মাদক ব্যবসায়ীর দায় কি কম?

মালবিকা লাবণি শীলা:
দেশে যতবার যাই প্রতিবারই এক একটি পরিবর্তন দেখে চমকে যেতে হয়। এর মাঝে উল্লেখযোগ্য বিষয়টি হচ্ছে মাদকের ব্যাপক প্রসার। আগে জানতাম হেরোইন খুব দামী বলে সাধারণ মানুষের আওতায় থাকেনা। দেশে গিয়ে দেখি পুরোই আলাদা চিত্র। আশেপাশের অনেকেই শুনি হেরোইনের ব্যবসা করে। এ-ও এক অদ্ভুত ব্যাপার! মাদক ব্যবসায়ী বলতে আমি বুঝতাম ড্রাগ লর্ডস, গডফাদার জাতীয় বিশাল কাউকে। এখানে দেখছি নিতান্ত গরিব অথবা ভুখানাঙ্গা লোকেরা ড্রাগ ডিল করছে।

পরে চিন্তা করে বুঝলাম, প্রত্যেক ব্যবসারই একটা করে চেইন থাকে। মনে করুন আপনার প্রিয় ব্র‍্যান্ডের শ্যাম্পুটি আপনি হাতের কাছের মুদি দোকান থেকে কিনতে পারছেন, শ্যাম্পুর ফ্যাক্টরি পর্যন্ত যাওয়ার কোনো দরকারই আপনার পড়ছেনা। সেই কোম্পানির মালিক অথবা ডিরেক্টর কে সেটাও আপনার অজানাই থেকে যাচ্ছে।
বিশ্বের সব দেশেই মাদক সমস্যা আছে। শত সতর্কতা সত্ত্বেও ব্যবসায়ীরা নিত্যনতুন পথ বানিয়ে নিচ্ছে।

সবদেশের ড্রাগ লর্ড স্বাভাবিকভাবেই অর্থনৈতিকভাবে সচ্ছল। সেই সচ্ছলতা তাকে সামাজিকভাবে সাধারণ মানুষের এমনকি ক্ষেত্রবিশেষে আইনেরও ধরাছোঁয়ার বাইরে রেখে দিচ্ছে। ক্ষমতাধর, প্রভাবশালী লর্ডদের কাছ থেকে অনেক মাধ্যম পার হয়ে মাদকদ্রব্য পৌঁছে যাচ্ছে ব্যবহারকারীদের হাতে। অর্থাৎ পাইকারি থেকে খুচরো বিক্রেতা পর্যন্ত। রাতারাতি ধনী হবার আশায় অনেকেই এইসব ব্যবসায় জড়িত হয়ে একটি দেশের, সমাজের মেরুদণ্ড ভেঙে গুঁড়িয়ে দিচ্ছে।

খুচরো বিক্রেতাদের লক্ষ্য থাকে স্কুল কলেজের ছাত্রছাত্রী। এই বয়েসের অস্থিরতা আর আবেগ এদেরকে ইজি টার্গেট করে তুলছে। বয়ঃসন্ধিতে অনেক ছেলেমেয়েই নিজেদের চাওয়া পাওয়া নিয়ে দ্বিধায় থাকে। আমি এরকমও শুনেছি, কোনো কোনো ব্যবসায়ী বিনে পয়সায় কয়েকবার কাউকে মাদক ব্যবহার করতে দিয়ে উৎসাহিত করে। কয়েকবার ব্যবহারের পর ব্যবহারকারী বড়শিগাঁথা হয়ে যাবার পর সেই ডিলারের কেল্লাফতে।

যে কোনো ড্রাগ প্রথমবার নিলে যে অ‍্যাড্রেনেলিন রাশটা হয়, সেই একই আনন্দ বারবার পাবার আশায় অ‍্যাডিক্ট প্রতিবার মাত্রা বাড়াতে থাকে। এই বয়েসি বাচ্চাদের হাতে টাকাপয়সা বেশি থাকার কথা না। কাজেই এরা বাবা মা অথবা পরিচিতদের কাছে হাত পাতা শুরু করে, হিসেব ছাড়া টাকা দিয়ে কিছু বাবা মা পরোক্ষভাবে এদের মাদক নির্ভরশীল করে রাখছে। মাদকসেবী টাকা না পেয়ে জড়িয়ে পড়ে চুরি, ডাকাতি, অপহরণ, ছিনতাই, অথবা দেহব্যবসার মতো অপরাধের সাথে। মাদকের মাত্রার সাথে অপরাধের মাত্রাও বাড়তে থাকে। যার পরিণতি বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই দুঃখজনক।

সেরকম দুঃখজনক পরিস্থিতির শিকার ষোলোবছর বয়েসি ঐশী, বিভিন্ন মাদকের নেশায় যে নিজের বাবা মাকে হত্যা করেছে। হত্যার সময়ে ঐশীর মানসিক সুস্থতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। অথচ হত্যা পরিকল্পনা থেকে হত্যা পরবর্তী কার্যকলাপ দেখে প্রিমেডিটেটেড খুন বলেই মনে হয়। আদালতে মেয়েটির ফাঁসির হুকুম হলেও আপিল পরবর্তী রায় আজ ঘোষিত হবে।

আমার কথা হচ্ছে এই মেয়েটির মানসিক স্বাস্থ্য ভালোভাবে পরীক্ষা করা হোক। যদি মানসিক ভারসাম্যহীনতা থেকে থাকে তাহলে ওর চিকিৎসা এবং পুনর্বাসনের ব্যবস্থা নেয়া হোক। যদি শাস্তি দেয়াই হয়, তাহলে সমাজে যারা মাদক পাচার করে বিক্রি করে লাখ লাখ ঐশীকে বিপথে পরিচালিত করছে, তাদের বিচার কি আগে হওয়া উচিত নয়?
শেয়ার করুন:
  • 66
  •  
  •  
  •  
  •  
    66
    Shares
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.