গ্রেফতার চায়না পাটোয়ারি, আক্রান্ত সুলতানা কামাল: ৫৭ ধারায় পিষ্ট মতপ্রকাশের স্বাধীনতা

0

রাহাত মুস্তাফিজ:

ছাত্র ইউনিয়নের নেত্রী চায়না পাটোয়ারী ও শাওন বিশ্বাসের ৩০ মে ২০১৭ তারিখে দেওয়া ফেইসবুক স্টাটাসকে কেন্দ্র করে আবারো অনুভূতি নড়েচড়ে উঠেছে। ওদিকে হেফাজতে ইসলামের ২৪ ঘন্টার আলটিমেটাম শেষ হয়েছে। তবে এখন পর্যন্ত সুলতানা কামালকে গ্রেফতার করেনি সরকার।

সরকারের দয়ার শরীর বটে! আগে এসব টনটনে অনুভূতি টনুভূতি ক্ষতিগ্রস্ত হতো বিশেষত ধর্মান্ধ মৌলবাদীদের। তবে দিন বদলের সরকারের দিন বদলাইছে। লীগ – হেফাজত অথবা তথাকথিত চেতনাবাজী ও ধর্মান্ধতা মিলেমিশে একাকার। এখন সরকারদলীয় পাণ্ডাদের অনুভূতি যখন তখন আহত হচ্ছে। আহত অনুভূতি নিরাময়ের জন্য তাঁদের কাছে দাওয়াই একটাই, তা হল আইসিটি এক্টের কুখ্যাত ৫৭ ধারা।

ওই আইনে দায়ের করা মামলায় ২ জুন শুক্রবার রাতে নিজ বাসা থেকে প্রথমে নিরাপত্তা হেফাজতে পরবর্তীতে জনৈক ছাত্রলীগকর্মী এহসান উদ্দিন ঋতু নামীয় এক যুবকের দায়ের করা তথ্য প্রযুক্তি আইনের মামলায় গ্রেফতার দেখায় কোতয়ালী থানা পুলিশ। দন্ডবিধি ৫৭ এর ২ ধারায় গ্রেফতার দেখিয়ে শনিবার চায়না পাটোয়ারীকে রাঙামাটির আদালতে তোলে পুলিশ। এসময় জুডিসিয়াল ম্যাজিষ্ট্রেট ঝুমু সরকারের আদালত তার জামিন আবেদন না মঞ্জুর করে চায়নাকে জেল হাজতে পাঠানোর আদেশ প্রদান করেন।

গ্রেফতার চায়না পাটোয়ারী চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গীত বিভাগের শিক্ষার্থী ও বিশ্ববিদ্যালয়ের কলা অনুষদ শাখা ছাত্র ইউনিয়নের সাংস্কৃতিক সম্পাদক।

চায়না পাটোয়ারি ছাত্র ইউনিয়নের নেত্রী। সুলতানা কামালও ছাত্র জীবনে ছাত্র ইউনিয়ন করতেন। এঁদের জীবনের এই দারুণ মিলটি ছাড়াও বর্তমান সময়ে তাঁরা দুজনই রাষ্ট্রীয় নিপীড়নের ভীষণ শিকারে পরিণত হয়েছে।

চায়নাকে ইতোমধ্যে ৫৭ ধারায় গ্রেফতার করা হয়েছে। সে আছে জেল-হাজতে। সুলতানা আপাকে গ্রেফতার করার জন্য আলটিমেটাম দিয়েছে হেফাজত। তাঁর বিরুদ্ধেও ৫৭ ধারায় মামলা দায়ের করা হলে, পুলিশ এসে হাতকড়া পরিয়ে এরেস্ট করে নিয়ে গেলে অবাক হবো না।

ভাস্কর্য অপসারণের রাতেই আমার সমস্ত বিস্ময়ের চূড়ান্ত সমাধি রচনা হয়ে গেছে। আমি এখন বিশ্বাস করি এই স্বৈরাচারী ফ্যাসিস্ট সরকারের আমলে সবকিছুই সম্ভব। মুক্তিযোদ্ধা সুলতানা কামালকেও লাল দালানের ভাত খাইয়ে ছাড়তে পারে ওরা।

কারণ তিনি মানুষের মুক্তির কথা বলেন। মানবাধিকারের কথা বলেন। মত প্রকাশের স্বাধীনতার কথা বলেন। তিনি দেশবিরোধী যেকোনো উদ্যোগের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ান বুদ্ধিবৃত্তিক উপায়ে এবং রাজপথের আন্দোলনের মাধ্যমে।

বর্তমান বাংলাদেশ স্বাধীনচেতা, সচেতন, অগ্রসর মানুষদের জন্য বিস্তৃত কারাগার। এখানে শ্রেফ একটু কথা বলার জন্য, একটা দু’লাইনের স্টাটাসের জন্য হামলা-মামলার অসহায় শিকার হতে হয়, জেলে যেতে হয়। ভিন্নমত পোষণের জন্য প্রকাশ্য দিবালোকে জবাই হতে হয়। এ সমাজকে জল্লাদের উল্লাসমঞ্চ কিংবা জেলখানা ছাড়া আর কী বলা যায়!

আমার বোন চায়না এই জীর্ণ সমাজ ভাঙতে চায়। আমার সুলতানা আপা এই বদ্ধ সমাজের সবকটি জানালা খুলে দিতে চায়। কৈশোর ঊত্তীর্ণ ভার্সিটি পড়ুয়া স্বপ্নবাজ তরুণী চায়না এবং জীবন সায়াহ্নে এসেও তারুণ্যের শক্তিতে মহিয়ান সুলতানা কামাল আজ একবিন্দুতে এসে মিলিত হয়েছে। শেকলপরা সময়ের এই কারাগার ভাঙতে হবে। ওঁদেরকে মুক্ত করতে হবে এবং আমাদেরকেও মুক্ত হতে হবে। মুক্তির উপায় আমাদের হাতেই। বিশ্বাস করুন আমাদের হাতেই।

অবিলম্বে চায়না পাটোয়ারীকে মুক্তি দিতে হবে। কুখ্যাত ৫৭ ধারা বাতিল করতে হবে। ফ্যাসিস্ট মৌলবাদী গোষ্ঠী হেফাজতসহ সকল ধর্মান্ধ, উগ্র, প্রতিক্রিয়াশীল শক্তিকে কঠোর হাতে দমন করতে হবে। রাজনীতিতে ধর্মের ব্যবহার নিষিদ্ধ করতে হবে। মুক্তিযুদ্ধের প্রত্যাশা অনুসারে সেক্যুলার রাষ্ট্র নির্মাণ করতে হবে। মত প্রকাশের স্বাধীনতা, চিন্তা ও বিবেকের স্বাধীনতা প্রতিষ্ঠিত করতে হবে।   

লেখাটি ২,৭৫১ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

RFL
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.