দেশপ্রেম কি কমে যাচ্ছে?

মালবিকা লাবণি শীলা:

কয়েকবছর আগে পঁচিশে মার্চ রাতে বাইরে হঠাৎ “আমার সোনার বাংলা” গানটা শুনে আমার হাত থেকে বই পড়ে গিয়েছিলো। চমকে বা ভয় পেয়ে নয়। জাতীয় সংগীতের সাথে এমন এক বোধ জড়িয়ে আমরা বড় হয়েছি যে, এটা শুনলেই এর বাউল সুরের সাথে সাথে মনটা কোন এক গ্রামের বটের মূলে নদীর কূলে চলে যায়। জাতীয় সংগীত আমি গাইতে পারিনা, আমার চোখ পানিতে ভরে ওঠে, আমার স্বর রুদ্ধ হয়ে আসে।

দেশপ্রেমের পাঠ নিজের বাড়ি থেকে নিলেও আমাদের স্কুলগুলো এক বিরাট ভূমিকা রেখেছে। আজ যখন আমি আমার স্বাধীন দেশে পাকিপ্রেমিদের আস্ফালন দেখি, এর কারণ হিসেবে আমার মনে হয় এদের মধ্যে দেশপ্রেমের খুবই অভাব। এই দেশে থেকে, বড় হয়ে- দেশপ্রেমের অভাব কিভাবে হয়? খুব অদ্ভুত ব্যাপার তাই না?

পঁচাত্তর সালে বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যার পর থেকেই এই চক্রান্ত মূর্ত হয়ে ওঠে। আসলে সামরিক দুই শাসকের হাত ধরে একাত্তরের পরাজিত শক্তি গুটিগুটি পায়ে এগোতে থাকে। খুব কৌশলে এরা কয়েকবছর আগের মুক্তিকামী উদ্দাম মানুষকে বাধ্য করতে থাকে ইতিহাস ভুলে যেতে। পঁচাত্তরে যে শিশু ছিলো আজ সে পিতা। তার বাবা যদি স্বাধীনতার বিপক্ষের লোক হয়, তার সন্তান কিভাবে দেশপ্রেম নিয়ে বড় হবে?

সাথে যোগ হয়েছে পাঠ্যপুস্তকের মুসলমানিকরণ। ইসলামি শিক্ষার নামে হাজার হাজার শিক্ষাকেন্দ্রের লাখ লাখ শিক্ষার্থী জাতীয় সংগীত অথবা দেশের স্বাধীনতা সার্বভৌমত্ব রক্ষার শপথ ছাড়াই বেড়ে উঠছে। এদের শেখানো হচ্ছে জাতীয় সংগীতের রচয়িতা একজন হিন্দু। নিজেদের ধর্মকে শ্রেষ্ঠ ভেবে বড় হওয়া এই প্রজন্মের কাছ থেকে কিছু আশা করা যায় কি? অথচ ছাত্রসমাজই বাহান্ন, ঊনসত্তর, একাত্তর, নব্বইয়ের আন্দোলনের ডাক দিয়েছে, সামনে থেকেছে, এবং সোচ্চার হয়েছে যে কোনো অন্যায়ের বিরুদ্ধে।

আমরা দেখে এসেছি শুধু জামায়াত শিবির ছাড়া অন্য সব ডান বামপন্থীদলকে একসাথে ছাত্র রাজনীতি করতে। আজ চরম হতাশা নিয়ে দেখতে হয়, ক্ষমতাসীন দলের ছেলেরা বামপন্থীদের সরাসরি পেটানোর হুমকি দেয়! তাদের উস্কানি দিয়ে যায় পার্লামেন্ট মেম্বার! মনে হয় দেশ নিয়ে এদের কোনো চিন্তা নেই! এই কাদা ছোঁড়াছুঁড়িতে তৃতীয় পক্ষ যে লাভবান হচ্ছে সে খেয়ালই এদের নেই!

সরকারের প্রত্যক্ষ হস্তক্ষেপে একটা শিক্ষানীতি করলে হয়তো এখনোও সেই খামতি পূরণ করা সম্ভব। এই প্রজন্মকে সেক্যুলার আর উদার মানসিকতার শিক্ষা না দিলে দেশের সমস্ত অগ্রগতিই ব্যর্থ হয়ে যাবে। এই বাংলা ভাষার জন্যে লড়াই হয়েছে, এই দেশকে স্বাধীন করতে যুদ্ধ করতে হয়েছে। লক্ষ শহীদের রক্তে স্বাধীন এই দেশকে কি পিছিয়ে যেতে দেয়া যায়, না উচিত?

শেয়ার করুন:
  • 99
  •  
  •  
  •  
  •  
    99
    Shares
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.