ফিরে আসুক প্রতিবেশীর শুদ্ধ কনসেপ্ট

0

মোহছেনা ঝর্ণা:

সপ্তাহের পাঁচদিন কেটে যায় ক্ষুন্নিবৃত্তি সামলাতে সামলাতে। আর ছুটির দু’দিন কাটে ক্ষুন্নিবৃত্তির জন্য নিজেকে প্রস্তুত করতে করতে। কন্যা অপেক্ষা করে থাকে ছুটির দিন খেলবে। বাইরে যাবে। দৌড়াদৌড়ি করবে।

কিন্তু খেলবে কোথায়? আশেপাশে এতটুকু খোলা জায়গা নেই। খেলবে কার সাথে? সমবয়সী কেউ কি আছে? থাকলে তাদেরকে কি আমরা চিনি? পাশের বাসায় কে থাকে, কারা থাকে তাই তো জানা হয়ে উঠে না ব্যস্ততার দোহাই দিয়ে। এখনকার ভদ্র, নাগরিক সমাজে সবাই নিজের সংগে নিজেই একা। একই ঘরে থেকেও একেকজন একেকজনের কাছে কত দূরের মানুষ। আর সেখানে প্রতিবেশী!

তবে প্রতিবেশী নিয়ে আমার মনে রাখার মতো অনেক গল্প আছে। আপনাদের আছে কি? যে সময়ের মধ্য দিয়ে আমরা যাচ্ছি, তাতে করে প্রতিবেশী নিয়ে আমাদের সন্তানদের যে তেমন কোনো সুখস্মৃতি থাকবে না, তা আমি নিশ্চিত।
কারণ এখন তো আমরাই আমাদের পাশের বাসায় কে থাকে তাদেরকে চিনি না। বাচ্চারা চিনবে কোথা থেকে?

আমার শৈশব, কৈশোরের খেলার সাথীদের কথা ভাবলে, বিকাল বেলার সময়টুকুর কথা মনে পড়লে এখনো নষ্টালজিক না হয়ে পারি না। স্কুলে যাওয়া, প্রাইভেট পড়া খেলাধুলা কিংবা সাংস্কৃতিক কোনো কার্যক্রমে আমরা প্রতিবেশীর সন্তানেরা ছিলাম পরস্পর পরস্পরের সংগী। আমাদের মায়েরাও দেখতাম সময় পেলে সবাই মিলে অলস দুপুরে কী রকম হাসি আনন্দে পার করতো কিছু সময়। সবাই সবার পরিবারের সদস্যদের চিনতো। জানতো। রাস্তায় হঠাৎ করে মুরব্বী গোছের কারোর সাথে প্রতিবেশীর সন্তানের দেখা হলে মুখ লুকিয়ে না ফেলে বাচ্চাটা এখানে কেন, সাথে কে আছে, কোনো সমস্যা হলো না তো, এ জাতীয় অধিকার মূলক কথা শোনা যেত। আর এখন ভাবা যায় এমন আচরণ!

আমার বাবা যখন আমাদেরকে নিয়ে এই শহরে থিতু গাড়ে, তখন এই শহরে আমাদের রক্তের সম্পর্কের কোনো আত্মীয় ছিল না। বিপদে আপদে কিংবা যে কোনো প্রয়োজনে প্রতিবেশীরাই ছিল ভরসা।
আবার কোনো প্রতিবেশী বাইরে কোথাও কোনো কাজে গেলে তাদের ছোট বাচ্চা রেখে যেত আমার আম্মার কাছে। তখন আমাদের বাসায় কোনো গৃহপরিচারিকা ছিল না। বাসার সব কাজ আম্মা একা হাতেই সামলাতেন। এর মধ্যে অতিরিক্ত দায়িত্ব ছিল প্রতিবেশীর বাচ্চা সামলানো। আম্মা বাচ্চাকাচ্চা খুব পছন্দ করেন। (ভাগ্যিস করেন, তা না হলে আমার কী যে হতো! কারণ আমার কন্যা সারাক্ষণই নানুর কাছে থাকে)।

আমাদের এক প্রতিবেশীর অনেকগুলো ছেলেমেয়ে ছিল। প্রতিবেশী খালাম্মা থাকতেন গ্রামের বাড়িতে। আর তার ছেলে-মেয়েরা থাকতো শহরে। কেউ স্কুলে যেত, কেউ কলেজে যেত, কেউ যেত কাজে। তাদের বাসার চাবি ছিল দুইটা। একটা চাবি তারা দিয়ে যেত আম্মার কাছে। কারণ আম্মা সবসময় ঘরে থাকতো। তো দেখা যেত সারাদিনের সব কাজ সামলিয়ে আম্মা দুপুরের দিকে নিজেকে একটু ভাত-ঘুমের কাছে সমপর্ণ করছিল কিংবা সবেমাত্র চোখ দুটি তন্দ্রাচ্ছন্ন হয়ে আসছিল, ঠিক তখনই কলিংবেলের শব্দে হুড়মুড় করে দরজা খুলে দেখত প্রতিবেশীর ছেলেমেয়েদের কেউ না কেউ। আম্মার চোখে-মুখে কখনো বিরক্তি দেখেছি বলে মনে পড়ে না। মাঝে মাঝে অবশ্য আমরা ছেলেমেয়েরা বিরক্ত হতাম। আমার আম্মা তখন আমাদের বলতো, প্রয়োজনের সময়ই মানুষ আপনজন খোঁজে। প্রতিবেশী হচ্ছে আপনজন।

আমাদের আরেক প্রতিবেশীর বাচ্চা মৌ ছিল আমার আম্মার কলিজার টুকরা। মৌয়ের মা নিশ্চিন্ত মনে মৌকে আম্মার কাছে রেখে বেড়াতে যেত, শপিং এ যেত। আর যদি কোথাও না যেতেন শুধুমাত্র নিজে দুপুরে একটু আয়েশ করে ঘুমানোর জন্য মেয়েকে রেখে যেতেন আম্মার কাছে। কত নির্ভর করতেন এখন ভাবলেই আমার অবাক লাগে। সাথে আরো অবাক লাগে আম্মার মধ্যেও তো কখনো কোনো বিরক্তি দেখেছি বলে মনে পড়ে না। মনে হতো মৌ যেন আমাদের পরিবারেরই সদস্য। আমরাও ভীষণ পছন্দ করতাম মৌ কে কাছে পাওয়ারর সময়টুকু। আচ্ছা এখনকার এই অস্থির সময়ে এমন করে নিশ্চিত ভাবে থাকার সুযোগ কি আছে?

শুধু যে আমার আম্মাই করেছে তা নয়, আম্মার কাছ থেকে শুনেছি আমার মেজো ভাইকে সারাক্ষণ কাছে রাখত আমাদের এক প্রতিবেশী খালাম্মা। আমাদের দুই ভাই- বোনকে সামলিয়ে বাসার সব কাজ করতে বেশ হিমশিম অবস্থা হয়ে যেত আম্মার। তখন পাশের বাসার সেই খালাম্মা রিমনকে নিজের কাছে নিয়ে যেত। তারা পরিবারের সবাই মিলে ওকে দেখে রাখত। আশ্চর্য হলেও সত্যি এত বছর পরও যখনই সেই খালাম্মা, খালু কিংবা তাদের পরিবারের কারো সাথে আমার আব্বা, আম্মার দেখা হয় তারা প্রথমেই জিজ্ঞেস করে রিমনের কথা। রিমন যেন তাদের পরিবারের একজন হয়ে গিয়েছিল।

ইদানীং প্রায় আমার মনে হয়, আম্মা বাড়িতে গেলে আমার বাচ্চা রেখে অফিসে যাওয়ার যে সমস্যায় পড়তে হয়, যদি প্রতিবেশীর সেই সোনালি সময়টা থাকতো, তাহলে তো কষ্ট অনেক কমে যেত।

অবশ্য প্রতিবেশীর হাতে ঘটে যাওয়া বিপরীত চিত্রও আছে।
কয়েক বছর আগে একবার চট্টগ্রামের পাহাড়তলী চক্ষু হাসপাতালে গিয়েছিলাম। সেখানে গিয়ে দেখি দুই-আড়াই বছরের ছোট্ট একটা বাচ্চা কোলে নিয়ে মা কাঁদছে। অনেক্ষণ বসে থাকতে থাকতে একটা সময় গিয়ে জিজ্ঞেস করলাম, কাঁদছেন কেন?
ভদ্রমহিলার কথা শুনে আমার নিজেরই কান্না চলে আসলো।
মহিলা গার্মেন্টসে কাজ করে। নিজের মায়ের কাছে বাচ্চা রেখে প্রতিদিন কাজে যেতেন তিনি। মহিলার মা দু’দিনের জন্য গ্রামে গিয়েছিল দরকারি কাজে। সেই দুদিন ভদ্র মহিলা প্রতিবেশীর বাসায় বাচ্চা রেখে কাজে গিয়েছিল। একদিন রাতে বাসায় ফিরে দেখে বাচ্চার ডান চোখটা লাল হয়ে আছে। জানতে পারলো, বাচ্চা দুষ্টমি করতে করতে প্রতিবেশীর পানের বাটা থেকে চুন নিয়ে চোখে লাগিয়ে ফেলেছে। কিন্তু প্রতিবেশী তা খেয়াল করেননি। চোখের ডাক্তারের কাছে নিয়ে গিয়ে জানতে পারলেন বাচ্চাটার ডান চোখের দৃষ্টি শক্তি পুরোপুরি নষ্ট হয়ে গেছে। কারণ ডান চোখে চুন ঢুকে গিয়েছিল।
কী ভয়াবহ সংবাদ! সামান্য অসাবধানতায় একটা চোখ অন্ধ!

এছাড়া প্রতিবেশীর হাতে ছোট বাচ্চার নির্যাতিত হওয়ার ঘটনাও পত্রিকায় চোখে পড়ে এখন। আগে কি এমন ঘটনা ঘটতো? আমার জানা নেই।

এখন আমরা আধুনিক হতে গিয়ে আর সামাজিক যোগাযোগ রক্ষা করতে গিয়ে যে দিনে দিনে অসামাজিক হয়ে পড়ছি অনেক সময় নিজেরা তা বুঝতেও পারি না। সশরীরে উপস্থিত বন্ধুর চেয়ে ভার্চুয়াল বন্ধুদের প্রতি বেশি ভালোবাসা কাজ করে।

এইসব অতিমাত্রার অহেতুক ব্যস্ততার কারণে প্রতিবেশীর সাথে একটা আন্তরিকতা পূর্ণ সম্পর্ক এখন আর তৈরিও হয় না। যাকে ভালো করে জানি না, তার কাছে নিজের বাচ্চা রেখে বাইরে যাওয়ার কথা তো ভাবনাতেও আনতে পারি না। একই ভাবনা আমাকে নিয়ে আমার প্রতিবেশীরও নিশ্চয়ই।
খাঁচার ভেতর ঢুকতে ঢুকতে এতটাই বলয়ের মধ্যে ঢুকে গেছি যে চাইলেও আর কারো উপর নির্ভর করে নিশ্চিন্তে থাকতে পারি না। কি কঠিন অবস্থা!

 বি.দ্র. (চট্টগ্রাম থেকে প্রকাশিত দৈনিক আজাদীতে লেখাটি আগে প্রকাশিত হয়েছে)

লেখাটি ভাল লাগলে শেয়ার করুন:
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

লেখাটি ৯২০ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.