আসুন, সিজোফ্রেনিকদের পাশে দাঁড়াই

0
কাশফী জামান শ্যামা:
কেস স্টাডি #১
যৌবনে ভালবাসার খোঁজে সন্তান, পরিবার ফেলে প্রিয় মানুষ’টির কাছে চলে গিয়েছিলেন হাফেজা বিবি। কাল-পরাক্রমে প্রতারিত,পরিত্যক্ত, রিক্ত হাফেজার আশ্রয় হয় সেইফ-হোম এ। বৃদ্ধাকালে তার অদ্ভুত এক সমস্যা শুরু হয়। তিনি ভাবতে শুরু করেন তার চামড়ার নিচে অসংখ্য পোকা বাসা বেঁধেছে। তারা সেখানে ডিম পাড়ছে, বড় হচ্ছে আর তার শরিরের মাংশ খেয়ে ফেলছে। কৌটা করে জমিয়ে রাখতেন তিনি অদৃশ্য পোকা গুলি সবাইকে দেখাবেন বলে। মাঝে মাঝে রক্তহীম করা কিছু  দুর্ঘটনাও ঘটাতেন তিনি। প্রকৃতস্থ অবস্থায় নিজেকে দায়ী করে বলতেন অনেক কথা, তার ভাবনায় তিনি মহা পাপী,  তাই তার এই শাস্তি!
তার দুই ছেলের সাথে কথা বলেছি, চেয়েছি অন্ততপক্ষে এই দুঃসময়ে অতীত ভুলে অসুস্থ মা’র পাশে তারা এসে দাঁড়াক। আশ্চর্য হয়েছি তাদের ভাবনা জেনে, তারাও নিশ্চিত এটা তাদের মায়ের কর্মফল!
 তবে সত্যিটি হলো, মোরালিটির বাইরে এই রোগ’টি সবারই হতে পারে, কঠিন ধর্মানুশাসন মানা জনেরও! এটি একটি মানসিক ব্যাধি, যাকে একনামে সিজোফ্রেনিয়া  বলে অভিহিত করা যায়।  সিজোফ্রেনিয়ার এই ফর্মকে দুটি নামে মেডিকাল টার্মে ডাকা হয়, একবম সিন্ড্রোম (Ecbom Syndrome)  এবং রেস্টলেস লেগ সিন্ড্রোম (Restless Leg Syndrome)।
পারিপার্শ্বিক অবস্থা এর বিস্তারের একটা ফ্যাক্টর বটে কিন্তু এটি সম্পূর্ন ভাবে মনের একটা রোগ। মেডিক্যালি এর নিরাময় সম্ভব যদি পারিবারিক ভালবাসা আর সহমর্মিতা থাকে। কিন্ত জানার অভাবে ন্যায়-অন্যায়ের চক্রে আমরা আটকা পড়ে যাই। 
 কেস স্টাডি #২
 সদ্য কৈশোরকে বিদায় জানিয়ে যুব জীবনে পা বাড়িয়েছে সদাহাস্যজ্জ্বল ইমন। সিগারেট, পান দুরে থাক, সামান্য চা’তেও তার আসক্তি নেই। একটাই ধ্যান,জ্ঞান,নেশা তা হল বই পড়া। বন্ধুমহলে বইপোকা খ্যাত ইমনের জীবনে সে আচমকাই এলো। আননোন আইডি থেকে প্রথমে বন্ধুত্বের প্রস্তাব, পরে তা শক্তিশালী রিলেশনে পরিণত হয়। শুরুর দিনগুলো আনন্দের পাখায় উড়েই যাচ্ছিলো, ছন্দপতন ঘটে তখনই যখন ইমন বুঝতে পারে পুরো ব্যাপারটাই নিছক মজা, অনিন্দিতা বলে বাস্তবে আসলে কেউ নেই!!
ইমন অনিন্দিতা’কে দেখতে শুরু করে, সে তার অন্য এক জীবনের প্রতিদিনের সাথী হয়ে পড়লো। কেউ “অনিন্দিতা ” নেই এই মর্মে বিরোধিতা করলে বা তাকে বুঝানোর চেষ্টা করা মাত্রই শুরু হয়ে যেত তাণ্ডবলীলা, ভাঙচুর, মারামারি।
যে আছে, যার অস্তিত্ব ইমনের জীবনে বর্তমান, তাকে আমি, তুমি অস্বীকার করলেই হলো!
 ইমনের এই দুই জীবনের পিছনে আছে সিজোফ্রেনিয়া নামক ভয়াবহ মানসিক রোগটি। সাথে ডিসোসিয়েটিভ আইডেন্টিটি ডিসঅর্ডার সিন্ড্রোম তার অবস্থাকে করুণতরো করেছে। পরিবারের বাকি সদস্যরা ঝাড়-ফুঁক, ফকির, ওঝা, তাবিজ, মানত-নিয়ত সব করে ক্লান্ত হয়ে শেষতক মানসিক বিশেষজ্ঞের শরণাপন্ন হয়েছেন। দাওয়া আর দোওয়া দুটোতেই অনেক দেরী করে তারা এখন আফসোস করছেন এই ভেবে যে, নিরাময়যোগ্য রোগটি তাদের ভুলে, অসচেতনতার জন্য বিশাল মহীরুহতে পরিণত হয়েছে।
আমার মূল উদ্দেশ্য সিজোফ্রেনিয়া নিয়ে কথা বলা। এর সম্বন্ধে জানা, একে ভয় না পেয়ে এর সঠিক নিরাময় করা। 
#আসুন ছোট্ট করে এই ক্রমঃবর্ধক রোগ’টি সম্বন্ধে জানি।
মনের জটিল রোগ সিজোফ্রেনিয়া
১৯১১ সালে সুইডেনের মনোচিকিৎসক ব্লিউলার সিজোফ্রেনিয়া শব্দটি ব্যবহার করেছিলেন। সিজোফ্রেনিয়া একটি তীব্র মাত্রার জটিল মানসিক রোগ। সিজোফ্রেনিয়া শব্দটি এসেছে মূলতঃ গ্রিক ভাষা থেকে। এর প্রথম অংশটিকে বলা হয় ‘সাইজো’ বা ‘সিজো’, যার অর্থ ভাঙ্গা বা টুকরো! দ্বিতীয় অংশটি হলো, ‘ফ্রেনিয়া’ বা মন! অর্থাৎ, পুরোটা দাঁড় করালে হয় ভাঙ্গা মন বা টুকরো টুকরো মন!
অনেকেরই এ রোগটি নিয়ে ভ্রান্ত ধারণা রয়েছে। মানব মস্তিষ্কে নিউরন বা স্নায়ুকোষের পরিমাণ অসংখ্য। এটি সংখ্যায় বিলিয়ন বিলিয়ন হতে পারে। প্রত্যেক নিউরনের শাখা প্রশাখা থাকে, যার সাহায্যে সে অন্য স্নায়ু বা মাংশপেশী বা অন্য কোন গ্রন্থি থেকে উদ্দীপনা গ্রহণ করতে পারে। এই নিউরন বা স্নায়ুকোষের শেষাংশ বা টার্মিনাল থেকে কিছু রাসায়নিক পদার্থ নিঃসরিত হয়। এগুলোকে বলে নিউরোট্রান্সমিটার। এগুলির সাহায্যেই নানা ধরনের উদ্দীপনা স্নায়ুকোষ থেকে স্নায়ুকোষে পরিবাহিত হয়। এভাবে আমরা উদ্দীপনা লাভ করে থাকি। সিজোফ্রেনিয়া রোগটিতে এই যোগাযোগ ব্যবস্থা তথা মস্তিষ্কের স্বাভাবিক কার্যকলাপ বিঘ্নিত হয়!
সিজোফ্রেনিয়ায় আক্রান্ত ব্যক্তির অনুভূতি, চেতনা, কাজকর্ম বাস্তবের সাথে সঙ্গতিহীন বা খাপছাড়া হয়। এরা নিজের মতো করে সবকিছু ভাবে, নিজের একটা ভুবন তৈরি করে নেয়, যেটি বাস্তবের চিন্তা-চেতনার বাইরে। এ রোগটিতে মস্তিষ্কের রসায়ন পরিবর্তিত হয়ে যায়। এদের বোধশক্তি কাজ করে না বা কমে যায়, যা তাদের আচরণকে ভুল পথে পরিচালিত করে। মাঝে মাঝে এদের কার্যকলাপ ভয়ংকর রূপ ধারণ করে। রোগটি এতো ধীরগতিতে অগ্রসর হয় যে, অনেক সময় তাদের পরিবার বুঝতেই পারেন না। এটি বোঝা যায়, শুরু বা প্রকাশ হয় সাধারণতঃ ১৮ বছর বয়স থেকে। তাদেরকে তাদের আচরণের জন্য পরিবারের সদস্যরা ভয় পান বা অস্বস্তিতে ভোগেন।
#উপসর্গ:
আক্রান্ত রোগীদের ভেতর সাধারণতঃ হ্যালুসিনেশন, অলীক প্রত্যক্ষণ, সন্দেহ প্রবণতা, গায়েবী আওয়াজ শোনা, ডিলিওশান বা ভ্রান্ত বিশ্বাস, আচরণের নাটকীয় পরিবর্তন, অনীহায় ভোগা, অস্থিরতা, অবসাদগ্রস্থতা, বিষন্নতা, স্বাভাবিক কাজকর্ম চালাতে ব্যর্থ হওয়ার উপসর্গগুলো দেখা যায়।
রোগী সব সময় ভাবে সবাই তার শত্রু, সবাই তাকে নিয়ে ষড়যন্ত্র করছে! এদের মনে নিজস্ব কিছু দৃষ্টিভঙ্গী পাকাপোক্ত আসন গেড়ে বসে, যেমন ধর্মীয়, পারিবারিক, সামাজিক, অর্থনৈতিক বা সাংষ্কৃতিক। 
অনেক সময় রোগী গোসল করা বা নখ কাটা অর্থাৎ নিজের পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতার প্রতি উদাসীন হয়ে পড়েন। 
অসামাজিকতা বা সমাজ থেকে বিচ্যুত হন, নিজের মত করে একা একা থাকা চলতে থাকে। 
এদের অস্বাভাবিক বিশ্বাস থাকে যে, এদের নিয়ে সবাই সমালোচনায় লিপ্ত, যদিও অন্যরা নিজেদের মধ্যে অন্য বিষয়বস্তু নিয়ে আলোচনা করছে। তাদের পেছনে পুলিশ, গোয়েন্দা কেউ লাগিয়ে দিয়েছে, এদের মনে ভ্রান্ত ধারণা এত বেশী থাকে যে এদেরকে প্যারানয়েড বা সন্দেহ বাতিকগ্রস্ত বলা হয়! 
এরা ভাবে, এদের মনের কথা, চিন্তা চেতনা অন্যরা কি ভাবে যেন জেনে ফেলছে! এরা ভাবে, কেউ তার ভাল দেখতে পারে না! মাঝে মাঝে পর্যাপ্ত ঘুম না হওয়ায় রোগীর এক ধরনের দুঃখবোধ তৈরি হতে পারে।
ক্রনিক বা দীর্ঘমেয়াদি সিজোফ্রেনিয়া অনেক ক্ষেত্রে তীব্র মাত্রায় দেখা যায়। এদের আবেগ ভোঁতা হয়ে যায়। এ রোগটির সাথে আত্মহত্যার গুরুত্বপূর্ণ সম্পর্ক রয়েছে। ডিলিওশান বা ভ্রান্ত বিশ্বাসের জন্যই এদের ভেতর সুইসাইডাল টেন্ডেন্সি বা আত্মহত্যা প্রবণতা তৈরী হয়!
অনেক সময় এই প্রবণতাটির লক্ষণগুলো রোগীর কাছের মানুষেরা একটু লক্ষ্য করলেই বুঝতে পারবেন:
১. রোগী যদি সব সময় সুইসাইডের কথা বলে,
২. যদি কখনো সুইসাইডের প্ল্যানের কথা জানায়,
৩. রোগীর যদি ভবিষ্যৎ সম্পর্কে আশাহত অনুভূতি থাকে,
৪. নিজের সম্পর্কে যদি সব সময় হীনমন্যতা থাকে,
৫. যদি কোন অলীক প্রত্যক্ষণ দেখতে পায়, যা তাকে আত্মহত্যা করতে উৎসাহিত করে।
#কারণ:
এ রোগটি প্রধাণতঃ বংশগত বা জেনেটিক্যাল। বংশের কারো না কারো এটি থাকলে কোন না কোন জেনারেশনে প্রকট অথবা প্রচ্ছন্নভাবে প্রকাশিত হতে পারে কারো কারো ক্ষেত্রে!
#সতর্কতা:
১. এদের সাথে নরমভাবে কথা বলুন। এদেরকে কখনই উত্তেজিত করা যাবে না, কেননা তা অনেক সময় ভয়ংকর বিপদ বয়ে আনতে পারে। 
২. সব সময় এদের সাথে ইতিবাচকভাবে কথা বলুন, অহেতুক মানসিক চাপ বা দায়িত্ব এরা নিতে পারে না, এটি বোঝার চেষ্টা করুন। 
৩. এদের প্রতি সহনশীল আচরণ করুন, যত্নশীল হোন। সবসময় মনে রাখবেন, যে কারো ক্ষেত্রে, যখন তখন শরীরের মত মনও অসুস্থ হতে পারে!
#চিকিৎসা:
কোন সংকোচ বা দ্বিধা ছাড়াই যত তাড়াতাড়ি সম্ভব মনোচিকিৎসক বা সাইকিয়াট্রিস্ট এবং কাউন্সেলর বা সাইকোথেরাপিস্টের শরণাপন্ন হোন। এ রোগটিকে মেডিসিন ও কাউন্সেলিংএর মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। রোগী এতে অনেকটাই সুস্থ হয়ে উঠেন এবং স্বাভাবিক জীবনযাপন করতে পারেন। 
রোগটি নিয়ন্ত্রণের পর রোগী যেন সামাজিক জীবনে চলমান থাকতে পারেন, কারিগরি বা বৃত্তিমূলক জীবিকা অবলম্বন করতে পারেন, সেদিকে কাউন্সেলর উৎসাহিত করবেন।
অন্তর্দৃষ্টিমূলক সাইকোথেরাপি এক্ষেত্রে মেডিসিনের সাথে ভালো কাজ করে। এই বিশেষ থেরাপি রোগীকে তার নিজস্ব জগত থেকে বাস্তব জগতে ফিরিয়ে এনে সেখানে কিভাবে খাপ খাইয়ে চলবেন সেটিতে সাহায্য করতে পারে। এছাড়া সমর্থনমূলক থেরাপি এক্ষেত্রে রোগীর সামাজিকীকরণ ও অর্থনৈতিক পুনর্বাসনে কাজে লাগে।
তাই আর লজ্জা নয়, লুকোচুরি বা দ্বিধা নয়। সিজোফ্রেনিয়ায় আক্রান্তদেরও রয়েছে সমাজে, পরিবারে সুস্থভাবে বাঁচার অধিকার! এ রোগটি সম্পর্কে জানুন ও সচেতন হোন! আপনার এই সচেতনতাই বাঁচিয়ে দেবে একটি প্রাণ, একটি পরিবার ও আপনাকে!
সবাইকে প্রাণঢালা ভালবাসা।

লেখাটি ৪,৮৭২ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

RFL
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.