ওদের কাছে যাহাই জাস্টিসিয়া, তাহাই জাতীয় সংগীত!

0

ফুলেশ্বরী প্রিয়নন্দিনী:

কয়েকটি ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা দিয়ে শুরু করতে চাই। আমার মা ফেরদৌসী প্রিয়ভাষিণী মুক্তিযুদ্ধের রক্তক্ষয়ী সংগ্রামের দিনগুলিতে খুলনাতে নিজ কর্মস্থলে পাকিস্তানী সেনাদের দ্বারা আটক এবং গণ ধর্ষণের শিকার হয়েছিলেন। একথা এখন আর কারো অজানা নয়। যুদ্ধশেষে স্বাধীনতার লাল সূর্য উদিত হলেও আমার মায়ের মতো মুক্তিযুদ্ধে পৈশাচিক বর্বরতার শিকার আরো অসংখ্য নারীদের লড়াইয়ের বাকি অংশটা আসলে শুরু হয় স্বাধীনতার পর থেকে। অনেকের কাছেই চেনা মানুষেরাও অচেনা হয়ে গিয়েছিলো। পাকিস্তানী চিহ্নিত শত্রুরা লেজ গুটিয়ে পালালেও  অচিরেই  ঘাপটি মেরে থাকা ঘর শত্রু – একাত্তরে যারা ছিল রাজাকার – আল- বদর – আল – শামস – নামধারী , সেইসব পুরনো শকুন মাথাচাড়া দিয়ে উঠছিলো।

তিন শিশুপুত্র কোলে নিয়ে আমার বাবার সাথে মায়ের বিয়ে হয়। তার শ্বশুরালয় অর্থাৎ আমার দাদাবাড়ি ধানমন্ডি সাত নম্বরের পানাউল্লাহ হাউজ বাংলাদেশের মধ্যে পাকিস্তানের এক টুকরো ভূখণ্ড। অথচ আমার বাবা ছাড়াও এবাড়ির বড় ছেলে দেশের টানে মুক্তিযুদ্ধে যোগ দিয়েছিলেন। ছোট ছেলে খোকন শহীদ হয়েছিলেন একাত্তরের ২৫শে মার্চ সেই ভয়াল কালরাত্রিতে,  ৩২ নম্বরে বঙ্গবন্ধুর বাড়ির সামনে। পানাউল্লাহ হাউজকে পাকিস্তান হাউজ বানিয়ে ছাড়ে এবাড়ির নারী সদস্যদের মধ্যে অনেকে, তাদের পাকিস্তানী জামাইদের সাথে নিয়ে। তাদের সুস্পষ্ট অবস্থান ছিল বাংলাদেশের বিপক্ষে। 

সেসময় যুদ্ধবিধ্বস্ত একজন বীরাঙ্গনার পক্ষে এমন বৈরি শ্বশুরকুলে মানিয়ে নেয়া কতটা দুষ্কর তা ভুক্তভোগী ছাড়া কেউ বুঝবে না। তার ওপরে যখন সেই লড়াইয়ের সঙ্গী হয় –  না স্বজনেরা, না সমাজ, তখন সে লড়াই চালিয়ে যাওয়াটা আর যাই হোক সহজ ছিলো না। একটি বিশাল যুদ্ধের পর ক্ষতবিক্ষত, ক্লান্ত দেহমন আবারো কীভাবে পূর্বপ্রস্তুতি ছাড়াই আরেকটি কঠিন যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল, কোথা থেকেই বা পেয়েছিলো এতো প্রবল আত্মশক্তি, সে প্রশ্ন আমাকে তাড়িয়ে ফিরলেও মাকে কখনো প্রশ্নটা করা হয়নি।
এই প্রতিকূলতার মধ্যেও আমার মা – বাবা দেশ এবং দেশের মানুষ, সংস্কৃতির সাথে মনেপ্রাণে জড়িয়ে থেকেছে সবসময়।
ও বাড়িতে উর্দু সংস্কৃতির সাথে সারাক্ষণ আমাদের বাংলা ও বাঙালি সংস্কৃতি চর্চার দ্বন্দ্ব লেগেই থাকতো। আমরা কোনোদিন
“মেইড ইন পাকিস্তান” কোনো সুতোও কিনিনি। অন্যদিকে, খেলা, রাজনীতি, সংস্কৃতি,খাওয়াদাওয়া, ধর্মীয় গোঁড়ামি সবেতেই ওরা ছিল পাকিস্তানপন্থী।
যথারীতি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের “হিন্দু ” ছাড়া আর কোনো পরিচয় ওদের কাছে ছিলো না। যদিও তারা উচ্চশিক্ষিত পরিবার!
একবার উপমহাদেশের কিংবদন্তী শিল্পী সুচিত্রা মিত্র এলেন বাংলাদেশে। কবিগুরুর “কৃষ্ণকলি আমি তারেই বলি ” – গানটির কথা ও সুর যেন এই মহীয়সীর কণ্ঠ ভেবেই সৃষ্টি। আমরা ঘরোয়া অনুষ্ঠানে কাছে বসে বিখ্যাত এ শিল্পীর
গান শুনে এলাম। 

সেই অনুষ্ঠানে সুচিত্রা মিত্রের একটি ছবি তোলা হয়েছিলো। ছবিটা বড় করে বাঁধাই করে বাড়িতে এনে দেয়ালে টাঙানো হলো। আমার দাদাবাড়িতে তুমুল উত্তেজনা শুরু হয়ে গেল। কারণ কে যেন আবিষ্কার করে ফেললো যে , ছবির সাদা ধবধবে বয়কাট চুলের স্মার্ট ভদ্রমহিলাটি নাকি আমার মায়ের মা, অর্থাৎ আমার নানী!! 
তাই তারা একযোগে চড়াও হলো আমাদের ওপর – ” কোনোভাবেই এই বাড়িতে নষ্টা মহিলার মায়ের ছবি রাখা যাবে না!” 
আমার মা কিন্তু বিষয়টা বেশ কৌতুকের সাথে গ্রহণ করেছিলেন এবং ভুলটা ভাঙাননি।
১৯৯০ সালে আমার বাবা অনেকটা বাধ্য হোন স্ত্রী এবং তিন-তিনটে নাবালক কন্যার হাত ধরে বাবার সম্পত্তি ছেড়ে আসতে। ” পানাউল্লাহ হাউজের ” বাসিন্দারা সেদিন বাড়ির সবচেয়ে পিতৃভক্ত, ভদ্র, সৎ এবং নিরীহ ছেলেটিকে পরিবার সমেত ঠকিয়ে সম্পত্তি বঞ্চিত করে, অনিশ্চিত ভবিষ্যতের দিকে ঠেলে দিতে পেরে বাড়িতে শ্যাম্পেন খোলার মতো করে কোকাকোলার ক্রেট ঝাঁকিয়ে খুলে বিজয় উল্লাসে ফেটে পড়েছিলো।
আমাদের সংসারের মালপত্র তখন নীরবে ট্রাকে, ঠেলাগাড়িতে উঠছিলো। বাবা শক্ত করে তিন মেয়ের হাত ধরে বলেছিলেন, ” আজকে থেকে তিনটা মেয়েই আমার মা। ” 
বাবা বাধ্য হয়েছিলেন কারণ, ও বাড়িতে আমার মায়ের জীবন হুমকির মুখে পড়ছিলো বারবার।
আমার মা একজন ভাস্কর। গাছের শুকনো ডাল থেকে পাওয়া অবয়বে ক্রুশবিদ্ধ যীশু, ভুতুম পেঁচা, মা ও শিশু সহ নানা আকৃতির ভাস্কর্য ছিল মায়ের করা। আমাদের শোবার প্রায় সবগুলো ঘরের পর বিশাল বসার ঘরটাও দখল করেছিলো ওরা। তাতেও দমে না গিয়ে সামনের বড় খোলা বারান্দাটা মা তার মনের মতো করে সাজিয়ে নিলেন। অবস্থা এমন হলো যে , সেখানেই খাওয়া-দাওয়া, অতিথি আপ্যায়ন, এককোণে আমাদের লেখাপড়াও চলতো। 
মায়ের মানসিক শক্তির কাছে হেরে গিয়ে এবারে শুরু হলো রাতের অন্ধকারে ভাস্কর্য চুরি করে ফেলে দেওয়া। একবার বড় ফুপুর স্বামী সাবেক পাকসেনা আমার মা হেঁটে যাবার সময় আচমকা একটি ভারী ভাস্কর্য হাতে তুলে ছুঁড়ে মারলো পেছন থেকে। মা সেদিন অল্পের জন্য প্রাণে বেঁচে গিয়েছিল।
একইভাবে এই লোকটা আবারো একদিন মায়েরই একটা ফুলের টব মায়ের দিকে ছুঁড়ে মারলো। টেলিফোনের ডায়াল খুলে রাখা হলো সেসময় দূরে অবস্থান করা বাবার সাথে আমাদের যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করার জন্য। 
সবই ছিল গভীর চক্রান্ত। একটি পরিবারকে ভিটেছাড়া করার নীল নকশা। পুরোটাই পাকিস্তানী হানাদার বাহিনীর কায়দায়। তারা যা চেয়েছিল তাই হয়েছে শেষ পর্যন্ত। আমরা অধিকার বঞ্চিত হলাম, ঠিকানা থাকা সত্ত্বেও ঠিকানাহীন হয়ে পড়লাম।
আজকের মতো এপর্যন্তই থাক ব্যক্তিগত কথা। 
সুপ্রিম কোর্টের সামনে থেকে ” জাস্টিসিয়া ” নামের ভাস্কর্যটি সরিয়ে নেয়া হলো অবশেষে।
” গ্রিক দেবীর মূর্তি ” এই নাকি তার অপরাধ ! যদিও যে ভাস্কর এটি নির্মাণ করেছেন সেই মৃণাল হকের দাবি এটি শাড়িপরিহিতা বাঙালি নারীর প্রতীক। 
সেই প্রসংগে কেন যেন আমার মায়ের “মায়ের ছবি ” এই অভিযোগ এনে ” সুচিত্রা মিত্রের ” ছবি নামিয়ে ফেলার ঘটনাটা মনে পড়লো। 
ভাস্কর্যটি কেমন বা তার নির্মাণ ত্রুটিপূর্ণ কি না তা নিয়ে আমি ভাবছিনা। আমি শুধু ভাবছি, যে জাতির মুক্তিযুদ্ধের মতো গৌরবময় ইতিহাস আছে, যে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুর মতো অবিস্মরণীয় বিশ্বনেতা – সেই বীর বাঙালির রক্তের বিনিময়ে স্বাধীন করা বাংলাদেশে রাতের অন্ধকারে একটি ভাস্কর্য নামিয়ে নেয়া হলো হেফাজতের মতো ভণ্ড, ধর্ম ব্যবসায়ী দলের সাম্প্রদায়িক দুরভিসন্ধি ও দাবির মুখে। মৌলবাদের কাছে মাথা নত করলো মুক্তিযুদ্ধ করা বাংলাদেশ !! 
নিন্দা জানানোর ভাষা নেই।
অনেক শিল্পী ও বিজ্ঞজনেরা এই ভাস্কর্য অপসারণের পক্ষে মতামত ব্যক্ত করেছেন। আমি শিল্পী বা বিজ্ঞজন কোনাটাই নই। কিন্তু সাধারণ দৃষ্টিতে আমার মনে হয়েছে , ভাস্কর্য নির্মাণ এবং স্থাপনের বিষয়ে যারা নীতিনির্ধারক, তাদের আরো সতর্ক হওয়া উচিৎ যাতে অনুমোদিত কোনো ভাস্কর্য স্থাপনের পর এর শিল্পমান নিয়ে সংশয় না দেখা দেয়। দয়া করে টেন্ডারবাজি, দলীয়করণ, কাউকে একচেটিয়া কাজ দেয়া –
এধরনের অভিযোগ গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করুন,  শিল্পকে অবমুক্ত  করুন।
কোথাও একটা বড় ভুল হয়ে যাচ্ছে। আবারো বলছি, ভাস্কর্যটির শিল্পমান নিয়ে শিল্পীরা বলবেন – তা অনভিপ্রেত নয়। কিন্তু যাদের দাবিতে এই ভাস্কর্য অপসারণ করা হলো, তারা কারা? বাংলাদেশের জন্ম থেকে আজ পর্যন্ত কোন ভালোটা তারা কবে চেয়েছে? 
তাদের কাছে কী আদৌ ভাস্কর্যের শিল্পমান কোনো অর্থ বহন করে ? উত্তর তো আমাদের অজানা নয় ! আমরা কী জানি না যে, তাদের কাছে যাহাই ” গ্রীক দেবীর মূর্তি (!)”, তাহাই 
” অপরাজেয় বাংলা “, তাহাই শহীদ মিনার, তাহাই জাতীয় সংগীত  এবং তাহাই – ” শাবাশ বাংলাদেশ ? “
এ এক গভীর চক্রান্ত। পুরনো শকুন মাথাচাড়া দিয়ে উঠছে সুযোগ পেলেই। সেই পুরনো শকুন যারা রাতের অন্ধকারে যারা শহীদ মিনার ভেঙে দিতে পারে , মেধাশূন্য বাংলাদেশ, বাংলাদেশকে পাকিস্তান বানানো যাদের আজন্ম লালিত এক বেজন্মা স্বপ্ন। 
শংকা জাগে, আমার পিতৃধাম হারানোর মতো আমরা মাতৃভূমি হারিয়ে ফেলছিনা তো? 
লেখাটি ভাল লাগলে শেয়ার করুন:
  • 326
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    326
    Shares

লেখাটি ২,০৭৭ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.