হেরে যাচ্ছে বাংলাদেশ, হেরে গেছেও

0

ফারজানা সুরভি:

আমি হতাশাবাদী মানুষ। আমার ধারণা, বাংলাদেশ হেরে যাবে। এ কথাটা লিখতেও কষ্ট হয়। হাত কাঁপে। কেননা, বাংলাদেশের সমাজ-মানুষ-তাদের মানসিকতা নিয়ে অকুণ্ঠ সমালোচনা করতে পারি। কিন্তু দেশ তো এক ভালোবাসার ভূখণ্ড। দেশ এক প্রেমাস্পদ, যে আমাকে শুধু ছায়া দিয়েছে। দেশ মানে স্মৃতির সমষ্টি।

বাংলাদেশ হেরে যাবে,পহেলা বৈশাখে চারুকলার আল্পনায় কালি মাখানো মোল্লাদের জন্য নয়। নারীদেরকে তেঁতুল বলা, জেনাকারী বলা, পহেলা বৈশাখকে হারাম বলা, সুপ্রিম কোর্ট প্রাঙ্গণে ন্যায় বিচারের দেবী ভাস্কর্যকে ধ্বংসের আহবানকারী ইসলামিস্টদের জন্য নয়। বাংলাদেশ হেরে যাবে, আমাদের সাধারণ মানুষের জন্য এবং আপোষকামী “জ্বি, শফি হুজুর; জ্বি, শফি হুজুর” আবৃত্তি করতে থাকা ভোটের হিসাবে মশগুল আমাদের রাজনীতিবিদদের জন্য।

এই দেশে আমেরিকা থেকে পি এইচ ডি করা একজন বাংলাদেশী আর একজন অশিক্ষিত রিকশাচালক -দুজনেই ধর্মান্ধ আদর্শকে আঁকড়ে ধরে। ধর্মান্ধ আদর্শের ধারক-বাহকরা পৃথিবীর প্রতিটি দেশেই আছে। পৃথিবীর প্রতিটি ধর্মেই আছে। কিন্তু ইসলাম হলো ধর্মান্ধদের সবচেয়ে ব্যবহৃত অস্ত্র। আমরা অনুভূতিপ্রবণ “বেটার মুসলিম” কিংবা “বেটার হিন্দু” হতে চাই এখন। সহনশীল এবং অসাম্প্রদায়িক মানুষ হতে চাই না। পাপ-পুণ্য, গুনাহ-সোয়াব, মুসলমানি-হিন্দুয়ানি, আর জান্নাত-জাহান্নামের হিসাব করতে করতে সবাই ভুলে গিয়েছে মানবতার দীক্ষা।

এই অফিস-আদালত-ব্যাঙ্কে চাকরি করা অনেক শিক্ষিত বাংলাদেশী মানুষ পহেলা বৈশাখের ‘তাহ্রুশ জামি’ দেখে দাঁত বের করে হাসে। হাসতে হাসতে বলে, “আজকালকার মেয়েদেরও দোষ আছে। উচিত শিক্ষা হইসে এদের”! শত শত মন্দির ভাঙ্গা দেখেও চোখ কপালে তুলে বলে, “বাংলাদেশের হিন্দুরা আবার নির্যাতিত নাকি? ওরাই তো এখন পাওয়ারফুল! ওদের এক পা তো সবসময় ইন্ডিয়াতে”!

নারী নির্যাতনের পরিসংখ্যান দেখে এবং ঘরের কন্যাটিকে “বেড়াল পার করার মতো” করে তাড়াহুড়ো করে অল্প বয়সে বিয়ে দিয়ে চোখ টিপে বলে, “আরে! বাংলাদেশের মেয়েরা তো আরামেই আছে। এরা প্রিভিলেজড। পুরুষেরাই বরং নির্যাতিত”! এভাবেই বাংলাদেশের বেশিরভাগ মানুষ, এমনকি শিক্ষিতরাও, সাম্প্রদায়িকতা এবং পুরুষতন্ত্রের বৃত্তে আটকে আছে। শিক্ষা এখানে কারো মানসিকতাকে উন্নত করতে এক বিন্দু ভূমিকা রাখে না।

বিশ্বাস করতে কষ্ট হয় যে, ঈশ্বরপ্রেম একসময় এই বাংলায় ছিল সুফিবাদের কোমল ইবাদতে। রবের প্রতি ভালোবাসায় ও আনুগত্যে। বাউলের গীত ঈশ্বর বন্দনায়। আর এখন, ওহাবিদের তরবারির ঝনঝনানিতে ঈশ্বরপ্রেম আটকে গিয়েছে। আমরা এখন “বেটার মুসলিম” হবো বলে, আঁকড়ে ধরছি সৌদির ওহাবি ইসলামি তন্ত্র। এর শেষ কোথায়, আমি জানি না। হয়তো একদিন অন্ধকার নেমে আসবে এই জনপদে। আফগানিস্তানের মতো। তবে আমার বিশ্বাস হয় না, তখনো কারো হুঁশ হবে! কেননা শরীয়া আইনের প্রথম ভিক্টিম তো সংখ্যালঘু সম্প্রদায় আর নারী। তাদের অরণ্যে রোদনে কারো কিছু কখনো যায় আসেনি, ভবিষ্যতেও আসবে না।

আমি কখনো আসলে শাড়ি নিয়ে কিংবা আমার টিপ নিয়ে আলাদা করে আবেগপ্রবণ হইনি। শাড়ি পরলে সুন্দর লাগে, তাই শাড়ি পরেছি। লাল বড় টিপ পরলে আমাকে খুব সুন্দর লাগে, তাই টিপ পরেছি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় দেশালের ফতুয়া আর নিউ মার্কেটের জিন্স ছিল প্রিয় পোশাক। কপালে লাল টিপ। চাকরিতে ঢুকে ফরমাল সালোয়ার কামিজ পরেছি। আমেরিকায় জিন্স-টপস-স্কার্ট পরি ক্যাজুয়ালি। অফিসে ফরমাল ব্লেজার-প্যান্ট।

শাড়ি সবসময় পরেছি উৎসবে। যত্ন করে। কদাচিৎ পরার কারণে এবং অন্যভস্ততার জন্য শাড়ি পরা ঠিকমতো শিখিও নি। কিন্তু এখন আমি আমার শাড়িকে খুব মিস করি। কে জানে, খুব তাড়াতাড়ি হয়তো একটা জামদানি শাড়ি পরে- কপালে লাল টিপ দিয়ে- খোলা চুলে ঢাকার রাস্তায় হাঁটার স্বাধীনতাটুকুও আর বাংলাদেশের নারীদের থাকবে না। শাড়ি আর টিপ নিয়েও তো ফতোয়ার শেষ নেই! তারা বলে, খোলা চুলে পাপ! তাই হিজাব দিয়ে চুল ঢেকে ফেলাই “বেটার মুসলমান” এর পরিচয়!! তাই ঠিক করলাম- যখন দেশে চলে যাবো, সালোয়ার কামিজগুলো ছুঁড়ে ফেলে দিব। শুধুমাত্র শাড়ি পরবো। শাড়ি পরে, কপালে লাল টিপ দিয়ে, খোলা চুলে ঢাকার রাস্তায় হেঁটে বেড়াবো। “বেটার মুসলমান” এর দেশে কবে এটুকুও নিষিদ্ধ হয়ে যাবে, কে জানে!

একটা কবিতা আজকে হতাশ কণ্ঠে আবৃত্তি করতে ইচ্ছা হচ্ছে।

“অদ্ভুত আঁধার এক এসেছে এ-পৃথিবীতে আজ,
যারা অন্ধ সবচেয়ে বেশি আজ চোখে দ্যাখে তারা;
যাদের হৃদয়ে কোনো প্রেম নেই – প্রীতি নেই – করুণার আলোড়ন নেই
পৃথিবী অচল আজ তাদের সুপরামর্শ ছাড়া।
যাদের গভীর আস্থা আছে আজো মানুষের প্রতি
এখনো যাদের কাছে স্বাভাবিক ব’লে মনে হয়
মহত্‍‌ সত্য বা রীতি, কিংবা শিল্প অথবা সাধনা
শকুন ও শেয়ালের খাদ্য আজ তাদের হৃদয়”।
আপনি কি ত্রিকালদর্শী ছিলেন, জীবনানন্দ দাশ?

শেষ খবর: সুপ্রিম কোর্ট প্রাঙ্গণ থেকে সরকার রাতের আঁধারে ভাস্কর্য অপসারণ করছে।

লেখাটি ভাল লাগলে শেয়ার করুন:
  • 613
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    613
    Shares

লেখাটি ২,১৪৫ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.