প্রকাশ্য হুমকিদাতাদের শাস্তি দাবি করছি

0

কাবেরী গায়েন:

ছোটবেলায় বাবার মুখে প্রায়ই এই গল্পটা শুনতাম। পাশাপাশি দুই গ্রামের মধ্যে খুব প্রতিযোগিতা। বিশেষ করে দুই গ্রামের স্কুলের অহংকার ঘিরে। বলা বাহুল্য, দুই গ্রামেই স্কুল চলে মাত্র একজন করে শিক্ষক দিয়ে।

‘ক’ গ্রামের শিক্ষক খুব সেয়ানা। লবডঙ্কা বিদ্যা এবং খারাপ বুদ্ধি দুই অর্থেই। ‘খ’ গ্রামের শিক্ষক তবু কিছুটা লেখাপড়া জানেন। মানুষও ধুরন্ধর নন। সেদিক থেকে ‘খ’ গ্রামের এক ধরণের তৃপ্তি ছিলো। একদিন ‘ক’ গ্রামের উৎসাহীরা খুব এসে ধরলো ‘খ’ গ্রামকে, প্রতিযোগিতা করতে হবে। মাস্টারের লড়াই। চ্যালেঞ্জ এলে গ্রহণ করতে হয়। অতএব, ‘খ’ গ্রাম রাজি হলো। বেশ নিশ্চিন্তেই।

নির্দিষ্ট দিনে দুই পক্ষ বিশাল মাঠে হাজির ঢোল-ডগর নিয়ে। প্রথমে ‘ক’ গ্রামের শিক্ষককে জিজ্ঞেস করা হলো কিছু প্রশ্ন, তিনি কিছু পারলেন, কিছু পারলেন না, কিন্তু প্যাঁচালেন। তিনি যে জানেন না, সে কথা স্বীকার করার প্রশ্নই ওঠে না। তার সময় শেষ হলে, ‘খ’ গ্রামের শিক্ষককে প্রশ্ন করলো ধুরন্ধর ‘ক’ গ্রামের শিক্ষক, ‘বলো দেখি, ‘আই ডোন্ট নো’ মানে কী? ‘খ’ গ্রামের শিক্ষক সরল বুদ্ধিতে জোরে বললেন, ‘আমি জানি না।’ সাথে সাথে ঢোল-ডগর-কাড়া-নাকাড়া-টিটকারি একসাথে বেজে উঠলো ‘ক’ গ্রামের পক্ষ থেকে। ‘খ’ গ্রামের শিক্ষক তো নিজেই স্বীকার করেছেন হাজার মানুষের সামনে যে তাদের শিক্ষক যে প্রশ্ন করেছেন তা তিনি জানেন না। ‘খ’ গ্রামের লোকজন প্রথমে অপমানে চুপ করে গেলেন। তারপরে, বেচারা ভালোমানুষ শিক্ষককে মাথা মুড়িয়ে, ঘোল ঢেলে গ্রাম ছাড়া করলেন।

দুই।
গল্পে বা বাস্তবে ‘নড়াই’ লাগিয়ে দেবার মানুষের ঘাটতি কোনদিনই ছিলো না। হালে, আমাদের টেলিভিশন চ্যানেল্গুলো হেফাজতি নেতাদের এনে ‘টক-শো’ প্রতিযোগিতার আয়োজন করছেন। এইসব নেতারা প্রকাশ্যে অন্য ধর্মের বিরুদ্ধে, অন্য ধর্মের চিহ্নের বিরুদ্ধে, নারীর বিরুদ্ধে, ভিন্নমতের বিরুদ্ধে বলে যান ক্রমাগত। হত্যার হুমকি দেন। তাদের অনেক প্ল্যাটফর্ম। তাদের কথার পিঠে উত্তেজিত হয়ে কেউ কিছু বলে ফেললে আর রক্ষা নাই। ধর্মভীরু সাধারণ মানুষকে লেলিয়ে দেয়া হয় মাঠে। যাদের অন্ধত্বের দাম দিতে গিয়ে ক্রমাগত ভিন্নমত, ভিন্ন বিশ্বাস, সাংস্কৃতিক পরিমন্ডল ক্ষয়িষ্ণু হয়ে যাচ্ছে, তাদেরই কাছ থেকে জ্ঞান অর্জন করতে হচ্ছে টক-শোতে। একটা দেশ ক্রমাগত এইসব অবাস্তব দাবির মুখে পিছনে যাচ্ছে, আর আমাদের টেলিভিশন চ্যানেলগুলো লড়াই লাগিয়ে মজা দেখছে! টিআরপি গুনছে।

তিন।
তবুও, ভিডিওটা পুরো না দেখে মন্তব্য করতে চাইনি। অবশেষে দেখা হলো। হায়! হেফাজত তো বলছেই, এমনকি, ‘খ’ গ্রামের লোকজনের মতো, আমাদের তথাকথিত প্রগতিশীল মহলও ইনিয়ে-বিনিয়ে বলার চেষ্টা করছেন, কেনো তিনি মসজিদ সরানোর কথা বললেন? তিনি মসজিদ সরানোর কথা বলেছেন, না কি, হেফজতের দাবি মোতাবেক আদালত প্রাঙ্গণ ‘অসাম্প্রদায়িক’ (হায়! কী দিন আসলো, হেফাজতও না কি অসাম্প্রদায়িকতা শেখায় টেলিভিশনে!) রাখার জন্য ‘মূর্তি’ সরিয়ে দেবার যুক্তির পিঠে ‘তাহলে তো মসজিদও সরিয়ে দিতে হয়’ বলেছেন? আমি তো বুঝলাম, তিনি কোনটিই সরানোর পক্ষে না।

চার।
হেফাজতি নেতা ‘মূর্তি’ সরাতে বলতে পারবেন আদালত প্রাঙ্গণে ‘অসাম্প্রদাকিতা’ রক্ষার জন্য, কিন্তু সেই কথার পিঠে যুক্তি হিসেবে ‘অসাম্প্রদায়িকতা’ রক্ষার জন্য তাহলে মসজিদ সরানোর কথা বললে সুলতানা কামালকে গ্রেফতার করার ডাক দিতে হবে? না হলে তাকে মারার হুমকি দিতে হবে!
এ কোন যুগে আমরা বসবাস করছি!

এই দেশ থেকে তাহলে সব বিদ্যা-বুদ্ধি-যুক্তির পাঠ বন্ধ করে হেফাজত যে যে বাক্য সহি বলে সার্টিফিকেট দেবে সেই সেই বাক্যগুলো লিখে সব গণমাধ্যমে প্রচার করা হোক, সরকারী গেজেট আকারে টাঙ্গিয়ে দেয়া হোক সারা দেশে। আমরা মুখস্ত করতে থাকি। বলা তো যায় না, কে কখন কোথায় তাদের ইচ্ছার বিপরীত বাক্য বলে মার খান! জীবন তো একটাই।

পাঁচ।
আমোদের সাথে, আমিও হেফাজতের আদালত প্রাঙ্গণ ‘মুর্তি-মুক্ত’ করে অসাম্প্রদায়িক করার দাবির সাথে একমত হতেই চাই। তাহলে, তর্কের খাতিরে, যদি সুলতানা কামাল বা কেউ বলতেনও মসজিদ সরিয়ে ফেলার কথা ভাস্কর্যের সাথে সাথে, তা’হলে তো তাদের দাবির ‘অসাম্প্রদায়িক আদালত প্রাঙ্গণ’ ধারণার সাথেই একাত্মতা ঘোষণা করা হতো। না কি মসজিদ ধর্মীয় স্থাপনা নয়?

শেষ হইয়াও হইলো না শেষ।
তোমাকে বধিবে যে, গোকূলে বাড়িছে সে নয় কেবল, বেড়ে গেছে। সবচেয়ে সাবধান বোধহয় হবার সময় এসেছে দো-দেল বান্দা তথাকথিত প্রগতিশীল মহলের। সুলতানা কামাল তর্কের পিঠে এই যুক্তি না দিলেও তাকে দেশছাড়া করার দাবি উঠতো। হয়তো একদিন পরে উঠতো। উঠবে সবার নামেই, যারা যারা এদেশটাকে এক চুল হলেও অসাম্প্রদায়িক দেখতে চান। যারা উন্মুক্ত পরিসরে আলোচনা করতে চান, মুষ্টিমেয় যাদের এখনো আস্থা আছে জাতি-ধর্ম-বর্ণ-লিংগ নির্বিশেষে সব মানুষের সমান অধিকারের বাংলাদেশে। সুলতানা কামালকে তাড়াতে পারলে, সেই গুটিকয়েকের একজন কমে।

যাঁরা সরাসরি একজন সম্মানিত মুক্তিযোদ্ধাকে ‘হাড়-গোস্ত’ একসাথে করার দাবি তোলে মিথ্যা অভিযোগে, তাদের বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা বের হয় না। এও কম আশ্চর্যের নয়।

আমি শুধু আমার প্রতিবাদটুকু জানিয়ে রাখছি। আর একজন সম্মানিত নাগরিককে যারা প্রকাশ্যে মারার ঘোষণা দেয়, তাদের গ্রেফতার করে উপযুক্ত শাস্তির দাবি করছি।

লেখাটি ১,৪০৪ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

RFL
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.