সংগঠিত হোন, পিঠ কি এখনো দেয়ালে ঠেকে যায়নি?

0

মলি জেনান:

অনেক দিন লিখি না।

আমার সমস্ত কষ্ট যন্ত্রণায়, যাপিত জীবনের অস্থিরতায় লেখা আমাকে শান্ত করে। আবারো বেঁচে থাকবার, এগিয়ে যাবার প্রেরণা দেয়। কিন্তু আজকাল নিজেকে এই মূল্যবোধহীন যাপিত জীবনের যন্ত্রণায় ছেড়ে দিয়েছি। লিখে কী হবে? একটা ধর্ষণ কমবে? একটা আত্মহত্যা? একটা খুন! একটা চাপাতির ধার কমবে? একজন সংখ্যালঘু, একজন আদিবাসি তাঁর স্বাধীনভাবে বাঁচার অধিকার পাবে? এই বিচারহীনতার সংস্কৃতিতে একজন ভিক্টিম কি তার সঠিক বিচার পাবে?

এসব কিছুই হবে না, কিচ্ছু না। তাই ভাবলেশহীনভাবে সংসার করি, গান শুনি, ক্রিকেট দেখি, যে সন্তান আমায় ছেড়ে গেছে তার সাথে গল্প করি, যে আসছে তার যত্ন নিই, খাই-ঘুমাই, নিজেকে বাঁচিয়ে রাখি।

কিন্তু গত দুইদিন ধরে একটা বিষয় আবার আমাকে চাবুক পেটা করছে, আবার আমাকে লিখতে বলছে; নিজেকে যাপিত জীবনের যন্ত্রণায় গা ভাসিয়ে দিয়ে ভালো রাখার চেষ্টা করা এই আমি আর ভালো থাকছি না। আবার কী বোর্ডে হাত রেখেছি।

একজন সাংসদের বক্তব্যের সমালোচনা করেছেন একজন লেখিকা (তাঁর আরো পরিচয় আছে, কিন্তু আমি তার লেখিকা পরিচয়টিকেই তুলে ধরলাম), তো সেই মহান সংসদের মহান সাংসদ(!) এই সমালোচনা সহ্য করতে পারেননি; আর পারবেনই বা কেন, আইন তার, ক্ষমতা তার, আর তার লম্বা লেজ ধরে লেজুরবৃত্তি করেন যারা সেই মহান সাঙ্গপাঙ্গরা তো আছেনই। সেই তাকে সমালোচনা করেন একজন সাধারণ লেখিকা! সে কোন ছার!

অথচ একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে একজন জনপ্রতিনিধির সমালোচনা হবে, তিনি তার কাজের জবাবদিহিতা করবেন, এটাই স্বাভাবিক হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু আমরা বাস করি ‘হীরক রাজার দেশে’!  

তো, দায়িত্বপূর্ণ পদে থাকা মহান সাংসদ সমালোচনা সহ্য না করতে পেরে সেই লেখিকার ফেসবুকের ব্যক্তিগত অ্যালবাম থেকে লেখিকার অনুমতি ছাড়া আই রিপিট, অনুমতি ছাড়া ছবি নিয়ে তার নিজের ওয়ালে নারীর জন্য অত্যন্ত অবমাননাকর পোস্ট দেন, আর তার সেই পোস্টে তার ও তার দলের সাঙ্গপাঙ্গরা ভার্চুয়ালি রেপের উৎসবে মেতেছে। এক্ষেত্রে ৫৭  ধারা কি হিমঘরে ঘুমাচ্ছে?

উল্লেখ্য, মাননীয় সাংসদও একজন নারী! তো তিনি নারী হয়ে আরেকজন নারীকে তার সাঙ্গপাঙ্গ দ্বারা ভার্চুয়ালি রেপের সুযোগ করে দিয়ে এবং রেপ হতে দেখে তিনি নিশ্চয় রেপিস্টদের পুরুষত্বের ক্ষমতায় আনন্দিত হয়ে সিজনাল রসালো ফল দিয়ে পরম তৃপ্তি সহকারে ইফতার করছেন! 

হে পরম দয়ালু ঈশ্বর, উনার রোজা কবুল কর! যাক, তিনি একজন আইনপ্রণেতা হয়ে একজন নারীর জন্য অত্যন্ত অবমাননাকর কাজটি করে আনন্দের সাথে সেহেরি ও ইফতার করতে থাকুন, আর আমরা দেখে আসি ছবি দুটো কি?

ছবি নম্বর-১: লেখিকা একটি স্লিভলেস পোষাক পরে আছেন। তো সেই স্লিভলেস পোষাক পরা লেখিকাকে দেখে নৌকার হেফাজতকারীদের/ মুজিব সৈনিকদের পৌরুষ চেতনা মাথায় উঠে গেছে, তারা ছবিটিকে ভার্চুয়ালি ধর্ষণের প্রতিযোগিতায় নেমেছেন, পারলে তো গ্যাং রেপ হয়। নিশ্চয় তাদের রাতের ঘুম হারাম হয়ে গেছে, নামায-রোযা ঠিকমতো হচ্ছে না। একটা স্লিভলেস জামার কী মহিমা!! যারা দিনের পর দিন আন্দোলন করছেন, বলে বলে গলা ফাটাচ্ছেন ধর্ষণের জন্য নারীর পোষাক নয়, দায়ী পুরুষের পুরুষতান্ত্রিক মানসিকতা, তারা আমাদের সাংসদের পোস্টটা দেখে আসুন, তাহলে সহজেই বুঝতে পারবেন কারা ধর্ষক আর কারা তাদের আশ্রয় প্রশ্রয়দাতা! বিচার কার কাছে চাইবেন পাঠক? সাবধান হোন সরষেতেই কিন্তু ভূত!!

ছবি নম্বর-২: এক সমুদ্র সৈকতে মা তার ২/৩ বছরের বাচ্চা নিয়ে হাঁটছেন। ছবিটা দেখা মাত্রই একটা স্নিগ্ধ সৌন্দর্যে আপনার মন ছুঁয়ে যাবে। আমাদের নারী সাংসদ সেখানে মাতৃত্ব দেখতে পাননি, কোনো স্নিগ্ধতা তাকে স্পর্শ করেনি, তিনি এবং তার সাঙ্গপাঙ্গরা এখানে ‘সানি লিওন’ খুঁজে পেয়েছেন। মা পরম মমতায় তার কন্যার মাথা স্পর্শ করে তার দিকে তাকিয়ে হাঁটছে, এটা তাদের দৃষ্টিগোচর হয়নি। কারণ তাদের চোখ চলে গেছে মায়ের সর্টস পরা পায়ের দিকে, আর যায় কোথায় বলুন, লোল তো ঝরবেই! এদের কাছে নিজের কন্যা/বোন কি নিরাপরাধ? 

পাঠক বুঝে নিন, একটা ধর্ষণেরও বিচার কেন হয় না এ দেশে? সচেতন হোন, কার কাছে বিচার চাইছেন?

সংগঠিত হোন, পিঠ কি এখনো দেয়ালে ঠেকে যায়নি?

লেখাটি ভাল লাগলে শেয়ার করুন:
  • 285
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    285
    Shares

লেখাটি ১,১১৬ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.