এই ফ্রাংকেনস্টাইনদের রুখবে কে?

0

সুপ্রীতি ধর:

কী এক ঘোর অমানিশা ক্রমশ গ্রাস করে নিচ্ছে বাংলাদেশটাকে। আমার দেশ, আপনার দেশ, লাল-সবুজের জমিন এই দেশ। তিরিশ লাখ শহীদের রক্তে ভেজা এই মাটিতে আজ শকুনের দাপট। তাও আবার ৪৬ বছর পর ওরা আজ শক্তি আর ঔদ্ধত্য নিয়ে আস্ফালন করছে, তাতে আমি সত্যিই কুণ্ঠিত। মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তি যখন ক্ষমতায়, তখন এরকম একটা পরিস্থিতি মোটেও কাম্য ছিল না। কেউ আমরা ঘূণাক্ষরেও ভাবতে পারিনি যে, আজ ২০১৭ সালে এসে দেশটাকে এমন ‘অসহ্য’ মনে হবে! নিজেকে নিজ দেশে ‘এলিয়েন’ মনে হবে!

গতকাল দুপুরে ইস্যু ছিল রাঙামাটির লংগদুতে বাঙালী সেটেলার কর্তৃক আদিবাসীদের বসতভিটায় আগুন ধরিয়ে দেয়া, খুন, অত:পর দলে দলে আদিবাসীদের প্রস্থান অজানার উদ্দেশে। আমরা যারা একটু খবরাখবর রাখি, আমরা জানি যে, এটা রুটিন ওয়ার্ক সরকারের প্রভাবশালী একটি বিশেষ মহলের, যারা পাহাড়কে আজ নিয়ন্ত্রণ করছে, পাহাড়ে উন্নয়নের নামে আদিবাসীদের উচ্ছেদ অব্যাহত রেখেছে। তো, তাদের রুটিনমাফিক অগ্নিসংযোগের ঘটনার আগে দু’একজন বাঙালীর লাশ পড়বে, আর তারই জের ধরে আদিবাসীদের পড়বে দ্বিগুণ-তিনগুণ। বাড়ি পুড়বে, মেয়েরা নির্যাতিত হবে। তারপর তারা চলে যাবে। একটি সোকলড গণতান্ত্রিক দেশে এসব বাস্তুচ্যুত মানুষগুলো শেষপর্যন্ত কোথায় গিয়ে ঠেকে, জানি না। জানতে চাইও না। 

তাছাড়া পাহাড়ের এই ঘটনা নতুন কিছু তো না। প্রতিদিনই ঘটছে, যখন একটু বড় আকার নেয়, তখনই কেবল আমরা জানতে পারি। কিন্তু এইদেশে সরকারের পেটে ঢুকে যাওয়া মেইনস্ট্রিম মিডিয়াগুলোও যখন চুপ থাকে, তখন বুঝতে অসুবিধা হয় তারা কোথায় বিক্রি হয়ে আছে। আমরা এখনই ‘সাংবাদিকতা’র শেষকৃত্যটুকু করে ফেলতে পারি।

এই ইস্যুটি হালে পানি পেতে পেতেই নতুন ইস্যু হাজির। এবার মানবাধিকার কর্মী এবং তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা সুলতানা কামালকে ঘিরে। সুলতানা কামালকে ২৪ ঘন্টার মধ্যে গ্রেফতারের হুমকি দিয়েছে হেফাজতে ইসলাম। হুমকিটি এসেছে জুম্মার নামাজের পর বায়তুল মোকাররম থেকে। যে স্থানটিকে হেফাজত তাদের অস্থায়ী কার্যালয় বানিয়ে ফেলেছে বলা যায়। সুলতানা আপার বিরুদ্ধে অভিযোগ গুরুতর। তিনি না কী সুপ্রিমকোর্ট থেকে মসজিদ সরিয়ে ফেলার কথা বলেছেন! কিন্তু ভিডিওটি যারা দেখেছেন, তারা নিশ্চিত করেই জানেন, আসলে তিনি কী বলেছেন, এবং কোন কথার প্রেক্ষিতে কী বলেছেন!

যাই হোক, অনলাইন অ্যাক্টিভিস্ট অজন্তা দেবরায়ের বক্তব্যটাই এখানে তুলে ধরি:

“হেফাজতের বক্তব্য সুলতানা কামাল নাকি বলেছেন- ‘মূর্তি না থাকলে এদেশে মসজিদও থাকতে দেয়া হবে না।’ সুলতানা কামালের মত একজন মানুষ মূর্খ হেফাজতিদের মত যা খুশি মুখে আসে বলে ফেলবেন তা বিশ্বাস হচ্ছিলো না। তাই ইউটিউব থেকে যে টকশো-র বক্তব্য নিয়ে এতো তোলপাড় সেটি বের করে দেখলাম। দেখে যা বুঝলাম তা হলো- পুরো টকশো’র আলোচনা থেকে একটি বক্তব্যের মাঝখান থেকে একটিমাত্র লাইন তারা নিয়েছে, তাও বিকৃতভাবে।

আসল সত্যিটি হলো- হেফাজতের কেন্দ্রীয় নেতা মুফতি সাখাওয়াত তার বক্তব্যের এক পর্যায়ে বলেন-‘আদালত প্রাঙ্গনের মতো গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় কোনো একটি সম্প্রদায়ের প্রতীক থাকতে পারে না। যদি তা থাকে, তা বাংলাদেশের স্বাধীনতার অসাম্প্রদায়িক চেতনার বিরোধী।’ তখন তার প্রতি উত্তরে সুলতানা কামাল বলেন- ‘তাহলে তো মসজিদও থাকার কথা না। ওখানে ঈদগাহ আছে কেন, মসজিদ আছে কেন। সেখানে যদি মসজিদ থাকে, তাহলে মূর্তি থাকতে পারবে না কেন?’

সুলতানা কামালের এই বক্তব্যের একাংশকে বিকৃতভাবে পুঁজি করে তাঁর ‘হাড্ডি মাংস এক’ করে দেয়ার হুমকি দিয়েছে হেফাজত নেতারা। আবার এই হুমকিকে সমর্থন দিয়ে যাচ্ছে ক্ষমতাসীন দলেরই একটি বিরাট অংশ, যারা নিজেদেরকে ‘মুসলমান’ বলেই দাবি করতে ভালোবাসে।

খুবই মন খারাপ হলো পুরো বিষয়টাতে। কিছু কিছু পোস্টে দেখলাম, সুলতানা কামালকে অতি উগ্র ভাষায় গালিগালাজ করা হচ্ছে। এই গালিগুলো আমরা চিনি, কাদের মুখ থেকে বেরোয়, তাও আমরা জানি। অনলাইনজীবী তো আমরা, নিজেরাও হাজার বার এসবের মধ্য দিয়ে গেছি, যাচ্ছি। এসব গালি থেকে কোনো নারী পার পায় না, তা যতোই তিনি ক্ষমতাধর হোন না কেন! তিন-তিনবার প্রধানমন্ত্রী থাকা খালেদা জিয়াকে নিয়েও যে ভাষায় ট্রল করা হয়, যে ভাষায় আক্রমণ করেন খোদ বর্তমান প্রধানমন্ত্রী, তাতে লজ্জিত হতে হয়। খোদ প্রধানমন্ত্রীই তো হেফাজতের সাথে মিলিয়ে বেগম খালেদা জিয়াকে তেঁতুলের সাথে তুলনা করেছিলেন উনি পাশে বসেছিলেন বলে। তাহলে এই সেদিন যে তিনি নিজেও বসলেন, তখন তিনিও কি তেঁতুল হয়ে যাননি? 

এতো অপমান, গায়ে লাগে বৈকি! একের পর ঘটনা, আমাদের সুস্থির থাকতে দিচ্ছে না। আমরা হেরে যাচ্ছি ক্রমশ:। যাদের ওপর আস্থা রেখেছিলাম, সেই তারাই আমাদের হারিয়ে দিচ্ছে। আমরা সংখ্যালঘু থেকে লঘুতর হয়ে যাচ্ছি। কথা বলার জায়গাগুলো আর থাকছে না। ইচ্ছাও করে না আর।

বনানী ধর্ষণের ঘটনা নিয়ে যখন একের পর এক চাঞ্চল্যকর তথ্য বেরিয়ে আসছিল, ঠিক তখনই দৃশ্যপটে আনা হলো আবারও শ্যামল কান্তি ভক্ত স্যারকে। আবার নারায়ণগঞ্জ, আবার ওসমান পরিবার। এবার কানে ধরা থেকে রেহাই পেয়ে স্যারের জায়গা হয়েছে কারাগারে। কী ঔদ্ধত্য এই ওসমান পরিবারের! কোথা থেকে এই সাহস পায়, আমরা সবাই জানি। যখন একটা দেশের প্রধানমন্ত্রী ১৬ কোটি মানুষকে পাশ কাটিয়ে গিয়ে একটা পরিবারের পাশে দাঁড়ান, তখন বুঝতে অসুবিধা হয় না, কালো টাকা, পেশী শক্তির দম্ভটা কোথায়!

স্বভাবতই আমরা ফেটে পড়লাম আবারও। এর রেশ থাকতে থাকতেই সুপ্রীম কোর্টের সামনে থেকে ন্যায়ের দেবী থেমিসের ভাস্কর্য অপসারণের ঘটনা। রাতের আঁধারে, ঠিক চোরের মতোন। বিশ্বের তাবৎ অন্যায় কাজগুলো তো রাতের অন্ধকারেই হয়েছে। সুতরাং নামমাত্র গণতান্ত্রিক সরকারও সেই পথেই হাঁটলো। আর এটা যে ঘটবে তা জানাই ছিল। যেদিন খোদ প্রধানমন্ত্রী হেফাজত নেতাসহ তার সাগরেদদের মহাসমারোহে গণভবনে ডেকে নিয়ে পাশে বসালেন পরম মমতায়। আর মেনে নিলেন তাদের বেশকিছু দাবি-দাওয়া। সেদিনই আসলে শেষ পেরেকটা ঠুকা হয়ে গেছে এই দেশের অসাম্প্রদায়িকতার মূলে, সংবিধানের মূল স্তম্ভে।

ফিরে আসি সুলতানা কামাল প্রসঙ্গে। মৌলানা নামের এসব অজাত-কুজাতদের প্রশ্রয় দিয়ে এমনই মাথায় তোলা হয়েছে যে, তারা আজ সর্বজননন্দিত সুলতানা কামাল আপাকে নিয়ে কথা বলারও সাহস পায়। ধিক, রাষ্ট্রযন্ত্রকে, সেইসাথে ক্ষমতায় থাকা আপোসকারী সবাইকে। যারা ক্ষমতার মোহে পড়ে আজ শত্রু-মিত্র চিনতে ভুলে গেছে, যারা নিজেদের শুধুমাত্র মুসলমান হিসেবে আত্মম্ভরিতায় ভুগছে, শতধিক তাদের।

আমরা এখন দেখার অপেক্ষায় সুলতানা আপাকে হুমকি দেয়ার প্রতিক্রিয়ায় প্রধানমন্ত্রী কী করেন! লাগাম টানেন কীনা! সুলতানা আপাকে এই হুমকি কিন্তু উনার ব্যক্তিগত হুমকি নয়, এটা এই দেশের আপামর মুক্তিকামী, অসাম্প্রদায়িক চেতনার মানুষকেই অপমান। তাই গায়ে লাগছে বেশি করে।

শেষে বলতে চাই, সুলতানা আপা কিন্তু একা নন, আমরা হাজার হাজার আছি তার সাথে। কাজেই জেলে যেতে হলে আমরা সবাই যাবো। এরকম পুষি ক্যাট মার্কা হুমকি-ধমকি দিয়ে আমাদের কণ্ঠরোধ করা যাবে না। বরং আরও শতগুণ হয়ে সেই কণ্ঠ ছড়িয়ে পড়বে সবখানে।

বলে রাখছি, সময় থাকতে এখনই লাগাম টানা হোক পোষ্যদের। নইলে যে ফ্রাংকেনস্টাইন গড়ে তোলা হয়েছে, এরাই কাল হয়ে দাঁড়াবে। পুরো বাংলাদেশ তথা বাঙালীর তখন অপমৃত্যু হবে।

লেখাটি ভাল লাগলে শেয়ার করুন:
  •  
  •  
  •  
  • 8
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    8
    Shares

লেখাটি ২,৮১৭ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.