পার্বত্য চট্টগ্রাম: রাজনীতির মারপ্যাঁচে দেশহীন এক জনপদ (পর্ব – ১)

শাশ্বতী বিপ্লব:

আমরা যারা দেশকে নিয়ে গর্ব করতে চাই, মুক্তিযুদ্ধ যাদের কাছে জিয়নকাঠি, যারা বিশ্বাস করতে চাই এই দেশটা হিন্দু, মুসলিম, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান, বাঙালী, আদিবাসী সবার – পার্বত্য চট্টগ্রাম তাদের জন্য এক বিশাল চপেটাঘাত। বাঙ্গালী স্যাটেলারদের পার্বত্য অঞ্চলে জোর করে প্রতিস্থাপন এমন এক মর্মান্তিক রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত, যার মূল্য পাহাড়ের মানুষগুলোকে দিতে হয়েছে/ হচ্ছে তাদের জীবন দিয়ে, সমগ্র অস্তিত্ব দিয়ে।

পার্বত্য চট্টগ্রামে চলছে এক দীর্ঘমেয়াদী এথনিক ক্লিনজিং। এই উপমহাদেশের রাজনীতি ও দেশভাগের সবচেয়ে করুণ শিকার পাহাড়ের এই মানুষগুলো।

পার্বত্য চট্টগ্রামে অস্থিরতার ইতিহাস অনেক পুরনো। ১৯৭৭ সালে সাামরিক আগ্রাসন এবং জিয়াউর রহমানের শাসনামলকে মোটামুটিভাবে পার্বত্য চট্টগ্রামে সংঘাতের সূচনাপর্ব বলে ধরা হয়। ১৯৭৩ সালে মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমার নেতৃত্বে পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি (পিসিজেএসএস) গঠন, সরকারী নীতির বিরুদ্ধে সশস্ত্র সংগ্রাম এবং এর ধারাবাহিকতায় ১৯৯৭ সালে পার্বত্য চট্টগ্রাম শান্তি চুক্তি স্বাক্ষর – পার্বত্য চট্টগ্রামের সংঘাতের ইতিহাস বলতে এইটুকুই বেশি প্রচলিত।

মুক্তিযুদ্ধের সময় এই অঞ্চলের অধিবাসীরা ছিলো দ্বিধা বিভক্ত। যেমন ছিলো সমতলের মানুষদের মাঝেও। মুক্তিযুদ্ধে যেমন নৃগোষ্ঠীর অনেকে সরাসরি অংশগ্রহণ করেছিলো, তেমনি আমার বিরোধিতাও করেছিলো অনেকে। বিশেষতঃ, চাকমা রাজা ত্রিদিব রায়ের বিরোধিতার কথা সর্বজনবিদিত।

প্রকৃতপক্ষে ১৯৪৭ এর দেশভাগের সময় পার্বত্য চট্টগ্রাম পূর্ব পাকিস্তানের ভাগে পড়লেও নৃগোষ্ঠীর নেতারা সেটা কখনোই চায়নি। মূলতঃ সেই সময় থেকেই সংঘাতের প্রেক্ষাপট তৈরি হতে থাকে। মুক্তিযুদ্ধে পাকিস্তানের শোচনীয় পরাজয় হলে চাকমা রাজার এই রাজনৈতিক অবস্থানের কারণে সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশের সরকারের পার্বত্য চট্টগ্রামকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে কিছু বিশেষ কৌশল গ্রহণ করে। ৭২ এর সংবিধানে বাংলাদেশের ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীরা স্বতন্ত্র জায়গা করে নিতে ব্যর্থ হয়।

যদিও এটাও শুরু নয়। এই এলাকার মানুষগুলোর দুর্ভোগের শুরু আরও আগে থেকে। ১৯৬২ সালে কাপ্তাই বাঁধ অবকাঠামো নির্মাণের ফলে বিস্তীর্ণ অঞ্চল পানির নিচে তলিয়ে যায় এবং লাখো মানুষ স্থানচ্যুত হয়। তাদের এই দুর্দশাকে তৎকালীন সরকার আমলে না নিলে হাজারো পরিবার সে সময় ভারতে চলে যায়।

পার্বত্য চট্টগ্রামের শোষণের ইতিহাস খুঁজতে আমাদের আসলে যেতে হবে আরও পেছনে। উপমহাদেশের রাজনীতির সাথে সাথে বিবেচনায় নিতে হবে বহির্বিশ্বের রাজনৈতিক স্বার্থ ও প্রভাবকেও। তাছাড়া পার্বত্য চট্টগ্রামের ভৌগলিক অবস্থানটাও বিবেচনার দাবি রাখে।

রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের কারণে এই উপমহাদেশের অসংখ্য মানুষকে দেশছাড়া, গৃহহারা হতে হয়েছে বারবার। নিকট আত্মীয়, প্রতিবেশী, খেলার সাথী রাতারাতি বনে গেছে ভিনদেশের বাসিন্দা। কেউ হয়তো ভালোবেসেছে এক দেশ, রাজনীতি তাকে করেছে অন্য দেশের নাগরিক।

সমষ্টির প্রতিনিধি হয়ে ব্যক্তি (পড়ুন রাজনীতিবিদ) যখন সমষ্টির ভাগ্য নির্ধারণ করে, সমষ্টির সকলের চাওয়া পাওয়া সেখানে প্রতিফলিত হয় না। যেমন হয়নি পার্বত্য চট্টগ্রামের ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর চাওয়া-পাওয়ার প্রতিফলন। যদিও সংখ্যাগুরুর পাশাপাশি সংখ্যালঘুর অধিকার আর নিরাপত্তা নিশ্চিত করাই মানবতা। কিন্তু এই উপমহাদেশের রাজনীতি বরাবরই সেই দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হয়েছে। 

(চলবে)

শেয়ার করুন:
  • 1.3K
  •  
  •  
  •  
  •  
    1.3K
    Shares
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.