শুধু একটু সাহস আর আত্মসম্মানবোধ প্রয়োজন

রুনা নাছরীন:

পরস্পরের প্রতি ভালো লাগা এবং শ্রদ্ধাবোধ যতদিন থাকে, ততদিন একত্রে বসবাস বা অবস্থান হওয়া উচি – কথাটা কঠিন হলেও এর একটা ভালো দিক হচ্ছে, অসুন্দর বা চাপিয়ে দেওয়া বা মানিয়ে চলার মতো সম্পর্ক বাঁচিয়ে রাখার কোন দায়ভার থাকে না। ক্ষণে ক্ষণে মরার চেয়ে দূরে সরে যাবার কষ্টটা অনেক শ্রেয়।

বেশীরভাগ ক্ষেত্রেই মা-বাবা আত্মীয়-স্বজন দেখে-শুনে ছেলেমেয়ের বিয়ে ঠিক করে অথবা ছেলেমেয়েদের ভালো লাগা থেকেই বন্ধুত্ব হয়, তারপর একসাথে থাকার সিদ্ধান্ত। কিন্তু কিছু কিছু ক্ষেত্রে দেখা যায়, অনেক জানা অজানা ছোটো ছোটো কারণে একে-অপরের প্রতি বিদ্বেষ ভাবটা বাড়তে বাড়তে অসহ্য হয়ে পড়ে, এবং একসময় অসম্ভব হয়ে পড়ে এক ছাদের তলায় থাকাটা।

মানিয়ে নেয়া মানিয়ে চলার ব্যাপারটা সবার সমান না। সম্পর্কটা তলিয়ে যাবার আগেই সঠিক সিদ্ধান্ত খুব কম মানুষই নিতে পারে। শেষাবধি দেখার প্রবণতা বাঙ্গালি মেয়েদের মধ্যে বেশী। সত্যি কথা হচ্ছে যা হবার না, তা হয়ই না।

আসলে মেয়েরা একটা সংসার টিকিয়ে রাখার জন্য আপ্রাণ চেষ্টা করে, যতক্ষণ না পিঠ দেয়ালে না ঠেকে। এমনিতেই মেয়েদের মানিয়ে চলার শক্তি অসীম। ইচ্ছে করলেই অনেক কিছু করতে পারে আবার পরিবারের সম্মানের জন্য বিশাল ত্যাগ মেনে নিতে পারে। আর সন্তানের জন্য তো কথাই নেই। আর এই সুযোগটাই নেয় কিছু ভদ্রবেশী পুরুষ। পুরুষ না বলে কাপুরুষ বলাই ভালো। বিয়ের আগে একরূপ, আর পরে সম্পূর্ণ অন্য। সন্তান হবার পর তো সম্পূর্ণ ভিন্ন আরেক রূপ। ভাবখানা এমন তোমার আর কোথাও যাবার উপায় নেই, এই সংসারই তোমার আসল ঠিকানা, থাকলে থাকো, না থাকলে চলে যাও ইত্যাদি ইত্যাদিসবকিছুতেই নীরব জবাবদিহিতা তো আছেই । আশে পাশের ঘটনা প্রবাহ থেকে এগুলো কম-বেশী সবাই দেখি এবং জানি খুব কম মেয়েই পারে এইরকম পরিস্থিতির মোকাবেলা করতে। বিষাদে ধুঁকে ধুঁকে মরে, তবুও সংসারের মায়াডোর থেকে বের হয়ে আসতে পারে না।

আমার বাসায় একবেলা একটা মেয়ে এসে কাজ করে দেয়। ওর শীর্ণ দেহ আর মলিন মুখটা দেখলেই বোঝা যায়, ওর শত না বলা কথা। চুপচাপ এসে কাজ করে চলে যায়। আমিই মাঝে মাঝে টুকটাক কথা বলি। একদিন খেয়াল করলাম, ওর মুখটা বেশ থমথমে, ঝড় আসার আগে আকাশ যেমন বাচ্চা মেয়ের মতো কাঁদো কাঁদো চেহারা বানিয়ে রাখে, ঠিক তেমনি।  

জিজ্ঞেস করলাম, কীরে কী হয়েছে? এক কথায় উত্তর দিলো – কিছু না। একরাশ অভিমান। কাছে ডাকলাম, বল কী হয়েছে? কিছুক্ষণ চুপ করে দাঁড়ালো। হঠাৎ বলা শুরু করলো, অনেক সহ্য করেছি ম্যাডাম, আর না, জন্ম দিতে পারছি যখন খাওয়াতে-পড়াতেও পারুম। চার চারটা মাইয়া হইছে বইল্লা আমারে কম মার মারেনি সবাই মিল্লা, মাইয়ার বাপে মারছে, শাশুড়ি মারছে, সহ্য করছি। তাই বলে দেবরে গায়ে হাত তুলবো?  সেজন্য মাইয়া গো লইয়া ভায়ের পাশে চইল্লা আইছি। খাইয়া না খাইয়া এখন অনেক ভালো আছি, শান্তিতে আছি। বেশ কিছুক্ষণ একনাগাড়ে বলে থামলো।

একটু অবাক হলাম। সে আমার বাসায় কাজ নিয়েছে প্রায় ছয় মাস হলো এবং কাজের ফাঁকে ফাঁকে টুকটাক অনেক গল্প শুনেছিকখনো বাবার বাড়ির কখনো শশুর বাড়ির, সবই প্রশংসার সুরে। কখনই বুঝতে পারিনি তার এতো ক্ষোভ বাবা, ভাই, স্বামী এবং দেবরের প্রতি ওরা চার ভাই এবং তিন বোন। অন্য দুই বোনের ভালো গৃহস্থ ঘরে বিয়ে হয়েছে। ওর বিয়েটা হয়েছে হঠাৎ করেই। তখন ও ক্লাস এইটে পড়তো এবং পড়াশোনায় খুব আগ্রহী ছিল। সেদিন ছিল হাটবার, সন্ধ্যায় ওর বাবা একটা ছেলেকে নিয়ে হাজির এবং কোনো খোঁজ-খবর না নিয়ে সেই সন্ধ্যায় সেই ছেলের সাথে বিয়ে দিয়ে দিলো। ওর মা নাকি একটু আপত্তি করেছিল, কিন্তু ওর বাবার কথা, রাজপুত্রের মতো দেখতে এতো ভদ্র ছেলে কি মিথ্যা বলবে? শ্বশুরবাড়িতে গিয়ে দেখে বিয়ের আগে রাজপুত্র যা যা বলেছিল সবই মিথ্যা। থাকার বাড়ি ভিটাও নাই, চাষ আবাদের জমি তো দূরের কথা। বৌ নিয়ে তুলেছে চাচার বাড়ি।  

ফিরানির সময় এসে সে নাকি আর যেতে চায়নি, অনেক কান্নাকাটি করেছিল, কিন্তু বাবা-ভাইরা অনেক বুঝিয়ে তাকে আবার পাঠিয়ে দিয়েছেতাদের সম্মানের কথা চিন্তা করে ও নিজের ভাগ্য বলে মেনে নিয়েছে সব 

বিয়ের কিছুদিন পর ওকে ঢাকায় নিয়ে আসে, কারণ ওর শ্বশুর বাড়ির সবাই অনেক আগ থেকেই ঢাকার সদর ঘাট এলাকায় থাকতো। ওকে যে ঢাকায় থাকতে বা একেবারেই চলে আসতে হবে, তাও সে জানতো না। ওদের বাড়ি থেকে ওর বাবা ওকে দুই কাঠা জমি দিয়েছিল বাড়ি করে থাকার জন্য কিন্তু শাশুড়ি ননদের কুপরামর্শে এবং স্বামীর জোড়াজুড়িতে জমির বদলে বিশ হাজার টাকা এনে দেয় স্বামীকে ব্যবসা করার জন্যশাশুড়ি ননদ বাসাবাড়িতে কাজ করতো এবং ওকে কাজে ঢুকিয়ে দেয়। বাসাবাড়িতে কাজ করতে রাজি না হওয়ায় ওকে অনেক মারধোর করেছে এবং প্রথম প্রথম ওর বেতনের পুরো টাকাই নাকি শাশুড়ির হাতে দিতে হতো। তারপর বাবার বাড়ি থেকে চাল-ডাল এইটা-ওইটা নিয়ে আসা ছিল সারা বছরই। বাবা-মা বুড়ো হয়েছে, ভাইরা বিয়ে-শাদী করেছে, ভাইদের সংসারও বড় হয়েছে, আর কতো দিবে? সেই নিয়ে কম অশান্তি হতো না।

ছেলে ছেলে করে ওর ইচ্ছার বিরুদ্ধে চারটা মেয়ের মা হতে হয়েছে এবং এইটাও নাকি ওর দোষ। কথায় কথায় মারধোর ঝগড়াঝাঁটি লেগেই থাকতো। সবশেষ ছিল দেবরের ব্যবসার জন্য টাকা আনো। যুক্তি হচ্ছে দুই কাঠা জমির দাম কী মাত্র বিশ হাজার টাকা, বাকি টাকা নিয়ে আয়। এই নিয়ে ঝগড়াঝাঁটি এবং একপর্যায়ে শাশুড়ির সাথে সাথে দেবরও ওর গায়ে হাত তোলে। সেই অপমান সহ্য করতে না পেরেই মেয়েদেরকে নিয়ে ভাইয়ের কাছে চলে আসে এবং আর ফিরে যায়নি। স্বামী মাঝে মাঝে ফোন করে, মেয়েদের সাথে কথা বলে, কিন্তু কখনো ওদেরকে ফিরে যেতে বলে না এবং মা ভাইয়ের ভয়ে সেও রাজী হয় না বউ-বাচ্চার কাছে চলে আসতে

মেয়েটি আমার বাসাসহ তিনটা বাসায় ছুটা কাজ করে। একটা মেয়েকে নানা-নানীর কাছে পাঠিয়ে দিয়েছে এবং দেশে মাদ্রাসায়  ভর্তি করিয়েছে। এক ভাই সবজির ব্যবসা করে, আর এক ভাই করে মাছের ব্যবসা। ভাইদের কাছাকাছি আলাদা বাসা নিয়ে থাকে। ভাইরা যথাসম্ভব সাহায্য করে, সবজি মাছ কিনতে হয় না এবং বড় বোনরা চাল পাঠায় দেশ থেকে – এভাবে চলে যাচ্ছে। বড় মেয়েকে স্কুলে ভর্তি করিয়েছে এবং ছোট দুই মেয়ের বয়স আড়াই ও এক বছর। আসার পর থেকে অনেক কষ্ট করতে হয়েছে তাকে এবং এভাবে মোটামুটি এখন ভালই আছে। এতোদিন পর আজ নাকি ওর শাশুড়ি ফোন দিয়ে ফিরে যাবার জন্য বলছে এবং না হলে ছেলেকে আবার বিয়ে করাবে। শাশুড়িকে তার মতামত জানিয়ে দিয়েছে।

তার ফিরে না যাবার দৃঢ় মনোভাব দেখে ভীষণ ভালো লাগলো। কিছু কিছু ক্ষেত্রে শিক্ষিত মেয়েরা যা করতে ভয় পায়, তা একদম খেটে খাওয়া মেয়েকে করতে দেখে শ্রদ্ধায় অবনত হয়ে গেলো মন। তুমি পারবে মেয়ে, তুমি পারবে এ যুদ্ধে জয়ী হতে। খুব বেশী কিছু নয়, শুধু দরকার একটু সাহস আর আত্মসম্মানবোধ – যা তোমার আছে।    

শেয়ার করুন:
  • 398
  •  
  •  
  •  
  •  
    398
    Shares
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.