হাওরের নারীদের পরিবর্তনে প্রযুক্তি

0

খুজিস্থা বেগম জোনাকী: 

ভাঙ্গনের সাথে লড়াই করে বাঁচা নারী, নিকলী উপজেলার ছাতিরচর ইউনিয়নের নারী আড্ডা দলের সভানেতা আইরিন আক্তার। তিনিও ফেসবুকের নোটিফিকেশন দেখেন, ছবি আপলোড করেন। সফলতার গল্প তুলে ধরেন।

ক্ষুদ্র উদ্যোগে স্বাবলম্বী হবার জীবন এখন তার এবং তার মতোই অনেকেরেই। এই গ্রামের অনেকই প্রায় প্রতি বছর বর্ষার আফালের সাথে যুদ্ধ করে বাঁচে। স্বপ্ন বোনে। এই স্বপ্ন একার নয়, সমষ্টিগত। এই যুদ্ধ জয়ের লক্ষ্যে আন্তর্জাতিক দাতা সংস্থা অক্সফামের সহযোগিতায় ২০১০ সালে কিশোরগঞ্জ জেলার নিকলী ও মিঠামইন উপজেলায় উন্নয়নমূলক কাজ শুরু করে।

নিকলী উপজেলায় ১৯টি সিবিও সংগঠনের মাধ্যমে এলাকার নানা উন্নয়নমূলক কাজ করেছে।
পপি রি-কল প্রকল্পের আড্ডা দলের নারীরা দাতা সংস্থার কারিগরি সহযোগিতার বাইরেও পেয়েছে আর্থিক সহযোগিতা। পেয়েছে নানা ধরনের প্রশিক্ষণ। পরিস্কার পরিচ্ছন্নতা, স্বাস্থ্য সচেতনতা, শিক্ষার গুরুত্ব, দুর্যোগ মোকাবেলা, বাল্য বিবাহের কুফল কিংবা নারীর প্রতি সহিংসতা প্রতিরোধে নারী-পুরুষের সম্মানজনক পরিবার গঠন।

গত সাত বছরের প্রকল্প চলাকালে দল গঠন করার প্রক্রিয়ায় তারা জেনেছে কিভাবে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় ক্ষমতাবদলের জন্য সভা করা হয় এবং গড়ে উঠেছেে নেতৃত্ব বিকাশের চর্চ্চা। পাশে থেকেছে পরস্পরের। কী রোগ, কী দুর্যোগ, কী আপদ, কী বিপদ, এসবকিছুতেই তাদের বন্ধন হয়েছে দৃঢ় এবং মধুর।

আর এসব কাহিনী নিয়মিত তুলে ধরেছে ফেসবুক পেজে। অন্য অনেকের লাইক-কমেন্টে যেমন নিজেরা পেয়েছে উৎসাহ, অপরের মাঝেও তৈরি করেছে উদাহরণ।
আইরিনের মতো এখন অনেকেই খুঁজে পেয়েছে দুর্যোগ মোকাবেলার প্রশিক্ষণ। অন্য বন্ধুদের কাছ থেকে বিভিন্ন স্ট্যাটাসের মাধ্যমে পেয়েছে অনেক পর্রিতনের কথা, আগাম আবহাওয়ার বার্তা এবং করণীয়।

তাই দাতা সংস্থার প্রকল্প ফেজ আউট হওয়ার পরও তাদের আত্মবিশ্বাস অটুট। নিজেদের অসহায় ভাবে না।
এই ফেসবুকের বন্ধু প্রশাসনের অনেকেই। মাঝে মাঝে পরামর্শ পায় কমেন্টেসে। তখন তাদের উৎসাহ আরো বেড়ে যায়। মাঝে মাঝে চ্যাটিং করে জানতে পারে বিভিন্ন সমস্যার সমাধানও।

নারী আড্ডা দলের অন্য নারীরা ফেসবুকে তাদের ছবি দেখে উল্লসিত হয়। এটাকে তিনি সাংবাদিকতার মতো মনে করেন। প্রত্যন্ত গ্রামের মানুষ হয়েও ছবি তোলার ট্যাব পাওয়া এবং এর মাধ্যমে খবর তুলে রাখার মধ্য দিয়ে নিজেকে সাংবাদিক সাংবাদিক লাগে তাদের। তাছাড়া নানান জনের সাথে সংযুক্ত হওয়া, তাৎক্ষণিকভাবে প্রতিক্রিয়া পাওয়া, এসবই অবিশ্বাস্য ছিল কিছুদিন আগেও।  কিন্তু প্রযুক্তি শহুরে মানুষের মতো এই গ্রামীণ জনপদের মানুষগুলোকেও গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছে। 

কথা বলছিলাম এ প্রকল্পের সমন্বয়কারী মোশাররফ হোসেন খানের সাথে। তিনি বলেন, প্রযুক্তি ব্যবহারে তাদের আরো প্রশিক্ষণ দরকার, তাহলে আরো অনেক তথ্য পেয়ে তাদের ব্যক্তিগত উন্নয়ন ঘটাতে পারতো। তবে মাত্র দুদিনের প্রশিক্ষণেও তারা অনেক ভালো করেছে। যোগাযোগও বেড়েছে। বিভিন্ন দিবস পালন করেছে, তার ছবি তুলে আপলোড করেছে। শিশুদলের প্রতিযোগিতা, পুরস্কার প্রদান, আলোচনা সভা কিংবা প্রশিক্ষণের মতামত তুলে ধরেছে। এসবই ইতিবাচক। সেগুলো চালিয়ে যাবার পরামর্শ দেন তিনি।

তিনি বলেন এ প্রকল্প প্রান্তিক মানুষের জন্য যে সুযোগ তৈরি করে দিয়েছে, তা ধরে রাখতে হবে।
আশার আলো উন্নয়ন সমিতির শিশুদলের নিয়মিত সাপ লুডু খেলার আয়োজন করা হয়। মূলত খেলার মাধ্যমে স্বাস্থ্য অভ্যাস পরিবর্তনের কথা জানানো হয়। নিয়মিত তার ছবি তোলা ও আপলোড করার মধ্য দিয়ে অনেকের মাঝে তা ছড়িয়ে দিয়েছে।

গত সাত মাসে তাদের খুব বেশি ফেসবুক বন্ধু হয়নি, তবে যারাই আছে, তাদের বিভিন্ন সময়ের কাজের, ভ্রমণের কিংবা ব্যক্তিগত সুখদুঃখের ছবি দেখে অনেক কিছু জানতে পারে। আইরিন বলেন, সেদিন অক্সফ্যাম থেকে গভীর নলকূপ বসানোর জন্য একজন প্রকৌশলী এসেছিলেন, তার কাজ ও নলকূপ স্থাপনের ছবি তুলে ফেসবুকে দিয়েছি।
ভ্যালুচেইন বিষয়ক প্রশিক্ষণ দিয়েছেন উপজেলার প্রাণী সম্পদ র্কমর্কতা, তা নিয়ে স্ট্যাটাস দিয়েছি।
কৃষিক্ষেতে চাষীরা কীভাবে ধান রোপন করে, নিড়ানি দেয় কিংবা হাওর থেকে ধান আনতে এখন অনেকেই মোটর সাইকেল ব্যবহার করে, ট্রাক্টর ব্যবহার করে তাও তুলে ধরেছি। অন্যান্য জেলার আপারা লাইক দিছে। তার মানে তারা আমার এই কাজটাকে পছন্দ করেছে। এটাও ভালো লাগে।

শাপলা বহুমুখি উন্নয়ন সংগঠনের নারী এককালীন বারো হাজার টাকা ও সেলাই প্রশিক্ষণ পেয়েছিল প্রকল্প থেকে, বর্তমানে তারা শাড়িতে চুমকির কাজ করে সফল। সে সফলতার কথাও ফেসবুকে দিয়েছে। গ্রামীণ নারীদের জীবনযাত্রার মান বেড়েছে, যা ফেসবুকের মাধ্যমে সবার মাঝে তুলে ধরেছে, অনেকেরই আগ্রহ বেড়েছে। এছাড়াও স্বপ্নের সিঁড়ি সমিতির বার্ষিক সাধারণ সেবা, কর্ম পরিকল্পনা কিংবা বাজেট প্রণয়নের ছবি দিয়েছে।

কথা বলছিলাম এ প্রকল্পের জন্য বিভিন্ন সময় অতিথি হয়েছিলেন যে উপজেলা মহিলা বিষয়ক র্কমর্কতা, তার সাথে। তিনি বলেন, এ প্রকল্প যেভাবে নারীর জীবন, চেতনা বদলে দেবার জন্য কাজ করেছে, তা সত্যিই প্রশংসনীয়। তাদের কর্ম এলাকার অনেক নারীর কথা বলা, সিদ্ধান্ত গ্রহণ কিংবা তথ্য যোগাযোগের সাথেও পরিচিত। তারা স্ট্যাটাস দেয়, ছবি তুলে, সভায় কথা বলে। নারীর প্রতি সহিংসতা হলে রুখে দাঁড়ায়, কখনো আমার সহযোগিতা নেয়। গ্রামের নারী হয়ে উপজেলার উন্নয়নমূলক সভায় অংশ নেয়া, কথা বলা, পরামর্শ চাওয়া, সবই সম্ভব হয়েছে রিকল প্রকল্পের জন্য। তারা সমিতি নিবন্ধনের কথাও বলেছে। নারীরা এখন প্রায় সবাই মোবাইল ফোন ব্যবহার করছে। ট্যাবে ছবি তুলছে, এসব অবশ্যই ইতিবাচক। সেগুলো চালিয়ে যাবার পরামর্শ দেন তিনি।

এ প্রকল্প প্রান্তিক মানুষের জন্য যে সুযোগ তৈরি করে দিয়েছে, তা ধরে রাখার জন্য পরবর্তীতে যা সহযোগিতা লাগবে তাতে তিনি পাশে থাকবেন বলে জানান।
এ প্রকল্পের আওতায় কিশোরগঞ্জ জেলার দুটি উপজেলার প্রান্তিক নারীদের প্রযুক্তি ব্যবহারের নারী আড্ডা দলের নারীরা এগিয়ে যাচ্ছে।

লেখাটি ৫০৩ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

RFL
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.