নারীস্থান বা পুরুষ স্থান নয়, চাই মানবস্থান

0

উপমা মাহবুব:

আমার শিক্ষাজীবন শুরু হয়েছে সহশিক্ষা প্রতিষ্ঠান দিয়ে সেই কারণে নাকি বইপোকা হওয়ার কারণে জানি না, ছোটকাল থেকেই আমি খুব সচেতন ছিলাম আমাকে যেন কেউমেয়েবলে মনে না করে আমার মনে হতো কান্না করা যাবে না, কাঁদলে সবাই দূর্বল মনের ভাববে অনেক সাজা যাবে না, সাজগোজ করিয়ে মেয়েদের পুতুল বানিয়ে রাখা হয় পরিবার থেকেও চাইতো আমি আত্মবিশ্বাসী হই

আম্মু বলতো,তুমি বড় বড় সভায় বক্তৃতা দেবে, মানুষ মুগ্ধ হয়ে শুনবে আরো বলতএমন চাকরি করবে যেন বাসার কাজ করার জন্য প্রয়োজনীয় সংখ্যক সহকারি রাখার আর্থিক সক্ষমতা থাকে আব্বুও কম যায় না যখন বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ি, হলে থাকি, মাঝে মাঝে মনে করিয়ে দিতেনতোমাকে যে স্বাধীনতা দেয়া হয়েছে সেই পরিমাণ স্বাধীনতা বাংলাদেশে খুবই কম সংখ্যক মেয়ে পেয়েছে, সুতরাং স্বাধীনতার অপব্যবহার করো নাএরকম একটা পরিবেশে বড় হবার কারণেই সম্ভবত নিজেকে আমার জন্মগতভাবে নারীবাদি বলে মনে হয়

কিন্তু আমার নারীবাদ অন্য সবার নারীবাদের সঙ্গে ঠিক মিলতে চায় না আমার নারীবাদ বলে যে, নারীরা ক্ষমতায়িত হলে, নারীপুরুষের সমতা প্রতিষ্ঠিত হলে পৃথিবীটা খুব সুন্দর আর শান্তিময় হবে, বিষয়টা মোটেও সে রকম নয় কেননা লক্ষ্মী, বাধ্যগত, সহজসরল, লাবণ্যময়, কলুষমুক্তএরকম বহু বিশেষণ যেগুলো আমরা নারীর বৈশিষ্ট্য হিসেবে চিহ্নিত করি, সেগুলো আসলে সমাজের সৃষ্টি

নারীও মানুষ, তার মনেও হিংসাবিদ্বেষদুঃখকষ্ট আছে তাই মুক্তি পেলে সবাই নিশ্চয়ভাল মেয়েথাকবে না, অনেকেই আর আটদশটা পুরুষের মতো অন্যায় করবে, অপরাধে জড়াবে আবার কট্টর নারীবাদীদের মতো আমি বিষয়েও একমত হতে পারি না যে, পুরুষ মানেই মন্দ পুরুষকে শত্রু বানিয়ে ক্রমাগত বকাবকি করে যে নারীবাদ, সেই নারীবাদের আমি ঘোরবিরোধী

আমার মতে, নারীর পিছিয়ে থাকার পেছনে তার নিজের ভূমিকাও কম নয় আবার নারীর এগিয়ে চলার পেছনেও থাকতে পারে বাবাস্বামী, পুত্রসন্তান, পুরুষ বন্ধু, পুরুষ সহকর্মী এরকম অনেক পুরুষের ভূমিকা ঠিক যেমন বেগম রোকেয়ার নারী মুক্তির পথিকৃত হয়ে উঠার পেছনে তার স্বামী অনেক বড় ভূমিকা পালন করেছিলেন

তাহলে আমি কেমন সমাজ দেখতে চাই?

আমি চাই এমন একটা সমাজ হবে যেখানে মা শুধু মমতাময়ী, সকল দায়িত্ব পালনকারি, সর্বংসহা মা হবেন না, সেখানে বাবাও মমতাময়ী, সকল দায়িত্বপালনকারী, সর্বংসহা বাবা হবেন আমি এমন একটা সমাজ দেখতে চাই যেখানে নারীদের মধ্যেও পুরুষের সাহসিকতা, শক্তি, ঔদ্ধত্ব থাকবে তারাও অ্যাডভেঞ্চার ভালবাসবে বন্ধুদের সঙ্গে সময় কাটানোর ইচ্ছা হলে স্বামী বা ছেলে বন্ধুর দায়িত্বে সন্তানদের রেখে নিশ্চিন্ত মনে চলে যাবে সেই সমাজে নারীরা কোন অন্যায়ে জড়ালে কেউ চোখ বড় বড় করে বলবে না, ‘ একটা মেয়ে হয়ে এরকম কাজ করতে পারল?’

রাষ্ট্রব্যবস্থা সেই নারীদেরও বিচার করবে, শাস্তি দিবে, ঠিক যেভাবে একজন পুরুষকে দেয়া হবে আমার স্বপ্নের সমাজে পুরুষরা শুধু শক্তির জোরে শ্রেষ্ঠত্ব জারি করবে না তারাও নারীর মতো মমতাময় হবে, কোমল হবে, সংঘাতের বদলে বেছে নেবে শান্তিকেই, ছোট শিশু ব্যাথা পেলে তাদের চোখও পানিতে ভরবে অর্থাৎ আমার আদর্শ সমাজে নারী চরিত্র এবং পুরুষ চরিত্র বলে কিছু থাকবে না কেউ নির্ধারণ করে দেবে না কোনটি নারীর বৈশিষ্ট্য আর কোনটি পুরুষের বৈশিষ্ট্য এই সমাজে সবার একটাই চরিত্র হবে, আর সেটা হলো মানব চরিত্র

মানুষের ভালমন্দ যত গুণ, দুঃখকষ্টআনন্দবেদনাহিংসাবিদ্বেষের যত অনুভূতি তার সবটাই আমি প্রতিটি মানুষের মধ্যে দেখতে চাই এখানে কোন নারীপুরুষ ভেদাভেদ থাকবে না আর আমার দৃঢ় বিশ্বাস যে সমাজে সবাই মানবিক বৈশিষ্ট্যের অধিকারি হবে, সেই সমাজে নারী পুরুষের বিভেদ, দুর্বলের উপর সবলের অত্যাচার সবকিছুর মাত্রাই কমে যাবে কেননা প্রত্যেকেই প্রত্যেকের অনুভূতিগুলোকে উপলব্ধি করতে পারবে

যেদিন পুরুষ নারীর অনুভূতি বুঝতে পারবে আর নারী বুঝতে শিখবে পুরুষকে, ঠিক সেদিন থেকেই আমরা সবাই নারীবাদি আর পুরুষবাদির দল ছেড়ে একসঙ্গে মানবতাবাদি হয়ে উঠবো তাই আমি কোন নারীস্থান বা পুরুষস্থান চাই না জীবন একটাই, আর সেটা মানুষের সঙ্গে মানুষের মতো করে উপভোগ করতে বড় সাধ জাগে

উন্নয়ন কর্মী এবং কলাম লেখক

লেখাটি ভাল লাগলে শেয়ার করুন:
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

লেখাটি ১,২১৮ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.