শুভশক্তির উদয় হোক

জিনাত হাসিবা স্বর্ণা:

তর্ক হচ্ছিলো টক শোতে। গত ২৭ মে, অনলাইন টিভি চ্যানেল নিউজ ২৪-এ সুপ্রিম কোর্ট প্রাঙ্গণ থেকে ভাস্কর্য স্থানান্তর নিয়ে ‘জনতন্ত্র গণতন্ত্র’ নামের একটি টকশো। উপস্থিত আছেন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা সুলতানা কামাল, গণজাগরণ মঞ্চ মুখপাত্র ইমরান এইচ সরকার, হেফাজত প্রতিনিধি মুফতি সাখাওয়াত হোসেন, আওয়ামী লীগ নেত্রী অপু উকিল এবং উপস্থাপক রোবায়েত ফেরদৌস।

সুলতানা কামাল তাঁর অবস্থান স্পষ্ট করে বলেন,

-“অনেক দিন ধরে ভাস্কর্যের মধ্য দিয়ে বিচারের যে প্রতীক, সেটাকে একটা জায়গায় প্রতিস্থাপন করা হয়। মানুষ সেটাকে দেখে। সেটা না থাকলেও কোনও ক্ষতি নেই। সেটা যে থাকতে হবে, এমন কোন কথাও নেই। আমাদের বিষয়টি ছিল সেটাকে ধর্মের নাম দিয়ে, ধর্মকে ব্যবহার করে যেভাবে অপসারণ করা হলো, সেটা মুক্তিযুদ্ধের যে মূল চেতনা ছিল, তার সঙ্গে যায় না।”

হেফাজত প্রতিনিধির দাবি,

“‘মূর্তি’ হলো একটা সম্প্রদায়ের স্থাপনা, আদালত প্রাঙ্গনে কোনো ধর্মীয় সম্প্রদায়ের স্থাপনা থাকার কথা না, এই মূর্তি (ভাস্কর্য জাস্টিশিয়া) সেখানে থাকা সাম্প্রদায়িকতার চিহ্ন এবং এটাই মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বিরোধী।”

উত্তরে সুলতানা কামাল বলেন,

-“তাহলে তো সেখানে মসজিদও থাকার কথা না, মসজিদ তো ধর্মীয় স্থাপনা।”

তর্ক এবং যুক্তির প্রেক্ষিত স্পষ্ট। কিন্তু এর ভুল উপস্থাপনার সুযোগ পুরোপুরি নিয়েছে ‘হেফাজত-এ-ইসলাম’। এই তর্কের সূত্র ধরে মানবাধিকারকর্মী ও তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা সুলতানা কামালকে ২৪ ঘন্টার মধ্যে গ্রেফতার অথবা ‘তসলিমা নাসরিনের মতো’ দেশের বাইরে নির্বাসনে পাঠিয়ে দেয়ার দাবি জানিয়েছে হেফাজতে ইসলাম।

সুপ্রিম কোর্ট থেকে ভাস্কর্য অপসারণের দাবিতে শুক্রবার জুমার নামাজ শেষে বায়তুল মোকাররমের উত্তর গেটে আয়োজিত হেফাজতে ইসলামের এক বিক্ষোভ সমাবেশে সংগঠনের ঢাকা মহানগরের সহ-সভাপতি মাওলানা জুনায়েদ আল হাবীব বলেন, “সাহস কত সুলতানা কামালের! তিনি বলেছেন, ভাস্কর্য থাকতে না দিলে মসজিদ থাকতে দেওয়া হবে না। সুলতানা কামাল রাজপথে নেমে দেখুন, হাড্ডি-গোস্ত রাখা হবে না।”

তিনি বলেন, ‘আমি বলতে চাই, বদরের যুদ্ধ কিন্তু রমজান মাসে হয়েছে। মক্কায় যত মূর্তি সরানো হয়েছে, সেটা রমজান মাসেই সরানো হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী ও প্রধান বিচারপতি মূর্তি কি এখান থেকে সরাবেন? নাকি আমরা আসবো? যদি আমাদের আসতে হয়, বাংলাদেশে পূজা মণ্ডপ ছাড়া আর কোথাও মূর্তি রাখা হবে না।  প্রশাসন ও সরকারকে বলতে চাই, আমরা যে আসতে পারি, আপনাদের নিশ্চয় তা জানা আছে। ২৪ ঘণ্টায় কোটি মানুষ ঘেরাও করবে হাইকোর্ট। মেহেরববানি করে আমাদের আসতে বাধ্য করবেন না। আমরা যেদিন আসবো, পুলিশ ঠেকাতে পারবে না। আমরা যেদিন আসবো, কাফনের কাপড় হাতে নিয়ে আসবো।” সংযমের মাসে ‘হেফাজত-এ-ইসলাম’ চমৎকার ‘সংযমী’ বক্তব্য।

রমযান মাসকে এদেশের মুসলিমরা সংযম আর সৌহার্দ্যের মাস হিসেবে জেনে এবং মেনে এসেছে। এখন হেফাজত এই মাসের রেফারেন্স টানছে যুদ্ধ বিগ্রহ এবং আক্রমণাত্মক ধর্মাচরণের উদাহরণ টেনে। একে কেন উস্কানীমূলক বক্তব্য হিসেবে আইনের আওতায় আনা হবেনা? দিনে দুপুরে একটা মানুষকে নৃশংসভাবে হত্যার হুমকি এবং ডাক দেওয়া হচ্ছে। এর পর সরকার এবং এর আইন শৃঙ্খলা ব্যবস্থা কিসের অপেক্ষায় থাকবে? এরপর কিসের সমঝোতা?

সমঝোতার বিষয় আশয় আছে। তার নমুনাও হেফাজত প্রতিনিধিরা রেখেছে তাদের বক্তব্যে। ঢাকা মহানগর হেফাজতের সহ সভাপতি মুজিবুর রহমান পেশওয়ারী বলেন, “প্রধানমন্ত্রী, আপনি ‘কলা ঝুলিয়ে মূলা’ খাওয়ালেন। তিন-চারজন লোকের কারণে আপনার ভোট বাক্স কমছে। ৫ জানুয়ারির নির্বাচন সামনে আশা করবেন না। আগামী নির্বাচনে স্বয়ং মোদী এসে আপনাকে ক্ষমতায় বসাতে পারবেন না।”  সরকারী দলকে সরাসরি পরবর্তী ভোটের চ্যালেঞ্জ দিয়েছে হেফাজত। এখানে স্পষ্ট হয় যে ভোট-ব্যাঙ্কের হিসাব নিকাশেই সমঝোতার ‘কলা-মূলায়’ আপোষরফা এবং ধন্যবাদ বিনিময় ও প্রত্যাহার চলে সরকারপক্ষ এবং হেফাজতে।

তো, এবার হেফাজতের দাবী একজন রক্তমাংসের মানুষকে ঘিরে। সেই মানুষটি আর দশজনের মতোন নয়।।সেই মানুষটি এমন একজন, যার অবস্থান ‘রামপাল বিদ্যুৎ প্রকল্পের’ বিরুদ্ধে দৃঢ়। সুতরাং তার অবস্থান টালমাটাল হলে সরকার পক্ষের আখেরে লাভ। আবার এই মানুষটাই মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর কাছের মানুষদের মধ্যে পড়ে বলেই জানি। বেগম সুফিয়া কামালের অবস্থান মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর কাছে কতো শ্রদ্ধার এবং আবেগের ছিলো, তা সকলের জানা। সেই সূত্রে পারিবারিক পরিমণ্ডলের ধরা ছোঁয়ার মধ্যে থাকা সুলতানা কামাল তাঁর পরমাত্মীয়। এখন এই মানুষটির দিকে যখন হেফাজতের আঙুল, তখন মাননীয় প্রধানমন্ত্রী কী পদক্ষেপ নিবেন তা দেখার অপেক্ষা।

হেফাজত প্রশ্নে সরকারের মাত্রাতিরিক্ত সমঝোতার প্রবণতা যেমন দিনে দিনে হতাশ করেছে- তেমনি ৫মে হেফাজতের শাপলা চত্বরের জমায়েত ও দৌরাত্ম্যকে সুকৌশলে ভন্ডুল করে দেওয়া এবং পরবর্তী পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার দক্ষতায় যে স্বস্তি ঢাকার মানুষ পেয়েছে তাও কেউ ভুলেনি এখনো। মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর এবারের অবস্থান অনেক দিক থেকে গুরুত্বপূর্ণ এবং এটা সময় এবং অন্য ঘটনায় চাপা পড়ে যাবার নয়। যদি না হেফাজত এই দাবী ভুলে নিজে থেকে অন্য কোনো দাবী সামনে নিয়ে আসে।

হেফাজতের বক্তব্যে শুধু সুলতানা কামালকে নয়, আক্রমণ করা হয়েছে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকেও। মাননীয় প্রধানমন্ত্রীকে চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দেওয়ার জন্য তাঁর সহায়ক শক্তি হিসেবে টেনে আনা হয়েছে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী কে। এর জবাব কি হেফাজত পাবে নাকি রামপাল ইস্যুর পক্ষের একজন শক্তিকে দূর্বল করার দিকেই যাবে সরকারের এবারের কৌশল?

সবশেষে হেফাজত বক্তব্যের গুরুত্বপূর্ণ অংশ-“সুলতানা কামালকে ২৪ ঘন্টার মধ্যে গ্রেফতার অথবা ‘তসলিমা নাসরিনের মতো’ দেশের বাইরে নির্বাসনে পাঠিয়ে দেয়ার দাবি”। তসলিমা নাসরিনকে যখন পাঠানো হয়েছিলো তখন এ কানের খবর ও কানে পৌঁছানোর সুযোগ ছিলো না। তসলিমা নাসরিনের লেখা এবং অবস্থানের মর্ম বোঝার মানুষ ছিলো শুধু তাঁর আশেপাশের কয়েকজন। তখনকার প্রেক্ষিত আর এখনকার প্রেক্ষিত এক নয়। সুলতানা কামালকে নির্বাসনে পাঠানো তো পরের কথা, বরং তসলিমা নাসরিনকে ফিরিয়ে আনার এতোদিনের দাবি জোরালো হয়ে উঠার সমূহ সম্ভাবনা দেখা যায় এই দাবির প্রেক্ষিতে।

শুধু অসাম্প্রদায়িক মানুষেরাই নয়, হেফাজতও চায় এবার তেল আর জল আলাদা হোক। তাই এমন দাবি তুলেছে যেন এবারের দাবি পূরণে আর কোনো মধ্যম পন্থা অবলম্বনের সুযোগ না থাকে সরকার পক্ষের। বাকিটা সময়ের অপেক্ষা মাত্র- দাবি চাপা পড়বে? নাকি আবারো আপোষরফা? কীসের আপোষ? রক্তমাংসের মানুষে? পরমাত্মীয়ে? বৈরীপক্ষে? ভোট ব্যাংকে? রাজনৈতিক সত্তা? ব্যক্তি সত্তা? সুলতানা কামাল? তসলিমা? রামপাল? হেফাজত? ভবিষ্যৎ বাংলাদেশের পর্দানশীন চেহারা?

শুভবুদ্ধি এবং শুভশক্তির উদয় হোক। এই অস্থিরতার অবসান হোক।

শেয়ার করুন:
  • 169
  •  
  •  
  •  
  •  
    169
    Shares
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.