অসাম্প্রদায়িক হতে শিক্ষা জরুরি না

0

আনন্দ কুটুম:

কলকাতা আমার বাসায় যে মাসী ঘরদোর গোছানোর কাজ করেন তিনি একজন মুসলিম অনুসারী। সংখ্যালঘু বলেই কি না, এমন অমায়িক মানুষ সারা ভারত তন্নতন্ন করে খুঁজলেও খুব বেশি পাওয়া যাবে না। যেমন তার উচ্চ ভদ্রতাবোধ, তেমনই তার রুচিবোধ। অসাম্প্রদায়িক তো বটেই।
অদ্ভুত কোন কারণে তিনি আমাকে খুব পছন্দ করেন।

মাসি মাথার চুল পড়ে যাচ্ছে,
-চিন্তা নাই বাপ, কাল মাথায় মেহেদী লাগিয়ে দেবো।
– মাসি শরীর খারাপ।
– দাঁড়াও থানকুনি পাতা বেটে বিকালে দিয়ে যাবো। খেয়ে নিও।
– মাসি, রোজ রোজ ক্যান্টিনের এই পচা খাবার ভালো লাগে না।
– আচ্ছা, আমি কাল বাড়ি থেকে তোমার জন্য রান্না করে আনবো। কী খাবে?

ষাটোর্ধ্ব এই মহিলার প্রথম কাজ হলো, আমার ঘরে ঢুকে আমার মাথায় শরীরে হাত বুলিয়ে বিড় বিড় করে কী যেনো বলা। অবশেষে শাড়ির আঁচলের তলায় হাত রেখে মোনাজাত করে (আমিন) বলে মুখ মোছা। হৃদয়ের এতো গভীর বিশ্বাস থেকে ‘আমিন’ বলতে এর আগে আমি কাউকে দেখিনি।

আমার নাম যেহেতু ‘আনন্দ’, সুতরাং তার ধারণা, ধর্মে আমি একজন হিন্দু। হোস্টেলে হিন্দুর সংখ্যাই বেশি। আমিও কখনওই তার এই ধারণা পরিবর্তন করার ইচ্ছা পোষণ করিনি। আমি ঠিক জানি না, কোন বিশ্বাস থেকে এই মহিলা রোজ একজন হিন্দু ছেলের জন্য আল্লাহ্‌র দরবারে প্রার্থনা করেন। আর আদৌ আল্লাহ্‌ সেই প্রার্থনার কতোটুকু কবুল করে!

গেলো পুজায় বাড়ি যাইনি বলে তিনি অষ্টমীর দিনে লুচি, লাবড়া বানিয়ে দিয়ে গেলেন।
– বাড়ি গেলে মা কতকিছু বানিয়ে খাওয়াতো। বাড়ি যাওয়া উচিত ছিলো বাবা।
আবার গত বছর শবে বরাতে বললাম, মাসি, গোমাংস খাবো। তিনি খুব স্বাভাবিক ভঙ্গিমায়, এক টিফিন ভরে গোমাংস, রুটি, হালুয়া দিয়ে গেলো।

মাসীকে দেখলে আমার কেমন যেনো মাদার তেরেসার মতো মনে হয়। যৌবনের প্রথম ভাগে স্বামী মারা গেছে। এর পরে এতোটা বছর একা কাটিয়ে দিয়েছেন। পড়ালেখা বলতে ঐ মক্তবের আরবি শিক্ষাই। তার পরেও কোন লোভ নেই, লালসা নেই, অহংকার নেই। সেই সাথে নেই কোনো অভিযোগ।
আমার মাঝে মাঝেই মনে হয়, আল্লাহ্‌ ভুল করে সম্ভবত দুই-একটা ভালো মানুষ বানিয়ে ফেলেছেন। মাসী তার মাঝে একটা।

আমার পাশের রুমের এক ছেলের ছোট একটা গণেশ ঠাকুর আছে। পূজো করে সে, কিন্তু সেই গণেশ পরিষ্কার করার কাজটি করেন মাসী নিজ হাতে। কোন সংকোচ নেই। অবাক লাগে ভেবে একজন ধর্মপ্রাণ মুসলিম যিনি কখনওই আধুনিক শিক্ষা গ্রহণ করেননি, তিনি কী করে এতো আধুনিক হতে পারেন? আর যারা দেশ-বিদেশের ইসলামিক ডিগ্রী নিয়ে এসে এদেশে ধর্ম প্রচারের ব্যবসা শুরু করেছে, তারা এতো মধ্যযুগীয় কেন??

অসাম্প্রদায়িকতার এক জ্বলন্ত উদাহরণ এই বৃদ্ধা। আরেকটা বিষয় লক্ষ্য করলাম, বাংলাদেশের মুসলিমরা যতোটা অভদ্র, হিন্দুরা ঠিক ততোটাই ভদ্র। নির্ঝঞ্ঝাট। অনুরূপভাবে কলকাতার হিন্দুদের থেকে কলকাতার বাঙ্গালি মুসলিমরা অধিকতর ভদ্র। 

লেখাটি ৩১৬ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

RFL
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.