নারী, তুমি নারীর বন্ধু হও

0

সালমা লুনা:

বেশ কবছর আগে ছেলের এক ক্লাশমেটের মা স্কুলে দেখা হলে আমাকে বললেন, “শুয়োরের মতো মোটা হইছেন ক্যান?” আমি হাসবো নাকি কাঁদবোর ধাক্কায় আর গেলাম না। স্রেফ বোবা কালা হয়ে তার মুখপানে চেয়ে রইলাম। তিনি শিক্ষিত না অশিক্ষিত, তার মাথা ঠিক আছে না নাই- সেটিও অবান্তর। আমি চিন্তিত হলাম যে কারণে, তাহলো, তার দুটি সন্তান এই শহরেরই নামকরা দুটি স্কুল-কলেজে লেখাপড়া করছে। এবং এই ভদ্রমহিলা এদের প্রাথমিক এবং আমৃত্যু শিক্ষয়িত্রী – এই ভেবেই জান পানিশূন্য হয়ে গেলো আমার।

যাহোক, আমিও তো কোন সুন্দরীশ্রেষ্ঠা না যে আমাকে কেউ অসুন্দর বা মোটু বললে হৃদয় আমার ফানাফানা হবে।
আশৈশবই আমি গুল্লুগাল্লু। তারুণ্যে পাঁচ দশকের শুরুর ঘরে দৈহিক ওজন থাকলেও জনাকয়েক বন্ধুর মধ্য থেকে আমাকে আলাদা করতে লোকে “ঐ যে মোটা মেয়েটা” – এই বিশেষণেই অভিহিত করেছে বরাবর।

এ কি আমার আজন্মের পাপ নয়?

পাপ হোক আর পূণ্য, আমি কখনোই আমার গুল্লুগাল্লু শারীরিক অবয়ব নিয়ে দুঃখী নই। দুটো সন্তান ধারণকালে এবং প্রসব পরবর্তী নানা কারণে নিজের ওজন নিয়ন্ত্রণ তো দূর, ও নিয়ে ভাবনাও আনিনি মোটে।

উপরন্তু আমি খেতে ভালোবাসি।
চাইলেই শাকপাতা খেয়ে, হেঁটে- দৌড়ে, জিমের কসরত করে জিরো ফিগার বা নায়িকাসুলভ শারীরিক অবয়ব হয়তো করা যেতো, কিন্তু আমি ওতে খুব একটা উৎসাহী হইনি কখনোই। সুস্থ আছি, সৃষ্টিকর্তার অশেষ কৃপা।

তবে মিথ্যে বলবো না, ওই ভদ্রমহিলার মহান বাণী শ্রবণের পর নিজেকে একটু হেল্পলেস মনে হয়েছিলো। আফটার অল ওই বিশেষ প্রাণীটি কারই বা পছন্দ! ওই উপায়হীনতার দশা পর্যায়ে একদিন গেলাম শহরের নামকরা এক ডায়েটিশিয়ানের কাছে। উনার রমরমা বাজার ! নায়িকা গায়িকা মডেল আর সেলিব্রেটি নারীরা উনার রোগী!!
টাকার মায়ায় হোক, কিংবা বিশেষ প্রাণী হবার দুঃখে – একেবারে বেশ খানিকটা ওজন কমিয়ে ফেললাম।
সকলে ধন্য ধন্য করলো।

এরপরে অবশ্য ওই ভদ্রমহিলার সাথে দেখা হয়েছে – কিন্তু তিনি আর তখন আমার সাথে কথা বলার রুচি হারিয়ে ফেলেছেন ! 

একটা কথা না বললেই নয় ভদ্রমহিলা ভীষণ স্লিম এবং বেশ লম্বা। এজন্য একবার বলতে ইচ্ছা করেছিলো আপনি তো ভাই সাপের মতো চিকনা! বলিনি।
বলা সম্ভব ছিলো না আমার পক্ষে। আমার সাহস এবং রুচি কোনোটাই আপ-টু-দা মার্ক না।

অনেকদিন আগের কথা মনে পড়ার কারণ অবশ্যই আছে। ফেসবুকে একজন মাননীয়া জনপ্রতিনিধির এক নারী সাংবাদিকের চিত্র প্রদর্শনপূর্বক শারীরিক হেনস্থা দেখলাম সকাল সকাল। সেই থেকেই কথাটি মনে পড়ছে।

আমি বরাবরই বলে এসেছি নারীর যদি কোনো শত্রু থেকে থাকে, তবে প্রথম শত্রুই হচ্ছে নারী।
এমনকি সে নিজেও!
অন্য নারী নাহয় বোঝা যায়। নারী নিজে কীভাবে নিজের শত্রু হয় এ বড়ো দুঃখের অধ্যায়। বড় দুঃখ নিয়েই বলছি সেটি। কেন? তা পরে বলছি।

তবে সবচেয়ে ভয়াবহ হচ্ছে অন্য নারীর শত্রুতা। ঘরে বাইরে কর্মক্ষেত্রে সর্বত্রই ।
একথাটা যারা মানেন না বা স্বীকার করতে আগ্রহী নন, তারা বড় ভুল করেছেন, করছেন এবং করবেন।

সাধারণ নারীকে গোনায় না আনি। একজন সাধারণ ক্ষমতাবান নারীর সাথে একজন মহাক্ষমতাবান নারী যখন দ্বন্দে লিপ্ত হোন, তখন উনারাও খুব অবলীলায় তাদের শরীর, পোশাক, এসব নিয়ে আঘাত করে করে কথা বলেন। শুধু তাই নয় , মহাক্ষমতাবানের আবার বাহিনী থাকে, তারা কবর খুঁড়ে প্রেতাত্মার মতো বের করে আনে ব্যক্তি জীবন, কিছু ফটোগ্রাফ , পরকীয়া বিষয়ক কবিতা। তারাই খেতাব দেয় কে রাতের রানী, কে মক্ষীরানী।

খুব অবাক কাণ্ড ! নয় !!

নারী নারীর শত্রু বহুভাবেই হতে পারে। এ কেবল মধ্যবিত্তের বউ-শাশুড়ির দ্বন্দ্ব দিয়ে বোঝার চেষ্টা পুরোপুরি ভুল। যখন জনপ্রতিনিধির মতো গুরুত্বপূর্ণ এবং ক্ষমতাবান নারী অন্য নারীকে শারীরিক হেনস্থা করতে বা হতে দেখতে আগ্রহী হোন, তখন এই সত্যটি অস্বীকার করার কোনো উপায় আর থাকে না।

এরকম বহু … বহু আছে। বলে শেষ করার নয়।

আপনা মাসে হরিণা বৈরি – একথার মধ্যে সবচে বড় ভুল হলো হরিণার স্থলে অবশ্যই নারী হবে।

এই শরীর নিয়েই নারী নিজের শত্রু – এই হচ্ছে দুঃখময় সত্য ।

লেখাটি ভাল লাগলে শেয়ার করুন:
  • 470
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    470
    Shares

লেখাটি ২,৪৮৪ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.