মুজাহিদের ফাঁসি

mozahidউইমেন চ্যাপ্টার (১৭ জুলাই): একাত্তরে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় জামায়াত নেতা আলী আহসান মুহাম্মদ মুজাহিদের বিরুদ্ধে ফাঁসির রায় ঘোষণা করেছে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২। তার বিরুদ্ধে বুদ্ধিজীবী হত্যা, গণহত্যা, অগ্নিসংযোগ, লুটপাট, দেশান্তরে বাধ্য করাসহ সাতটি অভিযোগের মধ্যে পাঁচটিই প্রমাণিত হওয়ায় এই রায় দেয়া হয়। যার মধ্যে রয়েছে হত্যা, ধর্ষণ ও লুটপাটের মতোন অপরাধ।
এদিকে বুধবার এই রায় ঘোষণাকে কেন্দ্র করে যে কোনো ধরনের বিশৃঙ্খলা এড়াতে সতর্ক অবস্থান নেয় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা। পুরাতন হাইকোর্ট এলাকায় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল ঘিরে মোতায়েন রয়েছে বিপুল সংখ্যক পুলিশ ও র‌্যাব। সাদা পোশাকে কাজ করছেন বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থার সদস্যরা।
গত ৫ জুন ট্রাইব্যুনাল-২ এ এই মামলার যুক্তিতর্ক উপস্থাপন শেষ হয়। এরপর মামলাটি রায়ের জন্য অপেক্ষমান রাখা হয়।
জামায়াতের বর্তমান সেক্রেটারি জেনারেল মুজাহিদ একাত্তরে পূর্ব পাকিস্তান ইসলামী ছাত্র সংঘের সাধারণ সম্পাদক ছিলেন। তখন আল বদর বাহিনীর শীর্ষ নেতা হিসেবে মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগ এসেছে তার বিরুদ্ধে।
একক ও দলবদ্ধভাবে সরাসরি জড়িত থেকে কিংবা নেতৃত্ব দিয়ে, পাকিস্তানিদের সহযোগিতা ও নির্দেশ দেয়ার মাধ্যমে মানবতাবিরোধী অপরাধ সংঘটন করেছেন বলে মুজাহিদের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগে বলা হয়েছে।
মুজাহিদের বিরুদ্ধে আনীত ৭টি অভিযোগের ৫টিই প্রমাণিত।
প্রথম অভিযোগ (প্রমাণিত): ১৯৭১ সালের ১০ ডিসেম্বর ৫ নম্বর চামেলীবাগের ভাড়া বাসা থেকে ইত্তেফাকের নির্বাহী সম্পাদক সিরাজউদ্দিন হোসেনকে অপহরণ করা হয়। মুজাহিদের পরিচালনাধীন ও নিয়ন্ত্রণাধীন ৭/৮ জন যুবক তাকে ধরে মিনিবাসে তুলে নেয়। আজ পর্যন্ত তার কোনো সন্ধান পাওয়া যায়নি।

দ্বিতীয় অভিযোগ (ঘটনা সত্য, কিন্তু মুজাহিদের নির্দেশনা প্রমাণিত হয়নি): ১৯৭১ সালের মে মাসে একদিন আলী আহসান মুহাম্মদ মুজাহিদের নেতৃত্বে ফরিদপুর জেলার চরভদ্রাসন থানায় বিভিন্ন গ্রামে হিন্দুদের প্রায় তিনশ’ থেকে সাড়ে তিনশ’ বাড়ি পুড়িয়ে দেয় পাকিস্তানি সেনা ও রাজাকাররা। পরে এলোপাতাড়ি গুলি করে ৫০ থেকে ৬০ জন হিন্দু নর-নারীকে হত্যা করা হয়।

তৃতীয় অভিযোগ (প্রমাণিত): ১৯৭১ সালের জুন মাসের প্রথম সপ্তাহের যে কোনো একদিন ফরিদপুর শহরের খাবাসপুর মসজিদের সামনে থেকে রাজাকাররা ফরিদপুর জেলার কোতোয়ালি থানার গোয়ালচামট (রথখোলার) মৃত রমেশ চন্দ্র নাথের ছেলে রণজিৎ নাথ ওরফে বাবু নাথকে আটক করে। বেলা অনুমান ১১টার দিকে ফরিদপুর পুরোনো সার্কিট হাউসে আলী আহসান মুজাহিদের সামনে পাকিস্তানি সেনা অফিসার মেজর আকরাম কোরাইশীর কাছে হাজির করা হয় বাবু নাথকে। তখন মুজাহিদ ওই মেজরের সঙ্গে কথা বলার পর বাবু নাথের ওপর অমানুষিক নির্যাতন চালানো হয়। নির্যাতনের পর মুজাহিদের ইশারায় তাকে হত্যা করার উদ্দেশে বিহারি ক্যাম্পের উত্তর পাশে আব্দুর রশিদের বাড়িতে নিয়ে রাজাকাররা আটকে রাখে। পরে রাতে রণজিৎ নাথ বাবু তার আটক ঘরের জানালার শিক বাঁকা করে ওই ঘর থেকে পালিয়ে জীবন বাঁচান।

চতুর্থ অভিযোগ (প্রমাণিত হয়নি): ১৯৭১ সালের ২৬ জুলাই সকালে ফরিদপুর জেলার আলফাডাঙ্গা থেকে স্থানীয় রাজাকাররা মো. আবু ইউসুফ ওরফে পাখি, পিতা- মৃত মো. জয়নাল আবেদীন, গ্রাম-পূর্ব গোয়ালচামট খোদাবক্সপুর, থানা- কোতোয়ালি, জেলা- ফরিদপুরকে মুক্তিযোদ্ধা সন্দেহে আটক করা হয়। এরপর পাখিকে ফরিদপুর স্টেডিয়ামে আর্মি ক্যাম্পে নিয়ে আটক করা হয়। আটক বন্দিদের মধ্যে আবু ইউসুফ পাখিকে দেখে মুজাহিদ সঙ্গে থাকা পাকিস্তানি মেজরকে কিছু একটা বলার পরই তার ওপর নির্যাতনের মাত্রা বেড়ে যায়। সেখানে এক মাস ৩ দিন আটক রেখে অমানুষিক নির্যাতন চালিয়ে তাকে যশোর ক্যান্টনমেন্টে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। নির্যাতনের ফলে আবু ইউসুফ পাখির বুকের ও পিঠের হাড় ভেঙে যায়।

পঞ্চম অভিযোগ (প্রমাণিত): ১৯৭১ সালের ৩০ আগস্ট রাত ৮টায় পূর্ব পাকিস্তান ইসলামী ছাত্রসংঘের সেক্রেটারি আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদ পাকিস্তান ইসলামী ছাত্রসংঘের সভাপতি মতিউর রহমান নিজামীসহ ঢাকার নাখালপাড়ার পুরনো এমপি হোস্টেলের আর্মি ক্যাম্পে যান। সেখানে তারা আটক সুরকার আলতাফ মাহমুদ, জহির উদ্দিন জালাল, বদি, রুমি, জুয়েল ও আজাদকে দেখে তাদের গালিগালাজ করেন এবং পাকিস্তানি ক্যাপ্টেনকে বলেন, প্রেসিডেন্টের সাধারণ ক্ষমা ঘোষণার আদেশের আগেই তাদের হত্যা করতে হবে। আসামি মুজাহিদ অন্যদের সহায়তায় আটকদের একজনকে ছাড়া অন্যান্য নিরীহ-নিরস্ত্র বন্দিদের অমানুষিক নির্যাতনের পর হত্যা করে লাশ গুম করা হয়।

ষষ্ঠ অভিযোগ (প্রমাণিত): ১৯৭১ সালের ২৭ মার্চের পর ঢাকার মোহাম্মদপুর ফিজিক্যাল ট্রেনিং ইনস্টিটিউটে দখলদার পাকিস্তান সেনাবাহিনী ক্যাম্প তৈরি করে। পরবর্তীতে রাজাকার ও আল বদর বাহিনী প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর তারাও ওই স্থানে ক্যাম্প করে প্রশিক্ষণ গ্রহণসহ অপরাধজনক নানা কর্যক্রম চালায়। আলী আহসান মুহাম্মদ মুজাহিদ ইসলামী ছাত্রসংঘের সেক্রেটারি হবার সুবাদে আর্মি ক্যাম্পে গিয়ে নিয়মিত যাতায়াত করতেন। ছাত্রসংঘের ও আল বদর বাহিনীর সুপিরিয়র নেতা হিসেবে আর্মি ক্যাম্পে উপস্থিত ঊর্ধ্বতন সেনা অফিসারের সঙ্গে স্বাধীনতাবিরোধী নানা অপরাধের পরামর্শ ও ষড়যন্ত্র করতেন মুজাহিদ। এ ধরনের পরামর্শ ও ষড়যন্ত্র মাধ্যমে আলী আহসান মুহাম্মদ মুজাহিদ ১০ ডিসেম্বর থেকে পরিচালিত বুদ্ধিজীবী নিধন অভিযানসহ সারা বাংলাদেশের দখলদার পাকিস্তান সেনা বাহিনীর সহযোগী বাহিনীসহ হত্যা, নির্যাতন, বিতাড়ন ইত্যাদি অপরাধ সংঘটিত করেন।

সপ্তম অভিযোগ (প্রমাণিত): ১৯৭১ সালের ১৩ মে আলী আহসান মুহাম্মদ মুজাহিদের নির্দেশে রাজাকার বাহিনী ফরিদপুরের কোতোয়ালি থানার বকচর গ্রামে হিন্দু সম্প্রদায়ের ওপর আক্রমণ করে। শান্তি কমিটির বৈঠক শেষে এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। বকচর গ্রামের হিন্দু অধ্যুষিত এলাকায় হামালা চালিয়ে বীরেন্দ্র সাহা, উপেন সাহা, জগবন্ধু মিস্ত্রি, সত্য রঞ্জন দাশ, নিরদবন্ধু মিত্র, প্রফুল্ল মিত্র, উপেন সাহাকে আটক করা হয়। উপেন সাহার স্ত্রী রাজাকারদের স্বর্ণ ও টাকা দিয়ে তার স্বামীর মুক্তি চান। রাজাকাররা সুনীল কুমার সাহার কন্যা ঝুমা রানীকে ধর্ষণ করে। পরে আটক হিন্দু নাগরিকদের হত্যা করে। তাদের বাড়িঘরে আগুন ধরিয়ে দেয়। অনিল সাহাকে দেশ ত্যাগে বাধ্য করা হয়।

শেয়ার করুন:
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.