আপনি কি আপনার সন্তানের একজন ভালো বন্ধু? 

0
তামান্না ইসলাম:
মানুষের জীবনে ভালো বন্ধুর গুরুত্ব এবং প্রয়োজন অপরিহার্য। ভালো বন্ধু মানে বিশ্বস্ত বন্ধু, যে বন্ধু আপনার ভালো চাইবে সব সময়, যে মানুষ হিসাবে ভালো, চতুর না হলেও বুদ্ধিমান এবং সর্বোপরি আপনি যার সাথে অকপট হতে পারেন, যে আপনাকে বিচার করবে না এবং যার আপনার প্রতি সহানুভূতি আছে।
আমরা সেই বন্ধুকেই সবচেয়ে বেশি চাই যে আমাদের সুখে-দুঃখে, বিপদে আমাদের পাশে থাকবে, আমাদের ভুল, অপরাধ ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিতে দেখতে পারবে, আমাদেরকে ছোটো করবে না, ঘৃণা করবে না। এরকম বন্ধু পাওয়া ভাগ্যের ব্যাপার। মানুষের পরিণত বয়সে যেমন বন্ধু প্রয়োজন, শৈশবে এবং কৈশোরে তেমনি বন্ধুর প্রয়োজন, বরং সে সময় প্রয়োজনটা আরও অনেক বেশি। এর মূল কারণ শিশু কিশোরদের মস্তিষ্ক, বুদ্ধি পরিণত না, অভিজ্ঞতা কম। তারা প্রতিদিনই নতুন জিনিস শিখছে, নতুন অভিজ্ঞতার সম্মুখীন হচ্ছে। কোনটা ভালো, কোনটা মন্দ এটা বুঝে ওঠার মতো পরিপক্বতা তাদের তখনো গড়ে ওঠে না। দ্বিধা-দ্বন্দ্বের আর নিত্য নতুন অভিজ্ঞতা অর্জনের এই সময়টিতে তাদের এমন একজন মানুষ দরকার যাকে ভয় না পেয়ে, নিঃসঙ্কোচে সে মন খুলে কথা বলতে পারে, তার অনুভূতি, চিন্তা, দুশ্চিন্তা, প্রশ্ন সবই বলতে পারে। তাকে যেন একবারও ভাবতে না হয়, একথা বললে আমাকে কেউ খারাপ ভাববে।
বাচ্চারা যতো ছোটই হোক না কেন, মা-বাবার প্রতি তাদের একটা অদৃশ্য ভালোবাসার টান ঠিকই থাকে। তারা কিন্তু সহজে মা-বাবাকে কষ্ট দিতে চায় না। কিন্তু তাদের অভিজ্ঞতা যদি এমন হয়, এই কথা বললে, বা এই ঘটনা জানলে আমার মা-বাবা কষ্ট পেতে পারে, তখনই তারা লুকোতে শুরু করে। তারা ভুল বন্ধু খুঁজতে থাকে এবং অনেক সময়ই খারাপ বন্ধুর পাল্লায় পড়তে পারে, যার পরিণতি ভবিষ্যতে ভয়ানক হতে পারে।
তাই ভেবে দেখুন, এই অনেক সমস্যাকেই আপনি হয়তো এড়াতে পারেন, যদি আপনি নিজেই আপনার সন্তানের সাথে গভীর বন্ধুত্ব তৈরি করতে পারেন। এই কাজটি সবসময় খুব সহজও নয়। নিজের সন্তান হলেই তার সাথে ব্যক্তিত্ব পুরোপুরি মিলে যাবে, তেমনটা নাও হতে পারে। উপরন্তু জেনারেশন গ্যাপ জিনিসটা একটি ধ্রুব সত্য। আপনার আর আপনার সন্তানের বেড়ে ওঠার সময়, যুগ, পরিবেশ সম্পূর্ণ আলাদা। তাই পছন্দ না হলেও তাদেরকে তাদের মত প্রকাশের এবং অনুভূতি জানানোর সুযোগ দিতে হবে, তাদের সাথে ঠাণ্ডা মাথায় যুক্তি দিয়ে, আদর দিয়ে কথা বলতে হবে। অনেক সময় তাদের পাল্টা যুক্তিতে আপনি অবাক হবেন। তাদের চোখ দিয়ে তাদের জগতটা দেখার চেষ্টা করুন, অনেক কিছুই তখন সহজ হয়ে যাবে।
আগে যৌথ পরিবারগুলোতে বাবা-মা না হলেও চাচা, খালা কেউ না কেউ শিশুদের একজন কাছের মানুষ হতো। বর্তমান নিউক্লিয়ার পরিবারে, যান্ত্রিক জীবনে সে সুযোগ খুব কম। বিশেষ করে বিদেশে বেড়ে ওঠা শিশুদের এক বাবা-মা ছাড়া আসলেই আর কেউ নেই।
বাবা, মায়ের সাথে সন্তানদের দূরত্ব তৈরি হওয়ার একটা বড় কারণ হলো তাদের উপরে চাপিয়ে দেওয়া মাত্রাতিরিক্ত প্রত্যাশা। ছোট শিশুগুলোর শৈশব ছিনিয়ে নিয়ে ছোটবেলা থেকেই তাদেরকে এক ইঁদুর দৌড়ে ঢুকিয়ে দেওয়া হয়। পরীক্ষায় প্রথম হতে হবে, নাচ, গান, বিতর্ক সব জানতে হবে, এ এক অসম্ভব অপূরণীয় প্রত্যাশা। বাবা, মায়ের এই আশা পূরণ করতে না পেরে বাচ্চাগুলো ছোটবেলা থেকেই হতাশ, পরাজিত। কোন রকম উৎসাহ, প্রশংসা ছাড়া কীভাবে তাদের পক্ষে আগানো সম্ভব?
নিজের একটা গল্প বলি। আমার বাবা সরকারী কর্মকর্তা, মা কলেজের শিক্ষক। খুবই মধ্যবিত্ত পরিবার। ছোটবেলা থেকেই আমি নিজেই পড়ালেখায় খুব সিরিয়াস ছিলাম। কোনো কারণে কোনো পরীক্ষায় এক নম্বর কম পেলেও কেঁদে বুক ভাসাতাম। আর আমার বাবা, মায়ের একমাত্র কাজ ছিল আমাকে বোঝানো যে নম্বর কম পেলে কিছু হবে না, আর আমাকে উৎসাহ দেওয়া। তাঁরা আমাকে জীবনে একটিবারের জন্য কখনো বলেননি যে, আমাকে পরীক্ষায় এই ফলাফল করতে হবে।
আমি ঢাকার অগ্রণী বালিকা বিদ্যালয়ে পড়তাম। আমার আগের ব্যাচ পর্যন্ত ওই স্কুল থেকে স্ট্যান্ড করতো প্রতিবছর, মেয়েদের মধ্যে প্রথমও হতো প্রায় প্রতি বছরই। আমার সময় কেমন করে যেন রটে গেল, এইবার শুধু মেয়েদের মধ্যে না, সম্মিলিত মেধা তালিকায় স্কুলের নাম থাকবে প্রথমদিকে। সবাইকে হতাশ করে দিয়ে আমি (বরাবরই ফার্স্ট গার্ল ছিলাম) স্ট্যান্ড করি নাই, সম্মিলিত তো দূরের কথা, মেয়েদের মধ্যেও না। আমাদের প্রধান শিক্ষিকা সেদিন সবার সামনে কেঁদেছেন। স্কুলে মনে হলো আঁধার নেমে এসেছে। শুধু সেই একদিন আমি আমার বাবা-মায়ের চোখে পানি দেখেছি ফলাফল নিয়ে। না, আশা ভঙ্গের হতাশা থেকে নয়, বরং আমি অনেক কষ্ট পেয়েছি, সেজন্য। সেদিন তাদের বুকভরা ভালোবাসা, আমার প্রতি তাদের বিশ্বাস আর উৎসাহ না পেলে আমার জীবনটা হয়তো সেদিন সেখানেই শেষ  হয়ে যেতে পারতো, এধরনের পরিস্থিতিতে আত্মহত্যা নেহায়েত পড়ালেখা ছেড়ে দেওয়া বিচিত্র কিছু ঘটনা না।
বুয়েটের পরীক্ষাগুলোর আগের দিন পর্যন্ত রাতে আব্বু বলতো, ‘অনেক পড়েছো সারা বছর, এখন ব্রেইনকে বিশ্রাম দাও, আসো টিভি দেখি।’ আমি দুটো স্বর্ণ পদক পেয়ে পাস করেছি, ইউনিভার্সিটি স্বর্ণ পদক, আমাদের ব্যাচের সবচেয়ে ভালো ফলাফলের জন্য। তাঁরা অনেক অনেক খুশি হয়েছেন নিঃসন্দেহে, কিন্তু এ নিয়ে কোনো চাপিয়ে দেওয়া প্রত্যশা ছিল না। যদি কোন প্রত্যশা থেকেই থাকে, সেটা ছিল ভালো মানুষ হওয়ার, সৎ পথে থেকে যেন সুখী হই, সুস্থ থাকি, সাধারণ সংসারী মানুষ হই।
ডাক্তার হতে হবে, ইঞ্জিনিয়ার হতে হবে এরকম বাধ্যবাধকতাও ছিল না। আব্বুর একটু ইচ্ছা ছিল, ডাক্তারি পড়ি। ঢাকা মেডিকেলে এক মাস ক্লাসও করেছি, তারপর ভালো লাগে নাই, ছেড়ে দিয়েছি। আম্মুর ইচ্ছা ছিল তার মতো অধ্যাপনা করি। বুয়েটে পড়ালামও বছর খানেক। কিন্তু ভালো লাগেনি পড়াতে, তাই শেষ পর্যন্ত আর ও পথে যাইনি।
চাকরি করবো, এ ব্যাপারে কোনো প্রশ্নই ছিল না, কিন্তু এই পদে যেতে হবে, এতো টাকা বেতন পেতে হবে, বা বাড়ি, গাড়ি এসব কোন স্বপ্নের বীজ আমার ভেতরে কখনোই ঢোকানো হয় নাই, তার চেয়ে বড় স্বপ্নের বীজ ছিল সমাজের জন্য, মানুষের জন্য কিছু করতে হবে। তার সাথে ছিল অগাধ বিশ্বাস, তাদেরকে আমি যেকোনো কিছু বলতে পরতাম। দুই যুগের মানুষ, তারপরেও। কোনো ছেলেকে ভালো লাগলো, বান্ধবীরা কোথাও ঘুরতে যাবো, কারো সাথে ঝগড়া হয়ে মেজাজ খারাপ, মোটামুটি প্রায় সবকিছুই। বিশেষ করে আমার আব্বু ছিল আমার সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য বন্ধু। কিছুটা যে মন কষাকষি  হতো না, তা নয়, তারপরেও। এখনো হয়। কিন্তু তাতে কী? বন্ধুতে বন্ধুতে তো তর্ক হয়ই, কিন্তু পিছলে যাওয়ার আগে প্রকৃত বন্ধুই কিন্তু বন্ধুর হাতটি ধরে রাখে শক্ত করে, পতনের হাত থেকে বাঁচায়।
আপনার সন্তানের জন্য আপনার চেয়ে বড় বন্ধু আর কে হতে পারে?
লেখাটি ভাল লাগলে শেয়ার করুন:
  • 230
  •  
  •  
  • 1
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    231
    Shares

লেখাটি ১,১৮৬ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.