সমাজ এবং রাষ্ট্রই আমাদের উপায়হীন করে

0
সালমা লুনা:
আমার মায়ের আমরা ছিলাম তিন কন্যা। বাসায় অবশ্য আমার এক আত্মীয়াও থাকতেন আমাদেরই সমবয়সী। আমার মা আমাদের চারজনের খানাপিনা আর সময়মতো পড়ালেখাটাই শুধু দেখতেন। তেমন করে মনে পড়ে না যে আম্মা কখনো মেয়েদের চলার জন্য যে বিশেষ নিয়মনীতি বা যাকে আমরা এখন বলি- সেক্স এডুকেশন, এসব নিয়ে কথা বলেছেন কখনো। কেউ অযাচিত গায়ে হাত দেবে কী দিতে পারে, গায়ে হাত দিলে তখন কী করতে হবে সেসব তো ভুলেও না। 
তবে হ্যাঁ সেক্স এডুকেশনের একটা পার্ট, হেলথ – সেটা সম্পর্কে জ্ঞান দিয়েছেন অবশ্যই। অনেককেই দেখেছি এসব বিষয়ে কাজের বুয়া বা বাসার অন্য আত্মীয়াদের কাছে শুনে শুনে উল্টাপাল্টা অস্বাস্থ্যকর কিছু শিখেছে। আমার মা আমাদের সেই শিক্ষাটা ঠিকঠাক দিয়েছেন এবং হাইজিন মেইনটেইন করেই দিয়েছেন। 
কিন্তু বাইরে চলতে-ফিরতে কোনো কুৎসিত হাত যদি এগিয়ে আসে, কিংবা গোপনে বা আড়ালে গিয়ে কেউ গায়ে হাত দিলে বা আস্বাভাবিক আদর ইত্যাদি করতে চাইলে কী করতে হবে, তা শেখাননি। সম্ভবত তার প্রয়োজন পড়বে বলে ভাবেনইনি। সত্যি বলতে তিনি শেখাননি বলে যে আমাদের কোনো ক্ষতি হয়েছে, তাও না। আমাদের দিনগুলো তখনো এতোটা পচে-গলে যায়নি। কিংবা আমাদের লক্ষ্মণরেখার গণ্ডিটা আম্মা এবং আব্বার কারণেই হয়তো খুব মজবুত ছিলো, যার জন্য আমরা তখনকার রাবণবাহিনীর হাতে হেনস্থা হইনি।
তবে দু’একবার নানাবাড়ি বা দাদাবাড়ি যেতে-আসতে বাসে বা ট্রেনে কিংবা মার্কেটে গেলে ওইসব বাহিনীর দেখা যে পাইনি তা নয়! কীভাবে যেন সহজাত প্রবৃত্তিতেই হয়তো তখন নিজেকে বাঁচিয়ে নিতাম কাত হয়ে, পাশ ফিরে, বাহু উঁচিয়ে, হাত ঠেকিয়ে, নানা কসরত আর কায়দা করে।
দিন বদল অনেক হয়েছে। কিন্তু সেই দিনের বদল কিন্তু আজও হয়নি, সেই পাপপুরীও আছে, সেই রাবণবাহিনী আজও আছে। আমি এখন এক কন্যাসন্তানের মা। এক পুত্রেরও! জেন্ডার ভেদে আমাকে দুরকমের শিক্ষাই দিতে হচ্ছে। শুধু তাই না। আমি আমার বোনের মেয়েটিকে বা অন্য আত্মীয়ের মেয়েকেও শিক্ষা দিচ্ছি।
এই গেঁয়ো মোড়লের মতো সমাজ, এই নপুংসক রাষ্ট্র আমাকে বুঝিয়ে দিয়েছে – নারীর জন্য, আমাদের মেয়ে শিশুটির জন্য কোনো নিরাপদ জায়গা তারা তৈরি করতে পারেনি। সে যত সহজে বেড়ি পরাতে পেরেছে/পারছে, ততো সহজে বলতে পারেনি, এই সমাজ, এই রাষ্ট্র তোমার জন্য নিরাপদ। 
বলেনি, তোমাকে হেনস্থা করবে, এতো সাহস কার? তোমাকে ধর্ষণ করে সে বেঁচে থাকবে কী করে? তার জন্য আমি রেখেছি মৃত্যুর পরোয়ানা! 
বলেনি, স্পর্শ করে দেখুক সে তোমার কেশাগ্র, তার হাত কেটে নিতে আছি আমি! আমরা আছি তোমার পাশে। না, সে কিছুই বলেনি। 
তাই আমি বলেছি আমার মেয়েকে, স্কুল,বাসা, আত্মীয়বাড়ি, ফ্রেঞ্চ ক্লাস, আর্ট ক্লাস, সব জায়গায় চোখকান খোলা রাখবে। ওয়াশরুম, ক্যান্টিনে সর্বত্রই সবাইকে লক্ষ্য রাখবে। যে কেউ, যে কেউ তোমার শরীরে হাত দিতে পারে – ভয় পাবে না। ভাববে তোমার চোখ-কান অন্যদের চেয়ে বেশি। মুখও চলবে সেভাবেই! তোমার শরীরে হাত দেয়ার স্পর্ধা কারোরই নেই। দেয়া মাত্রই চিৎকার করে কৈফিয়ত চাইবে সবার সামনে। 
জানি অবিশ্বাস করবে এখন সে সবাইকে! তার শিক্ষককে, স্কুলের দারোয়ান, পিয়ন আঙ্কেলকে, কোনো নিকট বা দূরের আত্মীয়কে, কোন গুরুজনকে! কেননা কোন ধর্ষকের কপালেই লেখা থাকে না  “ইনি একজন বদমায়েশ ধর্ষক।”  
এই যে বাচ্চা মেয়েগুলো সবাইকে সন্দেহ করে বড় হবে, এই দায় কার? কেউ কেউ স্বাভাবিক হতে পারবে না কখনই , নানা মানসিক জটিলতায় আক্রান্ত হবে। ছড়িয়ে পড়বে সন্দেহ আর অবিশ্বাস।
এই জন্য দায়ী কে? এজন্য কিন্তু মোটেই আমি দায়ী না। 
আমার কন্যা, আমাদের কন্যাদের সুরক্ষিত করতে যে রাষ্ট্র এগিয়ে আসেনি, যে সমাজ এগিয়ে আসেনি, সেটি করতে তো আমাদের মতো মায়েদেরই এগিয়ে আসতে হবে!
এদিকে দোষ না করেও কোনো পুরুষ হয়তো কেন্নোর মতো গুটিয়ে থাকবে মেয়েগুলোর সামনে। কোনো শিশু বা কিশোরীর দিকে স্নেহের হাতটি বাড়াতেও হয়তো ভয়ে বুক কেঁপে উঠবে তার। আত্মীয় বা অনাত্মীয় কোনো বাচ্চা মেয়ের সন্দেহভরা দৃষ্টিতে লজ্জায় আড়াল খুঁজবে সে। 
তবুও আমাকে শিক্ষা এরকমই দিতে হলো ! আমিও যে উপায়হীন!
লেখাটি ভাল লাগলে শেয়ার করুন:
  • 361
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    361
    Shares

লেখাটি ১,২৫৭ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.