চলুন, সেটেলারদের বরং নিরাপত্তা দেই

0

তনয়া দেওয়ান:

এই যে আদিবাসী ভাইয়েরা, আপনারা আপনাদের সেটেলার ভাইদের (!!!) নিরাপত্তা দিতে পারেন না? জানেন না আপনারা,  কোন না কোন ভাবে একজন সেটেলার মারা গেলে ৩/৪ জন আদিবাসীকেও মরতে হয়? জানেন না ভাই, আগুনে পুড়ে নিঃস্ব, সহায়-সম্বলহীন হয়ে মাথা গোজাঁর ঠাঁই হারানোর কষ্ট? তাও কেন আমার আদিবাসী ভাইয়েরা সেটেলারদের নিরাপত্তা দিতে পারছেন না? কেন?

আপনারা কেউ নিরাপত্তা দিতে পারছেন না বলেই তো আদিবাসীদেরকে দলে দলে পালাতে হচ্ছে। আদিবাসীদের নিরাপত্তার দরকার নেই,  দয়া করে সেটেলারদের নিরাপত্তা দিন, যাতে তারা না মরে, যেন বেচে থাকে আজীবন, পারলে যেন অমরত্ব লাভ করে।

আদিবাসী দু একটা মরে পচে রাস্তায় পড়ে থাকলেও কারো কিছু যায় আসে না, তাতে কিছু হয় না। কিন্তু একটা সেটেলার মারা গেলে অনেক কিছু আসে যায়। দেখেন না,  এক নয়ন সেটেলার মারা গিয়ে কী হলো? শুধু কি এইবার? অতীত কি ভুলে গিয়েছেন? মনে নেই এরকম আরও কতো কতবার হয়েছে? সেটেলার যতবার মরেছে, ততবার হয়েছে।

আর আদিবাসী মরা, ধর্ষিত হওয়া, তাদের ঘরবাড়ি পুড়িয়ে দেওয়া এসব কি কোন খবর? তাতে কি কারো টনক নড়ে ?
আমরা তো এসেছি মরার জন্য,  বাঁচার জন্য এলে তো মানবাধিকার বলে কিছু থাকতো! 
ওহ্…..  মানবাধিকার? মানব+অধিকার, সেটেলাররা আমাদেরকে তো মানুষই মনে করে না, তাই তো খোলা আকাশের বাসিন্দা করেছে, (তারা মনে করে আদিবাসীরা এক জাতের প্রাণী,  তাই তাদেরকে ধরে ধরে কোরবানি দেয়া যায়)
আর অধিকার, তা নেই বলেই তো নিজের ঘরবাড়ি, জায়গা জমি হারাতে হয়, নিজের ঘরে কেউ আগুন লাগিয়ে দিচ্ছে দেখার পরও নির্বাক তাকিয়ে থাকতে হয়, হয়তো শরীরটার উপরও অধিকার নেই বলেই হয়তো আদিবাসী মেয়েদেরকে ধর্ষণের শিকার হতে হচ্ছে,  সেই সেটেলারদের হাতেই।

আচ্ছা ভাই, কখনো কি শুনেছেন, আদিবাসী কোনো ছেলের হাতে কোন সেটেলারের মেয়ে ধর্ষণের শিকার হয়েছে? শুনেছেন কি কখনো, আদিবাসীরা দলে দলে গিয়ে সেটেলারের ঘর পুড়িয়ে দিয়েছে?
তা কিভাবে শুনবেন ভাই, আদিবাসীরা তো মানুষই নয়, তাদের শরীরে সেই জোরও নেই, মন তো তথৈবচ, তারা কীভাবে করবে? এসব তো সেটেলার নামক মানুষরা করে,  তাই না?

বাংলা মুভিতে দেখা যায়,  তিন ঘন্টাজুড়ে হো হো করে হাসলো ভিলেনরা আর নায়কের সাথে পাশে থাকা ভালো মানুষরা মুভি শেষ হওয়ার আগের দুই মিনিট জয়ীর হাসি হাসলো, তার মানে এরপর যা দেখানো হয় না তাতে বুঝে নিতে হয়,  এরপর আর তাদের দুঃখ নেই, শুধু সুখ আর সুখ……
সে রকম হলেও সারা যেত, কিন্তু আদিবাসীদের তো শেষ হয় না, একটা চ্যাপ্টারের পর আরেকটা চ্যাপ্টার চলতেই থাকে…..  চ্যাপ্টার যেন শেষ হতেই চায় না….।

আমার আদিবাসী ভাইয়েরা, আপনারা কি আইনরক্ষাকারী নিরাপত্তাবাহিনীর জন্য অপেক্ষা করছেন? ভাই,  উনারা বড় মানুষ,  তাই আসতে একটু দেরি হয়, ততক্ষণে তো সব ধ্বংস হয়ে যায়।

তাই ভাই আসুন আমি, আপনি, আমরা, সবাই মিলে সেটেলারদের নিরাপত্তা দেই, যাতে তারা না মরে, তারা মরলে যে আমাদেরও মারবে,  হামলা করবে, ঘরবাড়ি পুড়িয়ে দেবে, ধর্ষণ করবে।

প্রাসঙ্গিকভাবে সবচেয়ে অবাক লাগে, পার্বত্য চট্টগ্রামে উন্নয়নের ধারা বইয়ে দেয়ার অঙ্গীকার নিয়ে ব্যবসা করতে আসা কিছু অর্গানাইজেশনের দিকে তাকালে। পার্বত্য চট্টগ্রামে কান্নার ধারা যখন প্রবাহিত হয় তখন কোথায় যায় তাদের সেই উন্নয়নের স্লোগান?

এমন নয় তো,  আপনারা শুধু পাহাড়ের সম্পদকেই ভালোবেসেছেন, পাহাড়কে নয়?
আপনাদের উদ্দেশ্যেই বলছি, সত্যি যদি উন্নয়ন চান তাহলে আগে পাহাড়ের মাটি ও মানুষকে ভালোবাসুন, আমি হলপ করেই বলতে পারি, এই পাহাড়ের মাটি ও মানুষের জন্য যা করবেন,  তার থেকে বেশি কিছু এই পাহাড়ের মাটি ও মানুষ আপনাকে দিবে ।

আশায় বুক বাঁধি,  পাহাড়ের এই কান্নার ঝর্ণা একদিন না একদিন এই পাহাড়ের মানুষের হাসির ধারাতে পরিণত হবে, হয়তো সেদিন আমি আপনি থাকবো না, থাকবে আমাদের ভবিষ্যত প্রজন্ম। 

শেয়ার করুন:
  • 720
  •  
  •  
  •  
  •  
    720
    Shares

লেখাটি ২,২৯৩ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.