পোড়া মুখে সূর্যের আলো 

0

সাজেদা ইসলাম:

আমার বান্ধবী সুমির বাসার কাজে সাহায্যকারী জরিনার এসিডে পোড়া মুখ আর ওর ব্যবহার আমার নজর কেড়েছিলো। মনে হয়েছিলো ওকে যদি সুযোগ দেয়া যেতো, তাহলে অনেক বড় একজন মানুষ হতে পারতো! জরিনা যখন ওর কোলঘেঁষে দাঁড়ানো সুন্দর ছেলেটার সাথে আমাকে পরিচয় করিয়ে দিয়ে বলেছিলো: — ‘আফা, আমার ছেলে, প্রেসে কাম করে‘ … তখন মনে হয়েছিলো ওর স্বামীকে যদি কঠিন থেকে কঠিনতর কোনো শাস্তি যদি দেয়া যেতো! 

সুমির কাছে জরিনার অনেক গল্প শুনেছিলাম;  শুনেছিলাম ওর পশুস্বামীর কথা, যে কিনা ওর শরীরে এসিড ছুঁড়ে দিয়ে মুহূর্তের মধ্যে কেড়ে নিয়েছিলো ওর জীবনের সব সুখশান্তি আর বেঁচে থাকার প্রেরণা।  জরিনার কথাবার্তা ভালো লেগেছিলো আমারওর খুব সুন্দর করে থেঙ্কু (thank you), সোরি (sorry) বলা; ওর গুছিয়ে কাজ করা, কোন মেহমানকে কী দিয়ে আপ্যায়ন করবে, টিভি দেখে কী করে নতুন নতুন রান্না করবেওর এসব কিছুই খুব ভালো লেগেছিলো, আর তার সাথে সাথে ভীষণ রাগ হয়েছিলো ওর পশুস্বামীর ওপর। তাই জানতে চাই ওর কাছে কী করে একজন মানুষ এমন বীভৎস আচরণ করতে পারে!

আমাকে সুন্দর করে এককাপ গ্রিন টি বানিয়ে দিয়ে শুরু করেছিলো ওর জীবনের বিভীষিকাময় গল্প: 

মাত্র তের বছর বয়সে বাবামায়ের ইচ্ছায় বিয়ে হয় জরিনার ওর চেয়ে সতের বছরের বড় একজন লোকের সাথে। বিয়ের প্রথম রাতে স্বামীর হাতে থাপ্পড় খেয়ে শুরু হয় ওর বিবাহিত জীবন।

আমি ওর থাপ্পড়ের কাহিনী জানতে চাইলে একটু একটু করে বলতে থাকে সেদিনের গল্প: 

বাড়ির মুরুব্বিরা সেদিন স্বামীর সাথে কী কী করতে হবে তা বুঝিয়ে-শুনিয়ে জরিনাকে পাঠিয়ে দেয় ওর বাসর ঘরে। হঠাৎ করে কে যেন পাশের ঘর থেকে ওকে ডেকে পাঠায়। আর চলে যায় তার কাছে। বয়স কম থাকায় পাশের ঘরে সব আত্মীয়স্বজনদের সাথে গল্প করতে করতে ভুলে যায় স্বামীর কথাএতে ওর স্বামী ভীষণ রেগে গিয়ে চড় দেয়। ওর স্বামী অনেকদিন ধরেই অন্য একজন মেয়ের সাথে প্রেম করে আসছিলো, কিন্তু বাবামা রাজী না থাকায় পরিবারের চাপে পড়ে বাধ্য হয় জরিনাকে বিয়ে করতে। একদিনের জন্যও তার জরিনাকে ভালো লাগেনি। মোটেই পছন্দ হয়নি জরিনাকে। সেই জন্য বিয়ের পর দিনই তুমুল ঝগড়া করে ওকে বাপের বাড়ি পাঠিয়ে দেয়। জরিনার শ্বশুরশাশুড়ি বাবামা অনেক চেষ্টা করেও ছেলেকে বোঝাতে ব্যর্থ হন।

এরপর জরিনার শ্বশুরবাড়ি থেকে আর কেউ ওর কোন খোঁজ খবর নেয়নি। প্রায় দেড় বছর পর জরিনার শ্বশুরশাশুড়ি নিজেদের দেখাশোনা করার জন্য আবারো ওকে বুঝিয়ে-শুনিয়ে নিয়ে আসে ওর স্বামীর ঘরে। শ্বশুরশাশুড়ির সেবা করতে থাকে, কিন্তু কোনোভাবেই স্বামীর মন জয় করতে পারে না। সব কাজেই দোষ ধরতে থাকে ওর স্বামী। 

আমি যখন বলেছিলাম: ‘বাহ্! ভালো না বাসলেও তো দেখি তোমার খুব সুন্দর দুটা ছেলে আছে। 

জরিনা তার উত্তরে বলেছিলো: 

আমারে আমগো আত্মীয়স্বজনে শিখাইয়া দিছিলো জামাইর লগে গিয়া শুইয়্যা থাকতেযাতে আস্তে আস্তে হ্যার মন পাই, কিন্তু কুনোদিনই তার মন পাইনাইক্যা‘ — এই কথাগুলো বলার সময় ওর চোখ দুটা ছলছল করছিলো। 

আরও বলেছিলো:

 আফা, ভাইজানে আইস্যা আফনার হাত ধইরা বইস্যা য্যামনে কথা কয়, এই রকম ব্যবহার আমি কুনোদিনই হ্যার কাছ থিক্যা পাই নাইক্যা। হ্যা আমারে দুইচক্ষে দেখতে পারতো না। আমার বাপমা গরীব আছিলো দেইখ্যা হ্যার সব অত্যাচার সহ্য করতাম। আর পোলাগো মুখের বায় চাইয়া হ্যার সব অত্যাচার মাইন্যা লইতাম। হ্যা আমারে বিক্রি করতে চাইসিলো। কিন্তু সুবিধা করবার পারে নাই দেইখ্যা একদিন এসিড কিন্যা নিয়া আহে। হেইদিন খুব আদর কইরা পাশে বসায়। সবসময় হ্যা বিসনার উপরে বইস্যা ভাত খাইতো, আর আমি মাটিতে বইস্যা খাইতাম। আমি কিস্সু বুজার আগেই হ্যা আমার মুখেগায়ে এসিড ছুঁইড়া দিয়া দৌড়াইয়া ঘর থিক্যা পলাইয়া যায়। আমি চিল্লাইতে চিল্লাইতে কল পারে যাই। 

জরিনার কথা শুনে মনে পড়ে যায় জুঁই নামের সেই মেয়েটির কথা। যার স্বামী গয়না পরিয়ে দেয়ার কথা বলে হাত বাড়াতে বলে; আর মেয়েটা যখন পরম খুশিতে চোখ বন্ধ করে গয়না পরার জন্য হাত বাড়ায় তখনি ওর পশুস্বামী ধারালো ছুরি দিয়ে এক কোপে কেটে দেয় হাতের সবকটা আঙ্গুল।

জরিনা আরোও বলতে থাকে:

মাইনসে খালি বালটির পর বালটি পানি আমার গায়ে ঢালতেসিলো। আমার গা থিক্যা মনে হইতেসিলো সব মাংশগুলি খুইল্যা খুইল্যা ঝইরা পইরা যাইবো। আমার গায়ের কাপরও জায়গায় জায়গায় পুইরা যায়। সমস্ত গা আগুনের মতো জ্বলতেসিলো। তারপর আমার আর জ্ঞান আসিলো না। যখন জ্ঞান আসে তখন আমি হাসপাতালে। মুখ আর বুকের ডাইন পাশ পুরাটাই পুইরা গেসিলো। হাসপাতালের একটা কাপর গায়ে দিয়া সারাদিন দাঁড়ায় থাকতাম। বসতেও পারতাম না, আবার শুইতেও পারতাম না। পরে ডাক্তররা পুরা গায়ে ব্যান্ডেজ কইরা দিসিলো। নিজের চেহারা দেইখ্যা নিজেই ভয় পাইয়া যাইতাম। আমার চাইর পাশে আমার মতন আরো কিসু মাইয়ারা আসিলো। হ্যাগো দ্যাখলেও ডর লাগতো। দুই বসর আমারে হাসপাতালে থাইক্যা চিকিৎসা নিতে হইসিলো, আমি খালি চক্ষের পানি ফালাইসি। মাজেমদ্যে মইরা যাবার চাইসিকিন্তু পোলাগো কতা চিন্তা কইরা আর মরবার পারি নাই গো আফা।

এরপর আমি বলেছিলাম, ‘আজকে থাক জরিনা। আরেকদিন শুনবো। 

জরিনা ওর ছেলের জন্য কাপড় কিনতে রাজলক্ষীতে যায়। যাওয়ার সময় বোরকা পরে। সমস্ত মুখ ঢেকে নেয় কালো নেকাবে। কিছুক্ষণ পর ফিরে আসে ছেলের জন্য বেশ সুন্দর কয়েকটা গেঞ্জি কিনে নিয়ে। 

জরিনার স্বামী বুঝতে পেরেছিলো যে সে কোনদিনই জরিনার উপস্থিতিতে তার প্রাক্তন প্রেমিকাকে বউ করে ঘরে আনতে পারবে না। তার বাবামা, সমাজ কেউই তার প্রেমিকাকে মেনে নেবে না। জরিনার স্বামী পরিকল্পিতভাবেই এসিড দিয়ে ওর মুখটা চিরতরে বিকৃত করে দিয়ে নিজের প্রেমিকাকে নিয়ে ঘর করতে চেয়েছিলো। জরিনাকে দীর্ঘ কয়েক মাস হাসপাতালে শুয়ে থাকতে হয়েছিলো। একটা বন্ধ ঘরে পড়ে থাকতে হয়েছিলো দিনের পর দিন। প্রায় দুবছর সমাজচ্যুত অবস্থায় ছিলো জরিনা। নিজের চেহারা দেখে ভয়ে শিউরে উঠতো। কী কষ্টই না হয়েছিলো ওর কসমেটিক সার্জারি করার সময়! এতো বর্ণনাতীত কষ্টের পরও মুষড়ে পড়ে না। নতুন জীবনের স্বপ্ন দেখে।

জরিনার শ্বশুরশাশুড়ি পুলিশের হাত থেকে বাঁচার জন্য ওর হাসপাতালের খরচ বহন করে। যেহেতু জরিণার শ্বশুরশাশুড়ি ওর হাসপাতালে যায় এবংচিকিৎসার জন্য মোটা অঙ্কের টাকা দিয়েও ওকে  সাহায্য করে; তাই জরিনা আর ওর স্বামীর নামে কোন বিচার চাইতে পারে না। ওর স্বামীর কোনো বিচার হয় না। সে কিছুদিন পুলিশের ভয়ে পালিয়ে থাকে। তার প্রায় একবছর পর জরিনার স্বামী আবার বিয়ে করে। সে জরিনাকেও আবার বিয়ে করতে চেয়েছিলো সমাজের চাপে পড়ে, কিন্তু জরিনা আর সেই ভয়ংকর জীবনে ফিরে যেতে চায়নি। স্বামী নামটা শুনলেই স্বামীআতংক লাগতো ওর।

দীর্ঘদিন চিকিৎসা নেয়ার পর ওর স্বামীকে ডিভোর্স করে ঢাকায় এসে নতুন করে জীবন শুরু করে। 

এখন শিখে গেছে কী করে স্বামী ছাড়া সুন্দর করে জীবন চালাতে হয়। এখন ওর টাকাতেই ওর পরিবার চলে। বাসায় কাজ করে যা বেতন পায় তাতে মা-ছেলেদের জীবন ভালোই চলে যায়। মনে পড়ে যায় আমার এক ছাত্রীর কথা। বলেছিলো বেগম রোকেয়া পড়তে গিয়ে জেনেছে যে: 

“If a woman can earn money; she has the liberty to take her own decisions for her life as well.” 

সব মেয়েমানুষের জীবনেই কষ্ট থাকে। কিন্তু জরিনার কষ্টটা যেনো অনেক বেশি। ওর শরীরের বিভিন্ন জায়গায় এখনো ব্যথা হয়। কিন্তু তারপরও একা একা কাজ করে ওর সংসার চালানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে। ওর এই জীবন যুদ্ধে টিকে থাকার চেষ্টাআত্মনির্ভরশীলতা ভীষণ ভালো লাগে; আর মনে হয়এমনি করেই যেনো আমাদের নারীরা ভেঙ্গে না পড়ে কষ্টকে জয় করে সামনের দিকে এগিয়ে যেতে শেখে।

ভালোই তো আছে জরিনা। সারাদিন কাজের ফাঁকে ফাঁকে বাংলাহিন্দি চ্যানেলে রোমানটিক সিনেমা দেখে দেখে প্রেমের ক্ষুধাটা কিছুটা মেটাতে চেষ্টা করেকিন্তু ওর মনের কষ্টটা কমে কী? 

লেখাটি ৯৭৪ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

RFL
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.