নারীর জীবনের পাহাড় ভাঙার গল্প এবং একটি ধর্ষণ

ইশরাত জাহান ঊর্মি:

ঋতুপর্ণ ঘোষ নারীর দহন দেখিয়েছিলেন তাঁর সিনেমায়। একটা রঙীন সন্ধ্যা, স্বামীর সাথে শপিং-এ যাওয়া মনোহর সন্ধ্যা কী করে কয়েক লহমায় নিকষ অন্ধকারে পরিণত হয়, সেই গল্প। কী করে চেনা জগতটা পাল্টে যায় এক বিবাহিত নারীর-সেই গল্প। কেন পাল্টে যায়? কারণ মেয়েটি বড়লোকের বখাটে ছেলেদের দ্বারা আক্রান্ত হয়। স্বামী তার সঙ্গে ছিল, কিন্তু তাকে সাহায্য করতে এগিয়ে এসেছিল আরেকজন নারীই।

মূলত: ধর্ষণ বা ধর্ষণ চেষ্টার পরে আক্রান্ত একজন নারীকে এই সমাজে কী কী ফেস করতে হয়, তার একটা চিত্র দেখানো হয়েছিল সিনেমায়। এমনকি সবচেয়ে কাছের মানুষ স্বামীটিও কী করে সেই প্রসঙ্গ তুলে মর্ষকামী হয়ে রেইপ করে মেয়েটিকে, ঋতুপর্ণ ইন ডিটেলস দেখিয়েছিলেন।

আমাদের এখানে কেউ এভাবে দেখাননি। অদ্ভুত এক যোনিবন্ধ সমাজ আমাদের। যে সমাজে ইজ্জত সম্মান লেখা থাকে নারীর শরীরে। তো, সেই শরীর আবার পুরুষ দ্বারা আক্রান্ত হলে নারীকে ফেস করতে হয় ভয়াবহ সব ঘটনা। সমাজ আর রাষ্ট্র তাদের পাশে থাকে না, এমনকি পরিবারও না। আমরা এইসব লেখালেখি আর গলা তোলার সামান্য চেষ্টায় আর কতটুকু পারি আক্রান্তের পাশে থাকতে?

পরশুদিন আমার ইনবক্সে এক সাংবাদিক ছোট ভাই ম্যাসেজটি পাঠিয়েছে। বনানীর ঘটনার এক ভিকটিম নারীকে তার বাড়িওয়ালা বাড়ি ছাড়তে বলেছে। আমি তখন আরেকটা এ্যাসাইনমেন্টে। গুরুত্বপূর্ণ এ্যাসাইনমেন্ট। কোনরকম ফিডব্যাক দেয়ারই সুযোগ ছিল না। আর এইসব ফিডব্যাকে আসলে কিছু যায়-আসে না।

এরকমই হয়। বরাবর হয়। একেকটা ঘটনা ঘটে, টিআরপি খেকো গণমাধ্যম কিছুদিন নিজেদের স্বার্থেই দৌড়ঝাঁপ করে। তারপর সমস্তই স্মৃতি হয়ে যায় এদেশে। একেকটা ধর্ষণের ঘটনার পর আরও কতবার, কত ধরনের হয়রানি আর হেনস্থার শিকার হতে হয় একটা মেয়েকে, সেসবের খোঁজ রাখার দায়িত্ব আমাদের নয়।

এই মেয়েগুলো কেন গিয়েছিল রাতের পার্টিতে সেই প্রশ্নের মুখোমুখি তাদের হতে হয়েছে, কিন্তু ক্রাইম রিপোর্টারদের কাছে খবর নেন অথবা মামলা লড়া নারীবাদী সংগঠনগুলোর কাছে-রাতের পার্টিতে না গিয়েও ধর্ষণের শিকার হওয়া হাজার হাজার নারীদের রক্ত হিম করা অভিজ্ঞতার তথ্য পাবেন।

একটা রিপোর্টের কাজ করতে গিয়ে তিনজন ভিকটিমের সাক্ষাতকার নিলাম আমি। অনেক কষ্টে নিতে হলো। কেউ সামনে আসতে চান না। সমাজ আর পুরুষকূল জন্মের দোষে এই নারীদের দিয়েছে বিপুল লজ্জা। অথচ এই লজ্জার জন্য কোনো দায়ই তাদের ছিল না।

মাত্র সাত বছর বয়সে ধর্ষণের শিকার হয়েছিল মেয়েটি। ২০১১ সালের ঘটনা, মেয়েটির পরিবার কোনরকমে একটা রায় পায় ২০১৭ সালে এসে। এই ছয় বছরে এই মেয়েটির বাবা-মা বারবার জায়গা বদল করেছে, মেয়ের পড়াশোনা শিকেয় উঠেছে। দরিদ্র বাবা-মা শহরের এখানে ওখানে ঘুরেছে।

বাবার বন্ধু বাড়িতে নিজের মেয়ের সাথে পরিচয় করিয়ে দেবে বলে ক্লাস টেনে পড়া মেয়েটিকে ধর্ষণ করেছিল। লোকটির বয়স ছিল পঞ্চাশের কাছাকাছি। মামলা চলছে পাঁচ বছরের বেশি সময় ধরে। এই পাঁচ বছরে মেয়েটি বোরখা আর হিজাবে নিজেকে ঢেকেছে, মামলার ঝামেলায় প্রথম বছর এসএসসি পরীক্ষা দিতে পারেনি, এখন সে কলেজে পড়ে বটে, মাসে দুতিনদিন আসতে হয় কোর্টে হাজিরা দিতে। রোদ, বৃষ্টি, ঝড়, সাক্ষী আসা না আসা, টাকা-পয়সার টানাটানি-জীবন এইসবই এই কয় বছরে মেয়েটিকে শিখিয়েছে।

আমরা ধর্ষণের ঘটনা দেখি। বড়জোর ঘটনা ঘটলে আর মামলা হলে তাদের ধরা পড়া পর্যন্ত ফলো করি। তারপর ভিকটিমের দীর্ঘ ভীতিকর যাত্রায় তার পাশে কেউ থাকি না।(যদিও আইনে আছে ১৮০ দিনের মধ্যে মামলার রায় দিতে হবে। কিন্তু সাক্ষী না আসা, পুলিশ রিপোর্ট দেরি করে দেওয়া, মেডিকেল রিপোর্ট না আসা ইত্যাদি ইত্যাদি কারণে কাজীর গরু মানে আইনটা কেতাবেই থাকে, বাস্তব হয় না কোনদিন।)

পাশে না-ই থাকি, অন্তত: ভিকটিম মেয়েগুলোর জীবন যাতে অতিষ্ট না হয়ে ওঠে সেই বিষয়টি দেখার দায়িত্ব তো রাষ্ট্রের। রাষ্ট্র এবং সমাজ সাধারণত উল্টোটাই করে। এ সমাজে কোন মেয়েকে ধর্ষণ করে গলা কেটে মেরে ফেলে রেখে গেলে তবু কিছু সহানুভূতি পাওয়া যায়, কিন্তু কোন মেয়ে ধর্ষণের শিকার হয়ে মাথা উঁচু করে কথা বললে, বিচার চাইলে তাকে বিনা ভাবনায় ‘বেশ্যা’ ট্যাগ লাগিয়ে দেওয়া হয়।

এই রাষ্ট্র কোনদিনই নারীবান্ধব ছিল না। কোনদিন হয়ে উঠবে- ইসলাম হেফাজতীদের এই দেশে, সেই আশাও দূর অস্ত। অন্তত ছড়িয়ে দেয়ার চেষ্টা করতে পারি ধর্ষণের শিকার নারীর পরবর্তী জীবনের পাহাড় ভাঙার গল্পগুলো। আমাদের তো শুধু মোমবাতি হাতে নীরব থাকার দায়!      

শেয়ার করুন:
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.