আমার লংগুদু পরিস্থিতি: অপরিবর্তিত কিছু বিষয়

0

তন্দ্রা চাকমা:

গত ২ জুন রাঙ্গামাটির লংগুদুতে যা ঘটে গেল, এইটা আর নতুন কী? কোনো একটা অছিলা পেলেই টার্গেট হয় পাহাড়িদের বাড়িগুলো। এ যাবত ধরে ঘটে যাওয়া পার্বত্য চট্টগ্রামের ঘটনাগুলোতে টিনের চালের বাড়ি যেহেতু পুড়িয়ে দেওয়া হয়, তাই দরকার পড়েছে ফায়ারপ্রুফ বাড়ির। কারণ খোদ লংগুদুবাসিরা এই নিয়ে দুবার বাড়িপোড়া খেল।

লংগুদুর সাথে আমার একটা আত্মিক সম্পর্ক আছে। ছোটবেলায় বাবা-মায়ের সাথে বাবার পুলিশের চাকরির সুবাদে আমি ওখানে ছিলাম। কিন্তু আমার সেই স্মৃতি মনে নেই। এর সবকিছু বাবা-মায়ের কাছ থেকে শোনা। তবে আমার একবার যাত্রা বিরতির ও রাত্রি যাপনের সুযোগ হয়েছিল লংগুদুতে। তবে অবশ্যই বিপদে পড়ে। সে কাহিনী এখানে বললে বুঝতে পারবেন কেন লংগুদু পুড়ে।

আমি তখন রাঙ্গামাটিতে বাসা ভাড়া করে থাকি। তখন পার্বত্য চট্টগ্রামে ১৯৯৭ সালের শান্তিচুক্তির পরপরই অনেক এনজিও কাজ করতে শুরু করেছিল, কেয়ার নামের ইন্টারন্যাশনাল এনজিও-ও কাজ শুরু করে। আমি তাদের সাথে যোগ দিয়েছিলাম ২০০০ সালে। সে অবশ্যই আর একটা গল্প, উপরের টাইটেল অপরিবর্তিত বিষয় বলতে এই ভূমিকা টানতে হচ্ছে।

সময়টা ২০০২ হবে। ঢাকা থেকে উচ্চ পর্যায়ের ভিজিটর এসেছেন আমার কর্ম এলাকা বাঘাইছড়ি দেখতে যাবেন। সাথে আমাকেও যেতে হবে। তখন আমার মেয়ে ঢাকা থেকে আমার কাছে থাকতে এসেছে। চাকরির কারণে মেয়ে বাবার সাথে ঢাকায় থাকতো। কিছুদিন হলো সে আমার কাছে এসেছে। আমি পড়েছি মহা ফাপড়ে। মেয়েকে আমার বাসায় আমার এক দূরসম্পর্কীয় ভাতিজীর কাছে রেখে যাবো বলে ঠিক করলাম। রওনা হওয়ার সময় মেয়ের কান্নাকাটি শুরু হলো। কিছুতেই সে আমাকে ছাড়া থাকবে না। সে আমার পা জড়িয়ে কান্নাকাটি শুরু করলো। পরে যখন তাকে কাপড় বদলে দিলাম সে চুপ হলো, হাসতে আরম্ভ করলো।

আমাদের অফিসে রাঙ্গামাটির উপজেলাগুলো ভিজিট করার জন্য দুটো রাবারের স্পিড বোট ছিল। কান্ট্রি ডাইরেক্টরের স্পেশাল পারমিশনে এই বোটগুলো দেওয়া হয়েছিল ফিল্ড ভিজিট করার জন্য। আমরা তখন রাঙ্গামাটির বাঘাইছড়ি ও বিলাইছড়িতে কাজ করতাম। এই দুটো উপজেলা আমি দেখতাম, দুটো লোকাল সংস্থা এই উপজেলার কাজ দেখতো।

সে যাই হোক আমরা এই রকম একটা বোটে রওনা হলাম টিমসহ। কথা ছিল দুই রাত বাঘাইছড়ি থাকা হবে। কিন্তু বাদ সাধলো স্পিড বোটের ইঞ্জিন। লংগুদুর কাছাকাছি আসতেই নষ্ট হয়ে গেল। এদিকে দেরি করে রওনা দেওয়াতে সন্ধ্যা আগত প্রায়। সেখানে আমরা বোট থেকে নেমে একটা লোকালয়ে ঢুকলাম কোন সাহায্য পাওয়া যায় কিনা। সেখানে গিয়ে আমরা দেখলাম এক মহিলা উঠানে মুড়ি ভাজছে, আর এক লোক তার পাশে বসা, সম্ভবত মহিলার স্বামী। ঐ লোকের চেহারা এখনো আমার চোখে ভাসে। ঐ লোকটার একটা চোখ ছিলো না। আশেপাশে তাদের বাচ্চারা খেলা করছিল।

যাক সেকথা। ঐ লোকটা আমাদের দেখে প্রথমে বললো আমাদের সাথে থাকা ঢাকা থেকে আসা মনিকা দিদিকে, ‘আপনি বাঙালি হয়ে কী করে এই খুনে চাকমাদের সাথে ঘুরছেন? জানেন না, উনারা মানুষ খুন করে? জানেন উনারা আপনাকে খুন করতে পারে? এই কথা শুনে আমরা খুব মর্মাহত হলাম। মনিকাদি উত্তরে বলেছিলেন, ‘আপনি এমন করে বলছেন কেন? উনারা আমার সহকর্মি, আমি এখানে অফিসের কাজে প্রায় আসি, এলে উনাদের সাথে থাকি। কই আমার তো এই কথা কখনও মনে হয়নি?’ উনি তারপরও একই কথা বলছিলেন। পরে আমি থাকতে না পেরে বললাম, আমাদের চেহারা কি খুনেদের মতো? আমার কোলে আমার মেয়ে ঐ লোককে দেখে হাসছিল। আমার মেয়ে আসলে খুব সোশ্যাল ছিল ছোটবেলা থেকে। তাই সে হাসছিল।

আমি পরে আমার মেয়েকে দেখিয়ে বললাম, এই বাচ্চাকে দেখে কি খুনি মনে হচ্ছে? তার কাছ থেকে কোন উত্তর পেলাম না। তখন আমরা তাকে বললাম, কী কারণে তার এই ধারণা হলো? তারপর যে উত্তর পাওয়া গেল সেইটা বেশ মজার। তারা এই কথা আর্মিদের কাছ থেকে শুনেছে। আর তাছাড়া তাদের মতো যারা সেটেলার, তাদের কাছ থেকে তারা জেনেছে। এইখানে এতো কাহিনী বলার কারণ হলো, সেই সেটেলারদের ওখানে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল হিংসার বীজ বপন করে। তাহলে ওখানে শান্তি আর সম্প্রীতি স্থাপন তো অসম্ভব, কারণ গোড়াতেই গলদ রয়ে গেছে। তাই একটু বেকিং আর উস্কানি পেলে এরা (সেটেলাররা) যা খুশি তাই করতে সাতপাঁচ ভাবে না। এই এলাকায় শান্তি সত্যি সত্যি আনতে হলে এই হিংসার বীজ সমূলে উৎপাটন করতে হবে।

কাজটা সহজ নয়। কাজটা করতে হবে সব পক্ষকে নিয়ে। করতে পারবে কেবল যারা তাদের (সেটেলারদের) পাহাড়ে জামাই আদরে লালন করছে তারাই। যাক সে কথা, পরে ঐ লোক আমাদের সহযোগিতা করেছিলেন তার নৌকা দিয়ে আমাদের নষ্ট বোট টেনে নিয়ে ও আমাদের লংগুদু পৌঁছে দিয়ে। আমার মেয়েকে উনি আমার আনুমুতি নিয়ে আদরও করেছিলেন।

তবে এটা বুঝেছিলাম আসলে সবাই মানুষ, হিংসার আগুন থাকার কারণে তখন ঐ লোককে মানুষ মনে হচ্ছিলো না, সেও বোধ হয় তাই ভেবেছিল। একটু যুক্তিপূর্ণ কথা বলাতে সে আমাদের ক্ষতি না করে সহযোগিতা করেছিল। তবে তা নির্ভর করে পরিবেশ পরিস্থিতির উপর। যারা লংগুদুতে বাড়ি ঘরে আগুন দিয়েছে, তারা কিন্তু এই মিষ্টি কথায় ভুলতো না। উপকার তো দূরে থাকুক, পারলে ক্ষতি করতো।

(২) লংগুদুর ঘটনার মত আমার একটা অভিজ্ঞতা হয়েছিল ২০০২ সালে। সেইবার দীঘিনালা বাজার পোড়ানো হয়েছিল। আমি সেইবার অফিসের কাজে পার্টনার এনজিও পরিচালকসহ বাসে খাগড়াছড়ি থেকে বাঘাইছড়ি যাচ্ছিলাম। বাস দীঘিনালার কাছাকাছি পৌঁছাতেই দেখলাম দূর থেকে কালো ধোঁয়া দেখা যাচ্ছে। একটা চাঁদের গাড়ি আমাদের বলছিল ওদিকে রাস্তা বন্ধ, সেটেলাররা দীঘিনালা বাজার জ্বালিয়ে দিয়েছে, পরিস্থিতি ঘোলাটে হওয়ার আগে আমাদের খাগড়াছড়ি ফেরত যেতে বললো। আমাদের বাস খাগড়াছড়ি ফিরতি পথ ধরলো।

কিছুদুর আসার পর আমরা দেখলাম অনেক সেটেলার জীপে করে কিরিচ নিয়ে ঐ পথেই যাচ্ছিল। এইসব দেখে আমার ভয়ে গলা শুকিয়ে কাঠ। আমার কেবল মেয়ের মুখটা ভেসে উঠছিল। পরে বাসের ড্রাইভার ও হেল্পারকে বলতেই তারা বললেন চিন্তা না করতে। তারা এই বলেও আশ্বাস দিলেন, কোন আঁচড় লাগবে না এবং নিরাপদে খাগড়াছড়িতে তারা আমাদের পৌঁছে দিবেন।

সেই বিশ্বাস আর ভরসা নিয়ে থাকলাম। আবার কিছুদূর যাওয়ার পর ড্রাইভার বললেন, এই এলাকাটা একটু দেখেশুনে পার হবে। সেখানে আমরা একটা দোকানের কাছে থামলাম। আমাকে বাসের মানুষরা সবাই দোকানের পিছনে চুপ করে বসে থাকতে বললো। প্রায় আধা ঘন্টা পর সবার ডাকাডাকিতে বাসে উঠলাম। সেদিন নিরাপদেই খাগড়াছড়ি এবং পরে রাঙ্গামাটি পৌঁছেছিলাম। এইটা বুঝেছিলাম সবাই খারাপ না, অনেক ভালো মানুষও আছে। উনারা না থাকলে আমার বিপদ হতে পারতো। আসলে এই ধরনের ভাল মানুষদের এখন এক হওয়ার সময় এসেছে। শুরুটা কাউকে না কাউকে করতে হবে, তবেই সবার মঙ্গল।

আমি এই লেখার মাধ্যমে লুংগুদুর ক্ষতিগ্রস্ত মানুষদের সহযোগিতার আহ্বান জানাচ্ছি। তাদের দিকে মানবিক হাত বাড়ান। একটু হলেও ক্ষতের ভেজাভাব কমবে । মানবতা বেঁচে থাক সবার মাঝে।

লেখাটি ভাল লাগলে শেয়ার করুন:
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

লেখাটি ২,০১১ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.