের আস্থা আর ভালবাসা, আর এই আমি আমার কাজকে আরাধ্য দেবতা মেনে, অবিরাম শক্ত পায়ে হাঁটছি পৃথিবীর পথে পথে, দেশে  দেশে, নানা চড়াই উতরাই পেরিয়ে,  অর্জন করছি মানুষের ভালবাসা, সম্মান, প্রশংসা, তখন অনুভব করি এইসব ভালবাসাসম্মানপ্রশংসা আসলে আমার মায়ের প্রাপ্য। কারণ তিনি খুব নি:শব্দে তার স্বপ্নগুলোকে বুনেছেন তার মেয়েদের মধ্যে। নিউ ইয়র্কে আমার বন্ধুরা যখন আমাকে আয়রন লেডি বলে ডাকে, তখন কেবল চোখে ভাসে মায়ের মুখ, আমার মায়ের মুখ

সেটা ছিল আশির দশকের শুরুর দিকের কোন এক শীতের সময়। আব্বার অফিসের পিকনিকে যাচ্ছিলাম আমরা সবাই দলবেঁধে। সাথে ছিল আব্বার অফিসের সহকর্মী, তাদের স্ত্রীরা এবং ছেলেমেয়েরা। সারাক্ষণ পিকনিকের বাসের মধ্যে আমার বয়সী ছেলেমেয়েদের সাথে অনেক গল্প করেছি আসা যাওয়ার দীর্ঘপথে। এলিস ইন ওয়ান্ডারল্যান্ড গল্পের খিচুরী চোরের বিচার, ইনক্রেডিবল হাল্ক ছবি শেষ দৃশ্য, ম্যান ফ্রম আটলান্টিক টিভি সিরিয়ালের কাহিনী, কিংবা বিটিভি ভন্ডুল সিরিয়ালের নানান ম্যাজিক নিয়ে সারাপথ বন্ধুবান্ধবীদের সাথে হৈহুল্লোড় আর গল্প করতে করতে আমার গাল ব্যথা হবার উপক্রম। পরদিন মা বললো, “দিমা বেড়াতে গিয়ে সারাক্ষণই গল্প করার তো দরকার নাই। এরপর থেকে বেড়াতে গেলে, বই নেবে, আমার ভ্যানিটি ব্যাগে তোমার বই রাখবে, বন্ধুদের সাথে খেলাধুলার ফাঁকেও বই পড়া যায় ”  

এই আমার মা……………………….।

মা সারাজীবন শিখিয়েছেন দেশকে ভালবাসতে, মানুষকে ভালবাসতে, বইকে ভালবাসতে। আজ যখন এই দূর পরবাস থেকে দেশের মাটির সুঘ্রাণ নেবার জন্য মন উথাল পাতাল হয়, মা এর আচলের ঘ্রাণ নেবার জন্য চোখে জল গড়ায়তখন মায়ের ছবির দিকে তাকিয়ে বলি, “তোমার শেখানো পথেই আমি হাঁটছি মা। ছোটবেলায় আমাদের ঘুম পাড়ানোর সময় তুমি আওড়াতেআমি নারী, আমি মহিয়সী। আমার সুরে সুর বেঁধেছে জোৎস্নালোকে রুদ্রবীণা শশী আমি না এলে মিথ্যে হতো চন্দ্রতারা ওঠা, মিথ্যে হতো কাননে ফুল ফোঁটা –  এই তুমি আমার মা। তাই তোমার মেয়ে হিসেবেভালো মানুষ হিসেবে, গর্বিত বাঙালী হিসেবে আমার কাজের কক্ষপথে আমি হাঁটবো অবিরাম। আমার যা কিছু সম্মান কিংবা প্রশংসার অর্জন, এসবই তোমার প্রাপ্য, আমি তোমার পায়ে রাখলাম আমার পূজার ফুল। ” 

লেখক: যুক্তরাষ্ট্র প্রবাসী নিউজ প্রেজেন্টার ডকুমেন্টারি ফিল্ম মেকার 

লেখাটি ২,১৪২ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

RFL
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.